১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাকাচৌর রায় ও আদালত অবমাননা

  • মুনতাসীর মামুন

আদালত একটি প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তির কারণে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি না হয় সেটি আমাদের সাংবাদিকদের যেমন ভাবা উচিত, তেমনি বিচারকদেরও। গতকালের পর আজ পড়ুন শেষ কিস্তি...

৪. গরিবরা কি বিচার পায়? পায় না। পত্রিকায় দেখেছি অনেক গরিব নিরপরাধ এক দশক বা দু’দশকের বেশি জেলে পড়ে আছেন কোন শুনানি ছাড়া। ব্যবহারজীবীরা তাদের কাজের জন্য পারিশ্রমিক নেবেন ঠিক আছে, কিন্তু একবার মক্কেল ধরতে পারলে তার কি হেনস্থা হয় বিচারকরা নিশ্চয় তা জানেন। কারণ, তারা আগে ব্যবহারজীবী ছিলেন। এখানে মিথ্যা কি হলো? গরিবদের আইনজীবীরা পাত্তা দেন, এমন আশ্চর্য কথা কেউ কখনও শুনেছে। গরিব দূরের কথা, শুনেছি স্বদেশের পক্ষে এফিডেভিট ও দাঁড়াবার জন্য আওয়ামী লীগ নামধারী কাউকে রাজি করানো যায়নি। অথচ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলবদলকারী জনৈক রায় চৌধুরীর কাছে নামী-অনামী, দামী-অদামী আইনজীবীরা ধর্ণা দেন তাদের সহায়তা করার জন্য। আমি এসব বিশ্বাস করি না। শুনে একজন বলল, তাহলে আপনাকে কি রেকর্ড করে শোনাব?

যাক, আমি এসব আলোচনা করব না। কারণ, আমার ক্ষেত্রে নামী-অনামী অনেক আইনজীবী দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বেচ্ছায়। আমি তাদের কাজে কৃতজ্ঞ।

সালাউদ্দিন কাদের নিয়েও মন্তব্য করেছেন স্বদেশ রায়। হ্যাঁ, সাকাচৌ নিয়ে কেন সবার মধ্যে উদ্বেগ ছিল তার কথা আগেই বলেছি। তারপরও বলা যেতে পারে স্বদেশ যে অভিযোগ তুলেছেন তা গুরুতর এবং আদালতের তাতে ক্ষুব্ধ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। স্বদেশ লিখেছেন- ‘কিভাবে যারা বিচার করছেন সেই বিচারকদের একজনের সঙ্গে দেখা করে সালাউদ্দিন পরিবারের লোকেরা?’

১. স্বদেশ কারো নাম উল্লেখ না করলেও চারজনের বেঞ্চের সবাই মনে করতে পারেন তাদের কাউকে না কাউকে উদ্দেশ করে মন্তব্য করা হয়েছে। এই মন্তব্য অবশ্যই ক্ষুব্ধ করতে পারে তাদের, বিশেষ করে যেখানে এ ধরনের সাক্ষাত গ্রহণযোগ্য নয়।

২. এরই মধ্যে কোন বিচারককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কিনা পাকিস্তানী বাঙালী অধ্যুষিত কোন প্রতিষ্ঠান থেকে? যেখানে ‘মিটিং’ হতে পারে। লন্ডন থেকে আমাকেও খবরটি জানানো হয়েছিল, কিন্তু আমি একটু ভীতু টাইপের দেখে এটি উল্লেখ করিনি। তবে, ঐ ধরনের কোন বিষয় হলে সে সব কাগজপত্র থাকবে।

॥ চার ॥

স্বদেশের মামলা আইন যেভাবে চলে সে ভাবেই চলবে। কিন্তু প্রশ্নগুলো কেন ওঠে তাও বিচার্য।

১. মানবতাবিরোধী অপরাধে একই অভিযোগে সব অভিযুক্তকে একই ধরনের দ- দেয়া হয়েছে, না ব্যতিক্রম করা হয়েছে? যদি করা হয়ে থাকে তা’হলে সেটি গ্রহণযোগ্য কিনা?

২. ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালতে অনেক ক্ষেত্রে শুনি, সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে অভিযোগ বাতিল বা দ- হ্রাস বা বাতিল। এ প্রশ্ন কেন আসে? যেখানে ফৌজদারি মামলার এভিডেন্স অ্যাক্ট আদৌ প্রযোজ্য নয়।

৩. উচ্চ আদালতের বিচারক খালাস দিয়েছেন মানবতাবিরোধী অপরাধীকে। অথবা একমত হননি। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের উদাহরণ আছে কিনা? একটি আছে। টোকিও ট্রাইব্যুনালে ভারতীয় বিচারক রাধাবিনোদ পাল জাপানের অপরাধ সম্পর্কে একমত হননি। জাপানীরা তারা ভাস্কর্য গড়েছে। এটি গ্রহণযোগ্য কিনা? সাঈদীর মৃত্যুদ- রদ কেউ মানতে পারেনি। কেননা এ রায় ইতিহাসের বিরুদ্ধে।

গণহত্যায় একজন জড়িত, ইতিহাস সাক্ষী আর বলা হবে তিনি অভিযুক্ত নন, বা নীরব থাকবেন এটা হতে পারে? আইন ইতিহাসের বিরুদ্ধে যেতে পারে? আইনতো মানুষের সৃষ্টি। কিন্তু, আদালতের স্বার্থে আমরা মেনে নিয়েছি। অথচ, এ ধরনের ঘটনা দেশজুড়ে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তখন তার দায় কে নিবেন? আমরাই বরং বলেছি এই স্বদেশ রায় শুদ্ধ যে, আদালতে গেছি, পছন্দ না হলেও আদালত মানতে হবে।

স্বদেশ রায় দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন। তিনি মাহমুদুর রহমান টাইপ নন। এটা কি সম্ভব কোন প্রমাণ ছাড়া তার মতো সাংবাদিক এ ধরনের মন্তব্য করবেন? যদি করেন তবে তিনি বুদ্ধিমান এবং সতর্ক এমন বলা যাবে না এবং তার কাফফারা তাকে দিতে হবে। এটি বিবেচনায় নেয়া উচিত এবং বিষয়টি ভেবেচিন্তে সময় নিয়ে নিষ্পত্তি করা উচিত। কোন পক্ষেরই আবেগতাড়িত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।

স্বদেশ রায় যাই লিখুন, আমরা যাই ভাবি না কেন, সাকাচৌর ক্ষেত্রে বিচারকরা কিন্তু ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখেছেন। অর্থাৎ প্রমাণিত হয়েছে আমরা যাই বলি না কেন, যাই লিখি না কেন বিচারকরা ইতিহাস ভোলেননি, ইতিহাসের পক্ষে গেছেন, সে কারণে মানুষ মনে করেছে তারা ন্যায় বিচার পেয়েছেন। এবং আমরা যা ভেবেছি, লিখেছি তা ভুল। তারা ন্যায়ের পক্ষে। নতুনভাবে আস্থা পেয়েছে সবাই আদালতে এবং আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, যে যাই বলুক না কেন মানবতাবিরোধী অপরাধীরা ছাড় পাবে না, কেননা আদালত ইতিহাসের বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে না। কিন্তু আদালত অবমাননা সমন সমস্ত কিছুকে ওলটপালট করে দিয়েছে।

