২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তারুণ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা

  • এপিজে আবদুল কালাম

‘বাংলাদেশের এই ভূমিতে দিল্লী থেকে বিমানে উড়ে আসার সময় প্রথমেই দেখেছি শুধু পানি। তোমরা পানির দেশের মানুষ। বহির্বিশ্বে আমি বাংলাদেশকে দুটো জিনিসের জন্য প্রশংসা করতে দেখি। একটি হলো পোশাক শিল্প এবং দ্বিতীয়ত এ দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই তরুণ।’ কিছুকাল আগে ঢাকায় সফরকালে কয়েকটি সেমিনার ও অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করার সময় মহান এই প্রবাদপুরুষ তরুণদের উজ্জীবিত করার মানসে এমন অসাধারণ উক্তি করেছিলেন। সকল সেমিনারে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য শ্রোতাদের মন জয় করেছিল এবং পত্র-পত্রিকায় ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। তরুণদের জীবনের দর্শণী কেমন হওয়া উচিত এ সম্পর্কে তিনি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যও প্রদান করেছিলেন। লিজেন্ড এই মনীষী তরুণদের উদ্দেশে আরও বলেছিলেন যে, ২০১৫ সালের শেষে এই তরুণদের সংখ্যা ৯ কোটি ছাড়িয়ে যাবে, যা কিনা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হবে। তিনি জীবনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা বলেছেন, অর্থাৎ জীবনের লক্ষ্য অর্জন, জ্ঞানার্জন, স্বপ্ন পূরণের কঠিন প্রচেষ্টা এবং ব্যর্থতা কাটিয়ে সফলতা অর্জন করা। তাঁর মতে প্রথম হলো জীবনে বড় স্বপ্ন দেখা আর ছোট স্বপ্ন দেখা এক ধরনের অপরাধ। স্বপ্ন দেখতে হলে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, থমাস এডিসন অথবা জগদীশ চন্দ্র বসুর মতোই স্বপ্ন দেখতে হবে বলে এই মহান পুরুষ মনে করেন। অন্যদিকে তিনি মনে করেন যে, সমস্যাকে পাশে রেখেই সকল সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। আর কখনো নিজের ওপর কর্তৃত্ব করতে দেয়া যাবে না, বরং সমস্যার ওপর কর্তৃত্ব নিতে হবে। কারণ যারা দলনেতা, তারা জানেন কীভাবে সমস্যা সমাধান করতে হয়। কীভাবে সাফল্য ও ব্যর্থতা সামলাতে হয়। তিনি বিশ্বাস করেন যে, একুশ শতক শেষ হওয়ার আগেই যুবসমাজ বাংলাদেশের হাল ধরতে পারবে। তাদের সংখ্যা হবে জনসংখ্যর অর্ধেক, যারা হবে উন্নয়নের ধারক ও বাহক। এরাই হবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মূল চালিকাশক্তি। তাদের স্বপ্ন হবে বাংলাদেশের স্বপ্ন, চিন্তা হবে বাংলাদেশের চিন্তা।

উপমহাদেশের এই পরমাণু বিজ্ঞানীর কথায়, ‘প্রত্যেক দিন, প্রত্যেক মুহূর্ত আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক বছরের ১ জানুয়ারি আমি সারা বছরের আমার লক্ষ্য স্থির করে নিই। আর সেই হিসেবেই কাজ শুরু“করি। আমার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমি যা পরিকল্পনা করেছিলাম, তার ৬০-৭০ শতাংশই অর্জন করেছি। দেখতেই পাচ্ছি যে, আমার লক্ষ্য কখনও থেমে থাকে না।’

সাবেক এই ভারতের রাষ্ট্রপতির জীবনযাত্রার কোনকিছুই কখনও হেরফের হয়নি। তিনি রাত ১টা পর্যন্ত জেগে থাকতেন, বই পড়তেন এবং ভক্তদের মেইলের উত্তর দিতেন। মজার ব্যাপার হলো, তাঁর কোন এক জন্মদিনে দিল্লীর রাজাজি মার্গে ১০ নম্বর বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলেন এক ভক্ত দর্শনার্থী।

