১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেয়ালের শহর পেরিয়ে

  • মিলু শামস

গাড়ির কাঁচ ভেদ করে উৎপাত করছে রাত দশটার জ্বলজ্বলে সূর্য। দু’ধারে বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত। মাঝে হাইওয়ে। ফাঁকা রাস্তা তবু নির্দিষ্ট গতিসীমার ওপরে গাড়ির গতি না বাড়ানোর নির্দেশ মেনে চালক চলছেন জুরিখ থেকে প্যারিসের পথে। একজন নন দু’জন চালক। ছ’শ’ কিলোমিটার চালাতে হবে। একজন বিশ্রাম নেবেন অন্যজন চালাবেন। তাই দু’জনার ব্যবস্থা। বার্লিন থেকে প্রাগ, প্রাগ থেকে ভিয়েনা, ভিয়েনা থেকে মিউনিখ, মিউনিখ থেকে জুরিখ- সবখানে চালক ছিলেন একজন। তাই গাড়ি চলেছে তিন ঘণ্টা পর পর নির্দিষ্ট বিরতি দিয়ে। এটা বাধ্যতামূলক। দূরের রাস্তায় এ নিয়ম মানতেই হবে। যদিও পথের দৈর্ঘ্য কোনখানেই এবারের মতো এত বেশি ছিল না। বার্লিন থেকে প্রাগের দূরত্ব তিন শ’ একান্ন কিলোমিটার। প্রাগ থেকে ভিয়েনা তিন শ’ বত্রিশ কিলোমিটার। সীমান্ত প্রহরী নেই। পাসপোর্ট ভিসার আনুষ্ঠানিকতা নেইÑ এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঢুকছে একই শহরের রাস্তায় চলার মতো করে। নতুন দেশের সীমান্ত শুরু বোঝা যায় শুধু সাধারণ এক সাইনবোর্ডে, সে দেশের নাম দেখে। আরেকটা পরিবর্তন অবশ্য সূক্ষ্ম চোখে ধরা পড়ে। তাহলো ল্যান্ডস্কেপ। খেয়াল করে দেখলে এক দেশের ল্যান্ডস্কেপের সঙ্গে অন্য দেশের ল্যান্ডস্কেপের কিছু না কিছু পার্থক্য অবশ্যই চোখে পড়ে।

বার্লিন থেকে জার্মানির সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে রাস্তায় সবচেয়ে কমন যা চোখে পড়ে তাহলো, খাঁচার মতো বিশেষ এক ধরনের লরিতে ব্র্যান্ডনিউ গাড়ি বয়ে নেয়ার দৃশ্য। কারখানা থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়ি এভাবে শোরুমে নেয়া হয়। মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, ফক্সওয়াগান, পোরশে, অডি, ওপেলের মতো বিশ্বের প্রথমসারির গাড়ির কারখানাগুলো জার্মানিতেই। হাইওয়ের পাশে বড় সাইনবোর্ড লাগানো এদের একাধিক কারখানা ও শোরুম চোখে পড়ে। জার্মানির সীমানা পেরিয়ে চেক রিপাবলিকে পা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ দৃশ্য উধাও। দৃশ্য বদল হয় দু’পাশের খামার ও গাছপালারও। আকাশের রঙ স্বচ্ছ নীল ঠিকই, গাছপালাও গাঢ় সবুজ। তারপরও কোথায় যেন পার্থক্য আছে। জার্মানির খামার ও বড় গাছের সারিগুলো সাজানো-গোছানো সযতœ পারিপাট্য বড় বেশি চোখে পড়ে। আর চেক-এর দৃশ্য অনেক বেশি প্রাকৃতিক। অনেক বেশি আন্তরিক মনে হয়। প্যারিসের পথের ল্যান্ডস্কেপ আবার একেবারে অন্য রকম। বাংলাদেশের মতো টানা সমতলভূমি। তাতে বিভিন্ন ধরনের ফসল। পরিচিত ফসলের মধ্যে গম আর ফলের মধ্যে আঙুর ক্ষেত। অচেনা আরও ফসল রয়েছে ক্ষেতে।

