১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশের মাটি থেকে খালেদা জিয়াকে বিদায়

  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

মৌলবাদের প্রধান লক্ষ্য প্রজাতন্ত্রে ভাঙ্গন ধরানো এবং প্রজাতন্ত্রের জায়গায় মৌলবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। মৌলবাদী রাষ্ট্রের ভিত্তি রেসিজম এবং এই রাষ্ট্রের শাসকরা রেসিস্ট ও জেনোফোবিক গ্রুপ থেকে উত্থিত। তাদের শত্রু বিভিন্ন : ইতিহাসের দিক থেকে হিন্দু জাতি এবং রাষ্ট্রের দিক থেকে ভারত। তাদের অন্য শত্রু হচ্ছে মুসলমান, যারা একই এথনিক গ্রুপের অন্তর্গত হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। সেজন্য বাংলাদেশের দিক থেকে হিন্দুরা মুসলমান সংস্কৃতির আক্রমণকারী আর একই এথনিক গ্রুপভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও যেসব মুসলমান এন্টিরেসিস্ট তারা বিশ্বাসঘাতক। বিশ্বাসঘাতকদের বাংলাদেশে জায়গা নেই, তেমনি ইতিহাসের দিক থেকে আক্রমণকারীদের জায়গা নেই। মৌলবাদীদের এবং মৌলবাদী রাষ্ট্রের সমাজ বাস্তবতা এভাবে নির্মিত।

পশ্চাৎপদতার বাস্তবতা এবং তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া থেকে মৌলবাদ তৈরি হয়। অর্থনৈতিক প্রান্তিকতার দরুন দারিদ্র্য বাড়ে, দক্ষিণ এশিয়ায় তাই দেখা যাচ্ছে, তার ফলে মানুষজন অসহিষ্ণু, রেসিস্ট ও এথনোসেন্ট্রিক হয়ে উঠেছে। মৌলবাদীরা এই অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে। তারা কখনও চুপিচুপি, কখনও উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকে : সশস্ত্র হয়ে ধর্মের কাছে প্রত্যাবর্তন করো, ধর্মকে রক্ষা করো নাস্তিকদের হাত থেকে। নাস্তিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার অর্থ আল্লাহর পক্ষে লড়াই করা। কিন্তু আল্লাহকে রক্ষা করার অর্থ কি সশস্ত্র হওয়া আর সশস্ত্র হওয়ার অর্থ কি সংখ্যালঘুকে হত্যা করা? সশস্ত্র হওয়ার অর্থ কি সংখ্যাগুরুর যে অংশ মৌলবাদীদের বিরোধী তাদের হত্যা করা? এই অর্থে মৌলবাদীদের মধ্যে ধর্মজ সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা আছে, যে উন্মদনা উঁচু করে রাখে জাতীয় সংখ্যাগুরুর রেসিয়াল ও সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব। এই শ্রেষ্ঠত্বের ঝা-া বরদার হচ্ছে মৌলবাদীরা, তাদের চোখে অন্য মুসলমানরা নিকৃষ্ট, অন্য সংখ্যালঘু নিকৃষ্ট, সেজন্য অন্যদের দেশ ও জাতির সীমানা থেকে বহিষ্কার করা জরুরী।

এই কারণে ‘অন্য’ হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ। রাষ্ট্র যেমন বহুবাদী নয়, তেমনি কৃত্রিম ঐক্য জাতীয়তাবাদের ইমেজ তৈরি করে না। মৌলবাদীরা সংখ্যাগুরু মুসলমানদের রাষ্ট্রের মধ্যে কোণঠাসা করে রাজনৈতিক অর্থে সংখ্যাগুরু হতে চায়, একই সঙ্গে সংখ্যালঘুকে হত্যা করতে চায়। সেজন্য তাদের মতাদর্শ হচ্ছে হত্যার রাজনীতি, হত্যার সংস্কৃতি ও হত্যাভিত্তিক সমাজ তৈরি করা। এই জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্স উগ্র, সেজন্য জঙ্গী, ধর্মজ, অন্য ধর্ম বিরোধী, অন্য সংস্কৃতিবিরোধী এবং অন্য ইতিহাসবিরোধী। অন্যান্য জাতিরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সম্পর্ক এই প্রক্রিয়ায় যুদ্ধের মতো করা মৌলবাদীদের স্ট্র্যাটেজি। অন্য রাষ্ট্র হচ্ছে শত্রু কেবল তাই নয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরের বিভিন্ন সংখ্যালঘুরা শত্রু এবং মৌলবাদবিরোধী মুসলমানরাও শত্রু। এসব বিভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা যেমন জিহাদের নামান্তর, তেমনি ফরজ। সেজন্য বিভিন্ন শত্রুরা হচ্ছে ধর্মবিরোধী, ধর্মবিরোধীদের রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা আবশ্যিক কর্তব্য, তেমনি হত্যা করাও আবশ্যিক কর্তব্য।