মহান এই ব্যক্তিত্ব যখন ১৫ অক্টোবরে ৮৩ বছর পূর্ণ করল তখন তাঁর মুখ থেকে শুধু একটা বাক্যই ধ্বনিত হয়েছিল, ‘সূর্যের ৮৪তম কক্ষপথে পা রাখলাম আমি।’

একবার তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এখনও অবিবাহিত রয়েছেন, এর পেছনে কারণটা কী? তখন তিনি মুচকি হেসে প্রতি উত্তরে বলেছিলেন, ‘এই প্রশ্নটা ৫০ বছরেরও বেশি পুরনো। ভারতে এমনকি ভারতের বাইরেও এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি আমি। আমি আগেও উত্তর দিয়েছি তাদের যে আমি যৌথ পরিবার থেকে এসেছি। আমার ভাইয়ের নাতনী রয়েছে। এমন দারুণ পরিবারে একজন বিয়ে করল কি করল না তা খুব এখটা বড় বিষয় না। তাছাড়া জীবনে কখনো অর্ধাঙ্গিনীর প্রয়োজন অনুভব করিনি।’

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন কালে অর্থনীতিবিদ ড. মনমোহন সিং কে প্রধানমন্ত্রী, ইউরোপের বংশোদ্ভূত সোনিয়া গান্ধীকে কংগ্রেসের সভানেত্রী পেয়েছিলেন। বিজ্ঞানী, অর্থনৈতিক, ইউরোপীয় তিন ধারার সংমিশ্রণে ভারতকে গড়ে তুলেছেন। ইন্ডিয়া গ্রামীণ কর্মসংস্থান আইনের মাধ্যমে ভারতের নগর গ্রামে অর্থনীতির ব্যবধান ঘোচানোর ব্যবস্থা সুষম সমাধানে সচেষ্ট হন। তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে ভারতের সমস্যার অন্ত ছিল না। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, বেসামরিক স্থাপনা, নদীর বাঁধ, ইস্পাত শিল্পের জন্য জরুরী প্রযুক্তি সহায়তা প্রয়োজন ছিল।

স্বভাবতই সরকারকে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত রাখতে হচ্ছিল বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে। ভারতের অর্থনীতিও তখন বেশ দুর্বল। সৌভাগ্যবশত নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রজ্ঞাবান রাজনীতিকরা গড়ে দেন ভারতের বিজ্ঞানভিত্তি। পারমাণবিক শক্তি, মহাকাশ প্রভৃতি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয় তখনই। পাশাপাশি শক্তিশালী শিক্ষা-ভিত প্রস্তুতের লক্ষ্যে স্থাপিত হয় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠান, সেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মিশ্রিত স্বতন্ত্র এক শিক্ষা বিদ্যমান। সক্ষম ও পরিপক্ষ বৈজ্ঞানিক জনসম্পদ বিচারে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ ভারত। সমৃদ্ধ হচ্ছে অর্থনীতিও। এখন আর ভারতকে সব প্রযুক্তি অন্যের কাছ থেকে ধার নিতে হয় না। বরং স্থানীয় উপাদানের সহায়তায় নিজস্ব প্রযুক্তিরই উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। ২০২০ সালের মধ্যে উপমহাদেশকে সমৃদ্ধ জোনে পরিণত করার যে স্বপ্ন এই বৈজ্ঞানিরক দেখেন, তা একমাত্র একজোট হয়ে অর্জন করা সম্ভব বলেই তাঁর ধারণা।

একবার ভারতীয় সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনার মেয়াদ শেষ হবার পর আপনি কী করবেন? তিনি তখন সরলভাবে উত্তর দিয়েছিলেন যে, ‘আবার অধ্যাপনায় ফিরে যাব।’

