২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে বার বার অবস্থান বদলাচ্ছেন খালেদা

  • ফের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে

শরীফুল ইসলাম ॥ পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বার বার অবস্থান পরিবর্তন করছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। কখনও বলছেন তত্ত্বাবধায়ক হতে হবে এমন নয়, যে কোন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাব। আবার কখনও বলছেন নির্বাচনের বিষয়ে আমাদের আগের অবস্থান পরিবর্তন হয়নি। কখনওবা বলছেন তত্ত্বাধায়ক সরকার ফিরিয়ে এনে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হবে। আর খালেদা জিয়ার এ কথার জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি নাকোচ করে দিয়ে বলেছেন, সংবিধান অনুসারে ২০১৯ সালের মধ্যেই নির্বাচন হবে। এ পরিস্থিতিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশে আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করছেন।

সংবিধান অনুসারে দলীয় সরকারের বাইরে অন্য কোন সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুযোগ নেই। তারপরও ২৫ জুলাই রাতে বাহ্মণবাড়িয়া জেলার জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার হতে হবে এমন নয়, যে কোন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আমরা নির্বাচনে যাব। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেন, সংবিধান অনুসারে ২০১৯ সালে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। অপর এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, বিএনপি ভুল বুঝতে পেরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু থেকে সরে এসেছে। ১ জুলাই রাতে রাজশাহী জেলার জাতীয়তাবাদী আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে খালেদা জিয়া বলেন, নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপি আগের অবস্থান বদলায়নি। শেখ হাসিনার অধীনে আমরা কখনও নির্বাচনে যাব না। আর ৫ জানুযারি নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। এর আগে রোজার মাসে এক ইফতার পার্টিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচন দাবি করেন। আর ১ জুলাই এক অনুষ্ঠানে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিএনপির মধ্যবর্তী নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকোচ করে দিয়ে বলেন, ২০১৯ সালে শেখ হাসিনার অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে।

এদিকে রবিবার এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে সঠিক গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। এর আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়, নতুন নির্বাচন চায় বিএনপি।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে তৎকালীন বিএনপি সরকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। কিন্তু ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে জরুরী অবস্থা জারির পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে এই পদ্ধতির দুর্বলতা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ওঠে। বিভিন্ন মহল থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিলেরও দাবি ওঠে। ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল বিষয়ক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। এরপর জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা হয়। এই সংশোধনীতেই দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়। তাই বর্তমান সংবিধান অনুসারে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত বর্তমান সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি।

সূত্রমতে, বিএনপি কৌশলগত কারণে মাঝেমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ফিরিয়ে এনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি করলেও দলীয় হাইকমান্ড ধরে নিয়েছে বর্তমান সরকার তাদের এ সুযোগ করে দেবে না। তাই রবিবার দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়, নতুন নির্বাচন চায় বিএনপি। এ দলটি এটাও ধরে নিয়েছে যে, সংবিধান পরিবর্তন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি আর বর্তমান সরকার ফিরিয়ে আনবে না। তবে যে কোনভাবে যাতে একটি গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যায় সে জন্য তারা সরকারকে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে। এ জন্যই এতদিনের অনড় অবস্থান থেকে সরে এসে তারা যে কোন নামের নিরপেক্ষ সরকারের কথা বলছে। আর তারা এটাও মনে করছে যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করলে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তাই খালেদা জিয়া বার বারই বলছেন, শেখ হাসিনার অধীনে তারা নির্বাচনে যাবেন না। তবে দলীয় সরকারের অধীনে যদি নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করে কোনভাবে নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা পান তাহলে শেষ পর্যন্ত তারা নির্বাচনে যেতে পারেনÑ এমন সম্ভাবনা থেকেই মাঝেমধ্যে কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে নমনীয় বক্তব্য রাখছেন খালেদা জিয়া। আর এ জন্যই তিনি বলেছেন, কোন নামের সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই।

বিএনপি মাঝেমধ্যে অবস্থান বদলালেও আওয়ামী লীগ নেতারা তাদের নিজেদের অবস্থান ঠিক রেখেই বলছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর। তাই সংবিধান অনুযায়ী ২০১৯ সালেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের মধ্যে নাকি অঘোষিত সমঝোতা হয়েছিল। আর এ সমঝোতা অনুসারে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচন হলেও এরপর আরেকটি নির্বাচন হবে। কিন্তু তারানকোর মধ্যস্থতায় এ ধরনের কোন সমঝোতা হয়নি বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বার বারই বলা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন আন্দোলন করেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন বর্জন করে রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় পড়ায় বছরখানেক পর আবারও আন্দোলন শুরু করে দলটি। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিন অবরোধ ও এর মধ্যে মাঝে মাঝে হরতাল কর্মসূচী পালন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। নেতিবাচক এ কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে এ আন্দোলন চলাকালে যেভাবে পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী স্থাপনা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে তা ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

অবশ্য টানা ৯২ দিন নেতিবাচক আন্দোলন করতে গিয়ে বিএনপিরই রাজনৈতিক ইমেজ ক্ষুণœ হয়েছে। দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে পাঁচবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা এ দলটি। সে আন্দোলনের রেশ টানতে গিয়ে এখনও বিএনপি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না। না পারছে দল গুছিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করতে এবং না পারছে আবার আন্দোলনের দিকে গিয়ে সরকারকে চাপে রাখতে। তবে পরবর্তী নির্বাচনের ব্যাপারে মাঝেমধ্যে গরম গরম কথা বলে দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে চাচ্ছেন খালেদা জিয়া। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিএনপির অন্য নেতারাও বক্তব্য রেখে চলেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন, শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মোঃ আখতারুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, দেশ এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, আর পেছনের দিকে যাওয়ার সুযোগ নেই। অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় দেশের অর্থনৈতিক মানদ-ও অনেক উপরে উঠেছে। এই ধারাবাহিকতা রাখতে হবে। আর বিএনপি পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে তাদের নিজেদের অবস্থানে থেকে যে কথা বলছে তা হয়ত সময় পার করার জন্য বলছে। তাছাড়া কথা বলার স্বাধীনতা তো সবারই আছে। তবে বিএনপি যাই বলুক, বর্তমান সরকারকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় সামনে এগিয়ে যেতে হবে। সংবিধানে যেভাবে আছে সেভাবেই পরবর্তী নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রুহুল আমিন বলেন, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দুই দল কঠোর অবস্থানে থাকলে আবারও দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তাই বাস্তবতার আলোকে সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, দেশের মানুষ আর রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখতে চায় না।

শত নাগরিক কমিটির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন তো কোন নির্বাচন ছিল না। তাই যে কোনভাবেই হোক নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হতেই হবে। তা না হলে রাজনৈতিক পরিবেশ নষ্ট হতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ দলের নেতারা যা বলছেন তা দলীয় অবস্থান থেকেই বলছেন। তাদের কথায় যুক্তি আছে কিনা তা বিবেচ্য বিষয়। আর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে তা হচ্ছে সংবিধান অনুসারে ২০১৯ সালেই নির্বাচন হবে। আমিও মনে করি পরবর্তী নির্বাচন সংবিধান অনুসারেই হবে। তবে নির্বাচনের প্রক্রিয়া কী হবে এ নিয়ে পরস্পরের মধ্যে আলোচনা হতে পারে।