এই তাহলে ফ্রান্স! ফরাসী বিপ্লবের দেশ! রুশো, ভলতেয়ার, দিদেরো আর ‘এনসাইক্লোপিডিস্ট’ আন্দোলনের দার্শনিক চিন্তাবিদদের দেশ। এতকাল শুধু বইয়ে পড়েছি। এখন চলেছি একেবারে এর বুকের ওপর দিয়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে ফরাসী বিপ্লব সমৃদ্ধ এক মাইলফলক। মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগের মধ্যে স্পষ্ট বিভেদরেখা। বিপ্লবের আগে দেশে দেশে নানা ধরনের শাসনব্যবস্থা চালু ছিল। ফ্রান্স ছিল অভিজাত স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের দখলে। ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব হয়ে গেলেও শাসনব্যবস্থা ছিল জমিদার ও ধনী ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রিত রাজতন্ত্র। স্পেনে অভিজাততন্ত্র, রাজতন্ত্র আর চার্চের কর্তৃত্ব। রোমান সাম্রাজ্য ভেঙ্গে জার্মান যুক্তরাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। আর প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া এবং রাশিয়ার মধ্যে চলছে ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা। ফরাসী বিপ্লবের পর সামন্ততন্ত্রবিরোধী বুর্জোয়া আদর্শ ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতীয়তাবাদের ধারণা দানা বাঁধতে থাকে। বুর্জোয়া প্রগতিশীলরা সে সময় উদারনীতিবাদ ও জাতীয়তাবাদ প্রচারে সরব ছিলেন। তবে একটা বিষয় বেশ অদ্ভুত লাগে, আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে এসে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সমাজ যেভাবে দ্রুতগতিতে এগিয়েছে জার্মানি কিন্তু সেভাবে এগুতে পারেনি। আধুনিক জাতীয়তাবাদের ধারণাটুকুও সে দেশে পৌঁছতে অনেক সময় লেগেছে। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে বুর্জোয়ারা যখন সবকিছুর নিয়ামক, ফরাসী দার্শনিক-চিন্তাবিদরা সমাজ বিপ্লবের চালিকা হিসেবে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছেন, জার্মানি তখনও সামন্ততান্ত্রিক দরবারের ঘেরাটোপে রুদ্ধ। ফরাসী দার্শনিকদের চিন্তার ঢেউ এ দেশে আছড়ে পড়লেও তা জনগণের মধ্যে সাড়া জাগাতে পারেনি। এর অন্যতম কারণ হতে পারে জার্মানির রাজনীতিতে ফ্রান্সের মতো সাধারণ মানুষের সরব উপস্থিতি না থাকা। এখানেই ফ্রান্সের অভিনবত্ব। বিপ্লবপূর্ব মধ্যযুগের ইউরোপীয় সমাজ তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম ভাগ বা ফার্স্ট এস্টেটে ছিলেন যাজক, সেকেন্ড এস্টেটে রাজা আর এদের সম্মিলিত অত্যাচারে জর্জরিত কৃষক ও শ্রমজীবীদের থার্ড এস্টেটে ছিলেন বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা। যাজক ও রাজার নেতৃত্বে শ্রমিকের ওপর সামন্ত নির্যাতনে শ্রমজীবীদের সঙ্গে বুর্জোয়ারাও বিক্ষুব্ধ ছিলেন। তাই বুর্জোয়া নেতৃত্বে বিপ্লবে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। ফ্রান্স এবং প্যারিস নিয়ে আগামী সপ্তায় বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল।

বার্লিন থেকে প্রাগ যাওয়ার কথা হচ্ছিল। চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগে পৌঁছার বেশ আগে দেখা হয় দানিয়ুবের সঙ্গে। হ্যাঁ, বিখ্যাত সেই দানিয়ুব নদী। চারটি রাজধানী শহরসহ ছোটবড় অনেক শহরের ওপর দিয়ে বইছে। ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ নদীর মতো এত শহর স্পর্শ করতে পারেনি পৃথিবীর আর কোন নদী। যে চারটি রাজধানীর ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তা হলোÑ সেøাভাকিয়ার রাজধানী ব্লাটাসেøাভা, হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট, সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড ও অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা। বিশ্ববিখ্যাত কম্পোজার মোৎসার্টের কর্মস্থল ভিয়েনায় গেলে কাউকে বলে দিতে হয় না তিনি দীর্ঘদিন এ শহরে বাস করেছিলেন। তার জীবনকাল সতেরো শ’ ছাপান্ন থেকে সতেরো শ’ একানব্বই সাল। আজও কি ভীষণ জীবন্ত তিনি ভিয়েনায়! বিশেষ করে পর্যটকপ্রধান এলাকায়। রাস্তার মোড় থেকে স্যুভেনির শপ- যেদিকে তাকানো যায় তিনি আছেন কোন না কোনভাবে।

