২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘আমি তখন ছিলেম মগন’

  • মাহবুব রেজা

ছোটবেলায়, মানে খু-উ-ব ছোটবেলায় আমি আমার মা-বাবাকে হারিয়েছি। আমার তখন বয়স আর কত? আট-ন’য়ের মাঝামাঝি। আর আমার ছোট বোনের বয়স তখন মাত্র তিন। মা দীর্ঘকাল রোগে ভুগে বর্ষার এক সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা গেলেন। দিনটা ছিল ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮। অবাক করা বিষয় মা মারা যাওয়ার পঞ্চাশ দিন পর আমার বাবাও অন্ধ ভিখিরির মতো মাকে অনুসরণ করলেন। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো। মানে সর্বহারা। আমরা সর্বহারায় পরিণত হলাম রাতারাতি। দিনটা ছিল ১৬ নবেম্বর, ১৯৭৮।

আমার বাবা ছিলেন বেপরোয়া ধরনের বোকা। সারাজীবন নিজের ভাইবোন, আত্মীয়স্বজনের জন্য প্রাণ উজাড় করে নিজে নিঃস্ব থেকেছেন অকৃপণভাবে। ষাট দশকের শুরু থেকে নারিন্দার বসুবাজার লেনে আমরা ভাড়া থাকতাম। স্বাধীনতার পর আইনজীবী হিসেবে বাবা ইচ্ছা করলেই খেয়াল খুশিমতো বাড়িঘরের মালিক হতে পারতেন কম পয়সায়। কিন্তু আমার বাবা যতটা না ন্যায়নীতির মানুষ তার চেয়ে কয়েক কাঠি ওপরে ছিলেন তার মা সুরাইয়া খানম। তিনি তার স্বামীকে সব সময় বলতেন, খবরদার হিন্দু-বিহারীরা বিপদে পড়ে কম পয়সায় বাড়িঘর বিক্রি করতে চাইলেও তুমি ওসবে যাবা না। ফলস্বরূপ যা হওয়ার তা-ই হলো। মা-বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা ছয় ভাই এক বোন অথই সাগরে পড়ে গেলাম।

বাবা-মা মারা যাওয়ার পর বাড়ি ভাড়া জমে গেল অনেক মাসের। বাড়িওয়ালা নোটিস দিলেন। ১৯৭৯ সালের প্রথমদিকে এক রুক্ষ্ম বিকেলে দয়াগঞ্জের লালমাটির রাস্তার ধুলাবালি উড়িয়ে প্রাচীন আমলের এক পাঁচ টনী ট্রাকে আমার মার সাজানো সংসার তুলে নিয়ে আমরা চলে এলাম নানির বাড়ি আজিমপুর কলোনিতে। নানার বাড়িটা ছিল আজিমপুর বেবি আইসক্রিম মোড় থেকে কিছুটা সামনে। পেছনে ছিল চায়না বিল্ডিং। শুনেছি এক সময় নাক বোচা চীনারা নাকি এখানে বসবাস করতেন।

আজিমপুর কলোনির তিন রুমের ছোট বাসায় আমরা গাদাগাদি করে থাকতে শুরু করলাম। চার খালা, চার মামার সঙ্গে আমরা এত ভাইবোনÑ সব মিলিয়ে মানুষে মানুষে গিজগিজ। রাতেরবেলা খাটের নিচেও আমাদের বিছানা করে ঘুমাতে হতো।

খাওয়ার সময় নানির বাড়িকে মনে হতো ত্রাণশিবির। কত মানুষ! সকালবেলা চিনু খালা, পিনু খালা আটার রুটি বানাতে বানাতে ঘেমে অস্থির! আজিমপুর কলোনি থেকে আমরা ভাই-বোনরা আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করলাম। আমাদের আত্মীয়স্বজনরা দেরিতে হলেও সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন, বেচারাদের নানির ওপরে চাপটা বেশি হয়ে যাচ্ছে।

আমার ছোট দুই ভাইয়ের দায়িত্ব নিলেন গ্রামে থাকা দুই ফুফু। আমার গতি হলো পূর্ব নাখালপাড়ায় এক চাচার বাসায়। আমার ইমিডিয়েট বড় ভাই রুমীর গতি হলো ঘুরে ঘুরে বেড়ানো। আজ নানির বাড়ি তো কাল কোন এক চাচার বাড়ি। পরশু চাচার বাড়ি থেকে দূর কোন আত্মীয়ের বাড়ি। রুমী খুঁজে খুঁজে আমাদের নতুন নতুন আত্মীয়স্বজনদের বের করতে লাগল। আমার সবচেয়ে বড় দুই ভাই নানির বাড়ি থেকে গেল। আমি ভাইদের মধ্যে চার নম্বর। আমার ছোট দুই ভাই আর এক বোন।

নাখালপাড়া থেকে রেললাইন ধরে হেঁটে হেঁটে যেতাম স্কুলে। স্কুলের নাম ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ। ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম। স্কুলের পাশে হলিক্রস কলেজ। স্কুল ছুটির পর আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটত। প্রথম দিকে স্কুল থেকে নাখালপাড়ায় ফিরতে ইচ্ছা করত না। স্কুল ছুটির পর ঠিক করতে পারতাম না আমি কোন্ দিকে যাব? আজিমপুরে যাব না নাখালপাড়ায় যাব? স্কুল ছুটির পর আমি হেঁটে হেঁটে ফার্মগেট ওভারব্রিজের কাছে চলে আসতাম। ওভারব্রিজের ওপাশে আনন্দ সিনেমা হল। ওখান থেকে ভোমা সাইজের টেম্পোতে উঠলে নিউমার্কেট। ভাড়া মাত্র পঁচাত্তর পয়সা। নিউমার্কেটে নেমে রাস্তা পার হলেই নীলক্ষেত। নীলক্ষেতের পরই তো হলুদ রঙের সারি সারি বিল্ডিং। কলোনি। আজিমপুর কলোনি। নানির বাড়ি।

ফার্মগেট ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমি কতকিছু যে ভাবতাম! নানির কথা ভাবতাম। বড় দুই ভায়ের কথা ভাবতাম। রুমীর কথা ভাবতাম। গ্রামে ফুফুর কাছে থাকা ছোট দুই ভাইয়ের কথা ভাবতাম। ছোটবোন মুন্নীর কথা ভাবতাম। আজিমপুর কলোনির কথা ভাবতাম। আর সবচেয়ে বেশি ভাবতাম নারিন্দা, ২৪ নম্বর বসুবাজার লেনের কথা। নারিন্দা গভঃ বয়েজ হাই স্কুলের কথা ভাবতাম। খ্রীস্টান কবরস্থানের কথা ভাবতাম। মনির হোসেন লেনের কথা ভাবতাম। ঋষিপাড়ার কথা ভাবতাম।

এসব ভাবতে ভাবতে আমার ভাবনা শেষ হতো এই উপলব্ধির মধ্যে এসে আমি যে টেম্পোতে চড়ে নিউমার্কেটে যাব সেই পয়সা তো আমার পকেটে নেই।

আমি তখন দীনহীন পথিকের মতো কূলকিনারা না পেয়ে মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একা একা উল্টো পথে হাঁটা দিতাম। সেই থেকে এই উল্টো পথে হাঁটাই আমার সম্বল হয়ে উঠেছে।

ধঃযধরৎরফযধ১৫@ুধযড়ড়.পড়স