১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উদীচীর রবীন্দ্র নজরুল ও সুকান্ত জয়ন্তী উদযাপন

  • সংস্কৃতি সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাংলা সাহিত্যের তিন মহীরূহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও সুকান্ত ভট্টাচার্য। আপন সৃষ্টির আলোয় তাঁরা হয়ে আছেন বাঙালীর অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদের চেতনার আধার। বাংলা সাহিত্যের অমর এই সাহিত্যিকত্রয়ী একইসঙ্গে দিয়ে গেছেন মানবতা ও জাগরণের পথের দিশা। তাঁদের গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ও গান হয়ে আছে বাঙালীর প্রেরণার উৎস। কবিত্রয়ীর রচনা সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, সাম্রাজ্যবাদসহ সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আবির্ভূত হয় আলোকবর্তিকা হিসেবে। সোমবার বাঙালীর মননের পথিক এই তিন মহান ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করল বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির আয়োজনে উদ্্যাপিত হলো রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তজয়ন্তী। তাঁদের জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানটি সাজানো হয় রকমারি পরিবেশনায়। গানের সুরে, কবিতার ছন্দে, নৃত্যের নান্দনিক মুদ্রায় ও নাট্য প্রদর্শনীর মাধ্যমে জানানো হয় জন্মজয়ন্তীর শ্রদ্ধা-ভালবাসা। সেই সঙ্গে পঠিত হয় তাঁদের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে প্রবন্ধ। বিশিষ্টজনদের আলোচনায় উচ্চারিত হয় তাঁদের সৃষ্টির কীর্তিগাঁথা। শ্রাবণ সন্ধ্যায় তিন কবিকে নিবেদিত প্রাণবন্ত এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গীত ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে।

তিন কবির গানের সুরে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সম্মেলক পরিবেশনায় অংশ নেন উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদের সঙ্গীত বিভাগের শিল্পীরা। অনেকগুলো কণ্ঠ এক সুরে গেয়ে শোনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘হে মহামানব একবার এসো ফিরে’ গান তিনটি। এরপর শুরু হয় আলোচনাসভা। উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদের সভাপতি কাজী মোহাম্মদ শীশের সভাপতিত্বে এ পর্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তজয়ন্তী প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ও উদীচী ঢাকা মহানগর সংসদের সহ-সভাপতি নিবাস দে। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর সরদার। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সুকান্তের সাহিত্যকর্ম, রচনা ও জীবনাদর্শ নিয়ে আলোচনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. সফিউদ্দিন আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর। সুকান্ত ভট্টাচার্যের গদ্যরচনা বিষয়ক সুলিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন নিরঞ্জন অধিকারী। কাজী নজরুল ইসলাম ও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সৌমিত্র শেখর। রবীন্দ্র নাটকে গণমানুষ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন ড. সফিউদ্দিন আহমদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি কামাল লোহানী। বক্তারা বলেন, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চেতনার আধার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং সুকান্ত ভট্টাচার্য বাঙালীর মানস গঠনে অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের রচনা সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, সাম্রাজ্যবাদসহ সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আলোকবর্তিকা হিসেবে আমাদের পথনির্দেশ করে চলেছে।

আলোচনা শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এ পর্বের শুরুতেই রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তকে নিবেদিত স্বরচিত সঙ্গীত পরিবেশন করেন মাহমুদ সেলিম। এরপর মঞ্চে আসেন উদীচী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যশিল্পী আকাশ। মুদ্রার সঙ্গে অভিব্যক্তির প্রকাশে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ছন্দে তিনি নাচ পরিবেশন করেন। এরপর ‘প্রেমে, দ্রোহে তিন কবি’ শীর্ষক গীতি আলেখ্য পরিবেশন করেন উদীচী মিরপুর শাখার শিল্পীরা। গীতি আলেখ্যটির গ্রন্থনা করেছেন তুষার চন্দন। রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন উদীচীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য তাজিম সুলতানা। তাঁর কণ্ঠে একক সঙ্গীতের পর মঞ্চে দ্বৈত নৃত্য পরিবেশন করেন উদীচী ডেমরা শাখার শিল্পীরা। এরপর ছিল উদীচী কাফরুল শাখার শিল্পীদের দলীয় পরিবেশনা। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কালজয়ী কবিতা ‘রানার’-এর সঙ্গে দ্বৈত নৃত্য পরিবেশন করেন আরিফ নূর ও নজরুল ইসলাম। উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি মাহমুদ সেলিমের গ্রন্থনায় ‘দেশপ্রেম থেকে বিশ্বপ্রেমে’ নামের গীতি-আলেখ্য নিয়ে মঞ্চে আসেন ঢাকা মহানগর সংসদের শিল্পীরা। এতে চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয় তিন কবির দেশ ভাবনা এবং সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদীবিরোধী চেতনা। সব শেষে মঞ্চস্থ হয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নাটক ‘ডাকঘর’। আসলাম অরণ্য নির্দেশিত প্রযোজনাটি উপস্থাপন করে উদীচী কেন্দ্রীয় নাটক বিভাগ।

আতিউর রহমানের বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা ॥ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোকদিবস উপলক্ষে বাংলা একাডেমির মাসব্যাপী কর্মসূচীর দ্বিতীয় দিন সোমবার বিকেলে একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় বঙ্গবন্ধু স্মরণে দ্বিতীয় একক বক্তৃতানুষ্ঠান। বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করেন এমিরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, সংসদ সদস্য কবি কাজী রোজী প্রমুখ।

স্মারক বক্তৃতায় আতিউর রহমান বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু ছিলেন কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু। স্বাধীনতার পর কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে বঙ্গবন্ধু নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সদ্য স্বাধীন দেশের ত্রিশ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি পূরণে তাৎক্ষণিক আমদানি, স্বল্প মেয়াদে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি-উপকরণ সরবরাহ, কৃষিঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার এবং কৃষকের মাঝে খাসজমি বিতরণ করে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করেন। কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। উচ্চতর কৃষি গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৭৩ সালের মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি-অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করেন। পাকিস্তানী শাসনকালে দশ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের মুক্তি ও তাদের সকল ঋণ সুদসহ মাফ করে দেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরদিনের জন্য রহিত করেন। পরিবারপিছু জমির সিলিং ১০০ বিঘার নির্ধারণ করেন। শক্তিচালিত সেচ পাম্পের সংখ্যা ১১ হাজার থেকে ৩৬ হাজারে উন্নীত করেন। বিশ্ববাজারে সারের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সারে ভর্তুকি দিয়ে কৃষককে রক্ষা করেন। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, কৃষিই এ দেশের জাতীয় আয়ের প্রধান উৎস। কৃষির উন্নতিই দেশের উন্নতি। একক বক্তা বলেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন ব্যাপক অগ্রগতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রবর্তক। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রথম কয়েকটি বছর ছিল চড়াই-উতরাইপূর্ণ। এর মাঝেও সকল সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত অর্থনৈতিক নীতির আলোকে বাংলাদেশকে দরিদ্র দেশের তালিকা থেকে বের করে মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, বঙ্গবন্ধুর গোটা জীবনই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। তাঁর সংগ্রামের ফসল হিসেবে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ লাভ করেছি। স্বাধীনতার পর নানা বিষয়ই আমাদের হতাশা ছিল কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের ইতিবাচক ভবিষ্যতের বিষয়ে সবসময়ই আশাবাদী ছিলেন। সেই সঙ্গে আশা দেখিয়েছেন দেশের মানুষকে। জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচীর অংশ হিসেবে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনের সামনে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইয়ের একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়।