এই ধরনের উগ্র জঙ্গী হেজিমনিক এথনোসেন্ট্রিক চিন্তা জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিকে কদর্য করছে, রাজনৈতিক দলের গঠনকে নোংরা করছে, ধর্মজ সংগঠনগুলোকে শুভ চিন্তার বলয় থেকে বহিষ্কার করে দিচ্ছে এবং রাষ্ট্রের মধ্যে আমরা ও তারা’র মনোভাব সৃষ্টি করছে। ‘আমরা’ হচ্ছি আল্লাহ প্রেরিত ও ‘তারা’ হচ্ছে শয়তান প্রেরিত। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরের ক্ষুদ্র জাতিগুলো এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো হেজিমনিক জাতীয়তাবাদের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই জাতীয়তাবাদ থেকে তৈরি হয় এথনিক স্মারক, এই স্মারক বাদে অন্য স্মারক বৈধ নয়। জাতীয় সংস্কৃতি হচ্ছে প্রবল মৌলবাদী শ্রেণীর (শ্রেণীকে বলা যায় মৌলবাদীদের) এবং মৌলবাদ অধ্যুষিত অঞ্চলের (বাংলাদেশের যেসব এলাকায়, যেমন সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম) সংস্কৃতি : অন্য সংস্কৃতি এবং সমাজব্যবস্থা মৌলবাদীরা আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

মৌলবাদ, বর্তমান মুহূর্তে হয়ে উঠেছে জামায়াত, বিএনপি, হেফাজতের রাজনীতি। এই রাজনীতি স্থানিক এথনিক আইডেনটিটি এবং মৌলবাদী কর্তৃত্বের সীমারেখা বদলে দিচ্ছে। এই সীমারেখার সঙ্গে যুক্ত করে চলেছে ট্রান্স-ন্যাশনাল এলিটদের ডিসকোর্স (যেমন মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, ভারত ও আফগানিস্তান)। এই ডিসকোর্সের সঙ্গে যুক্ত সশস্ত্র শক্তির মহড়া, যে মহড়ায় যুক্ত হওয়া শুরু করেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূবলের মৌলবাদী সংগঠনগুলো। মৌলবাদীরা প্রজাতন্ত্র ভাঙ্গতে চাচ্ছে, কিন্তু রেখে দিতে চাচ্ছে নাকি সবকিছু। নারী নির্যাতন বহাল থাকবে, গরিবরা মুরগির মতো ঘুরবে, স্বল্প মজুরিতে মেয়েরা কাজ করবে, ধর্মগ্রন্থের বাইরে লেখাপড়ার প্রয়োজন নেই, যারা রাজনৈতিক প্রতিযোগী তাদের খুন করা হবে, এভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হবে আল্লাহর হুকুমত। এই হুকুমতের বিরুদ্ধে মানুষ সজাগ, তারা এই হুকুমতবিরোধী।