সাংবাদিকতার বিষয়ে আরেকটি উদাহরণ দিতে চাই। সাংবাদিকতার জগত এখন আমূল বদলে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যম বলতে আমরা পত্রপত্রিকা ও টিভি বুঝি। সে জন্য কোন পত্রিকা বা কোন টিভিতে বিতর্কমূলক, মানহানিকর সংবাদ প্রকাশ করলে তাকে চিহ্নিত করতে পারি। কিন্তু এখন ফেসবুক ও ইন্টারনেটের কারণে সব কিছু বদলে যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে খবর চলে যাচ্ছে ইন্টারনেট ও ফেসবুকে। সেখানে নানান খবর, ব্লগ, নিজের তোলা ছবি- সবই আপলোড করা হচ্ছে। এর ফলে সাক্ষ্য আইন সম্পর্কে প্রচলিত ধ্যান-ধারণাও বদলে যাচ্ছে। ভারতের ‘তেহলিকা’য় ভিডিওতে চিত্রধারণ করে খবর প্রচার করে অনেক মন্ত্রীর সর্বনাশ করা হয়েছে। সেলফোনে গোপনে কথোপকথন রেকর্ড বা ছবি তোলা হচ্ছে। মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ছে, যে কারণে স্বৈরাচারী শাসকরা আগের মতো খবর চেপে রাখতে পারছেন না। এটিকে বলা যেতে পারে ‘নাগরিক সাংবাদিকতা’। বাংলাদেশে এখন ইন্টারনেট কাগজের সংখ্যা কত সরকারও তা জানে কিনা জানি না। অসংখ্য ইন্টারনেট সংবাদপত্রে সত্য-মিথ্যা নানান খবর ছাপা হচ্ছে। কেউ পারছে তা থামাতে? সরকারই পারছে না। আদালত পারবে তাদের আদালত অবমাননার আওতায় আনতে? পারবে না। অথচ, এদের পাঠক প্রচলিত ছাপা বিদ্যুতায়ন মাধ্যম থেকে বেশি। ধরা যাক, কোন বিচারক নির্দিষ্ট একটি কাগজকে আদালত অবমাননার আওতায় আনলেন, ইন্টারনেট কাগজকে নয়। তাহলে কি ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয় না? বিষয়গুলো সবার ভেবে দেখা দরকার। এ পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট আইন ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও প্রয়োজন। এখন আমাদের প্রাইভেসি বলে কিছু নেই। সরকার সমস্ত ফোন টেপ করার অধিকার রাখে। এ নিয়ে আমেরিকায় দারুণ হৈচৈয়ের পর গোপনে টেপ করার আইন বাতিল হয়েছে। আমরা মনে করি সাংবাদিক, বিচারক সবাইকে কম আবেগপ্রবণ ও স্পর্শকাতর হতে। কারণ, বন্যা-নিরোধক বাঁধ খুলে গেলে একবার, বন্যায় সব একাকার হয়ে যাবে। আমরা কেউ মনে রাখি না ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী এবং ইতিহাস তা মনেও রাখে না। ব্যক্তির বা সামগ্রিক অর্জনই টিকে থাকে।

আমরা মনে করি, আদালত একটি প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তির কারণে, প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি না হয় সেটি আমাদের, সাংবাদিকদের যেমন ভাবা উচিত, তেমনি বিচারকদেরও। তারা বিজ্ঞ দেখে বিচারক। আমরা ফালতু, অনেক কথা বলতে পারি, মিছিল করতে পারি, সেøাগান দিতে পারি, কিন্তু সংসদ বা নির্বাহীর মতো আদালত প্রতিক্রিয়া জানালে প্রতিষ্ঠান অজস্র প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। বিচারকরাও তো মানুষ। আমরা সে পরিস্থিতি চাই না। বেশি স্পর্শকাতর হলে বিপদ।

এ মন্তব্য সত্ত্বেও বলব- এদেশে নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগ থেকেও উর্ধে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, ত্রিশ লাখ শহীদ, ৬ লাখ নির্যাতিত নারী, অগণিত আহত। এদের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ। আজ যিনি মন্ত্রী, জেনারেল, শিক্ষক, ব্যাংকার, বিচারক সবার ভিত্তি ঐ রক্তস্রোত। এর বিরোধিতা যিনি করবেন তিনিই সেই বাঙালীর প্রতিরোধের সম্মুখীন হবেন। এ কথা যেন আমরা মনে রাখি।