বিজ্ঞানী আবদুল কালাম তাঁর স্বপ্নের যে রূপরেখা এঁকেছেন, এর একটা সর্বজনীন চরিত্র রয়েছে। তিনি তরুণদের অবদান ও করণীয় সম্পর্কে বিশদভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ‘একটি দেশের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যুবশক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আত্মপ্রত্যয়ী যুব সমাজ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। আনতে পারে ইতিবাচক পরিবর্তন। তারুণ্যের সম্ভাবনাকে বৈশ্বিক সমাজের সামনে তুলে ধরতে প্রয়োজন কর্মের শিক্ষা। সব কাজ সব সময় করা যায় না। ভাল সময়ে ভাল কাজ, বড় সাধনা সম্ভব হয় সহজেই। মানুষের জীবনের সবচেয়ে ভাল সময় তারুণ্য। তারুণ্যের সময় হলো জোয়ারের সময়। শীতের নদী বালির বাঁধ দিয়ে থামিয়ে রাখা যায়, কিন্তু বর্ষার ঢল সব বাধা উপড়ে সকল শিকল বিকল করে ছুটে যায়। তারুণ্যও তেমনি অবধ্য, অবাধ্য, অব্যর্থ। তরুণদের মেধা, জোর ও সাহস যেখানে মানুষের কল্যাণের কাজে লাগে, সেখানে সহজেই গড়ে উঠতে পারে শান্তিময় সুন্দর সমাজ। উল্টোদিকে, তারুণ্য যেখানে পথ হারায়, বিপর্যয় সেখানে অনিবার্য হয়ে ওঠে।

এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক ও পিতা-মাতার দায়িত্ব অনেক বেশি। পৃথিবীকে শিশু, কিশোর ও তরুণদের যোগ্য করে গড়ে তোলার দায়িত্ব সরকারের। আমাদের দেশ তরুণদের বড় স্বপ্ন দেখাতে শিক্ষা কাঠামোর মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে। প্রতিবছর তারুণ্যের সিংহাসনে আরোহন করে ৩০ লাখ তরুণ, তার মধ্যে থেকে ১৪ লাখ তরুণ এসএসসি পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়। তরুণ সমিতির মধ্যে ১৪ লাখ সদস্যের স্বপ্ন, বিজ্ঞানী আবদুল কালামের স্বপ্নের রূপরেখা থেকে কম নয়। লেখাপড়া সমাপ্তি, একটি চাকরি, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজ, পরিবার, সমাজ, দেশের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করবে এই প্রত্যাশা তাদের। চলমান বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তরুণদের ন্যায় ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণের সুযোগের অভাবে তাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়।’

সকলের চিরপুজ্য মহান এই প্রবাদপ্রতিমের চলে যাওয়া বিশ্ব ব্রহ্মা-ের এক অপূরণীয় ক্ষতি। ভারত সরকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে তাঁর সম্মানে সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর বক্তব্যে বলেন যে, ‘কালামের মৃত্যু দেশের বিজ্ঞান জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কারণ তিনি ভারতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন ও পথ দেখিয়েছিলেন’। চতুর্দশ দালাই লামা কালামের মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন ও প্রার্থনা করে বলেন যে, ‘কালাম শুধুমাত্র একজন বৈজ্ঞানিক, শিক্ষাবিদ বা রাষ্ট্রনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিপাট ভদ্রলোক, সরল ও বিনয়ী।‘ ভুটান সরকার দেশের পতাকা অর্ধনমিত রাখার ও ১০০০টি বাতি প্রজ্বলনের নির্দেশ দেয় এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে কালামকে ভারতীয় জনগণের রাষ্ট্রপতি বলে উল্লেখ করে গভীর শোক প্রকাশ করেন। ইন্দোনেশিয়ার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি সুসিলো বমবাং ইয়োধুয়োনো, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক ও সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লী সিয়েন লুং কালামের প্রতি সম্মান জানান।

মারা যাওয়ার বেশ কিছুদিন আগে তিনি বলে গিয়েছিলেন যে, আমি যখন মারা যাব, তখন আমার শোক দিবস পালন না করে তোমরা যদি কাজে মনোযোগী হও, সেটাই হবে আমার প্রতি তোমাদের ভালবাসার প্রমাণ। এমন মহৎ ও উদার পণ্ডিত ব্যক্তির প্রয়াণে অশ্রু বিসর্জন দেয়া ছাড়া জাতির অভিভাবকহীন সন্তানদের আর কি বা করার আছে?