মৌলবাদের এই মুহূর্তে, প্রকাশ্য সংগঠন বিএনপি। মুসলিম লীগ মরে গেছে; কিন্তু মুসলিম লীগের মতাদর্শ বিএনপি ধারণ করে আছে। এই মতাদর্শের অর্থ : নন-সেক্যুলার রাজনীতিকে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিশালী করা এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক জঙ্গীবাদ ব্যবহার করা। সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতি হচ্ছে মুসলমানদের রাজনীতি, মুসলমানদের রাজনীতির ফেন বাংলাদেশ এবং সংখ্যালঘিষ্ঠের অর্থ হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের রাজনীতির মধ্যে অধস্তন হয়ে থাকা। বিএনপির মধ্যে দু’ধরনের রাজনীতি যুক্ত। প্রথমটি হচ্ছে মুসলিম সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। দ্বিতীয়টি হচ্ছে মুসলিম সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে উত্থিত সন্ত্রাসী রাজনীতি। এই দুই রাজনীতি বিএনপির রাজনীতির বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই রাজনীতির বাস্তবতার একদিকে আছে মনোলিথিক জাতিক ভৌগোলিকতা, অন্যদিকে আছে বাংলাদেশে একটি একক জাতির প্রাধান্য তৈরি করা, ভারতে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জাতীয়তা তৈরি করা, পাকিস্তানে একটি একক জাতীয়তা প্রবল করা : এইসব অঞ্চল নিয়ে একটি মুসলিম জাতি নির্মাণ করা।

বর্তমান মুহূর্তে, মৌলবাদী প্রধান খালেদা জিয়ার বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা আছে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশকে বহুজাতির দেশ বলে বিশ্বাস করেন না। তাঁর বিশ্বাস মোতাবেক বাংলাদেশে একটি একক জাতি বাস করে, তারা মুসলমান, বাকি সব জাতি : হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, পাহাড়ী এবং আরণ্যক জনসমষ্টি মুসলমান জাতির কাছে অধস্তন, সেদিক থেকে অধস্তন জনসমষ্টির মৌলিক অধিকার নেই।

যে কোন সমাজব্যবস্থায় আত্মঘাতের পথ তৈরি হয় সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে। খালেদা জিয়া, বাংলাদেশে, এই আত্মঘাতের পথ তৈরি করেছেন বিএনপি-জামায়াতের মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে। খালেদা জিয়া তাঁর কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে গুডবাই জানাচ্ছেন। তাঁকে বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। যারা বাংলাদেশে অনবরত আল কায়েদা (আল কায়েদার অপর নাম জামায়াত) তৈরি করে তাদের রাজনীতিতে বিদায় জানাবার সময় এসেছে।

রাজনীতিতে সংখ্যালঘুর অবস্থান পর্যালোচনা করা জরুরী। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সেপারেশন ও পার্টিশনের প্রিন্সিপল কাজ করে চলেছে। বলতেই হয়, পার্টিশনের প্রিন্সিপল সংখ্যালঘু সমস্যার সমাধান করেনি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সংখ্যাগুরুর পাশাপাশি অসম ও অন্যান্য অবস্থার মধ্যে বসবাস করছে। এক্ষেত্রেই কাজ করছে জামায়াত, হেফাজত, হিযবুত, বিএনপি, তালেবানী রাজনীতি-সংস্কৃতি ও সমাজনীতির ধারায়। এও এক ধরনের বর্ণবৈষম্য। এই বৈষম্য কি গ্রহণযোগ্য? এক্ষেত্রে হোমোজিনিয়াস রাষ্ট্রের ধারণা নিয়ে চিন্তা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র, ভারত রাষ্ট্র, পাকিস্তান রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদের ভাঙ্গাচোরা প্রকাশ। এই জাতীয়তাবাদ মাইগ্রান্ট রিফিউজি এবং মাইনোরিটি জনসমষ্টির বাস্তবতার জবাব নয়। আমাদের সেপারেশনিস্ট ও পার্টিশন মডেলের বদলে ভিন্ন এক মডেল নিয়ে ভাবতে হবে, যে মডেল সত্যিকার অর্থে মাল্টি কালচারাল, প্লুরি কালচারাল এবং প্লুরিনিজিয়াস। সংখ্যালঘুরা হচ্ছে ন্যাশনাল কমিউনিটি। এখানেই তালেবানী রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজনীতি ভিন্ন রক্তগঙ্গা বয়ে দিতে চাচ্ছে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তালেবান বাংলাদেশের ভবিষ্যত নয়, কিছুতেই নয়।