মোৎসার্ট ছাড়াও ইউরোপের বিখ্যাত অনেক কম্পোজার ও মিউজিশিয়ান কাজের সুবাদে এ শহরে এসেছেন। সমৃদ্ধ করেছেন এ অঞ্চলের সঙ্গীতকে। সাঙ্গিতিক উত্তরাধিকারের জন্য ভিয়েনাকে সিটি অব মিউজিকও বলে। আরও এক বিশেষণ রয়েছে এ শহরেরÑ ‘সিটি অব ড্রিমস।’ বিশ্বের প্রথম মনোবিশ্লেষক সিগমুন্ড ফ্রয়েড জন্মেছেন এখানে, তাই এ নাম। বাইরের দুনিয়ায় ভিয়েনার পরিচিতি আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সংস্থার হোস্ট দেশ হিসেবেও। জাতিসংঘ ও ওপেক এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। অনেক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে এখানে, অনেক বৈঠক বসেছে। সবশেষ ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা গ্রিস সমস্যা নিয়ে বসেছিলেন। সিটি সেন্টারের ভবনগুলোর নক্সা অপূর্ব। এগুলোও দর্শনীয়। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত গোটা সিটি সেন্টার।

প্রাগ পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে যায়। ছোট-সুন্দর, ছিমছাম শহর প্রাগের ভূমি গঠিত হয়েছে পোলিওলিথিক যুগে। যেমন প্রাচীন প্রাগ তেমনি শহরের ক্যাসেল। গিনেস বুক অব রেকর্ডসের মতে, ‘প্রাগ ক্যাসেল’ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাচীন ক্যাসেল। নবম শতকে নির্মিত এ ক্যাসেল চেক রিপাবলিকের প্রেসিডেন্টের অফিসিয়াল বাসভবন। দৈর্ঘ্যে পাঁচ শ’ সত্তর মিটার এবং প্রস্থে এক শ’ তিরিশ মিটার। দুর্গের কোন এক গোপন কুঠুরিতে রক্ষিত আছে ‘বোহেমিয়ান ক্রাউন জুয়েলস।’ রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে বোহেমিয়ান রাজাদের ক্ষমতার প্রতীক ছিল এটি। প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলাকাটুকু সংরক্ষিত থাকলেও ক্যাসেলের পর্যটকরা উপভোগ করতে পারেন প্রেসিডেন্ট ভবন প্রহরীদের ডিউটি বদলের নান্দনিক দৃশ্য। দুপুর বারোটায় মার্চপাস্ট করে একদিক থেকে আগের শিফটের প্রহরীদল বেরিয়ে যান, অন্যদিক থেকে পরের শিফটের প্রহরীরা ঢোকেন।

‘চার্লস ব্রিজ’ প্রাগের বিখ্যাত ঐতিহাসিক সেতু। আঠারো শ’ একচল্লিশ সাল পর্যন্ত প্রাগ ক্যাসেল এবং শহরের পুরনো অংশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ছিল এ সেতু। চার্লস ব্রিজ নিয়ে দারুণ এক কিংবদন্তি রয়েছে- রাজা চতুর্দশ চার্লসের চারজন রানী ছিলেন। তাদের একজন মৃত্যুর আগে যে পাদ্রির কাছে কনফেস করেছিলেন রাজা তাকে ডেকে জানতে চান রানী তাকে কী গোপন কথা বলেছেন। চারজনের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী এই রানীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে রাজা সন্দেহ করতেন। কনফেসের কথা প্রকাশ না করার ধর্মীয় কঠোর নির্দেশ মেনে পাদ্রি রাজাকে তার অপারগতার কথা জানালে রাজা চার্লস ক্রুদ্ধ হয়ে ব্রিজ থেকে তাকে নদীতে ফেলে দেন। ক’দিন পর দেখা যায় পাদ্রি পানিতে ভেসে উঠেছেন আর তার মাথার চারপাশে জ্বলজ্বল করছে পাঁচটি তারা। খ্রিস্টধর্মানুযায়ী যার অর্থ তিনি সন্ত বা সেইন্ট হয়ে গেছেন। সেই থেকে এ ব্রিজ পবিত্রতার প্রতীক। সন্ত হওয়া সেই পাদ্রির ছোট ভাস্কর্য রয়েছে ব্রিজের রেলিংয়ের গায়ে আর রেলিংয়ের সঙ্গে ঝুলছে শত শত তালা। প্রেমিক-প্রেমিকারা এসে সন্তর ওই ভাস্কর্যে হাত রেখে মনের ইচ্ছাটি আওড়ে তালাবদ্ধ করে রাখেন ব্রিজের রেলিংয়ে। বিশ্বাস, সন্তর আশীর্বাদে পূর্ণ হবে মনোবাঞ্জা।

কি অদ্ভুত মানুষের বিশ্বাস! শুধু প্রাচ্য নয় পাশ্চাত্য মনেও কুসংস্কার আছে। এরকম তালাবদ্ধ ব্রিজের রেলিং রয়েছে সুইজারল্যান্ডের জুরিখেও। তবে ওই ব্রিজের কিংবদন্তি জানা হয়নি।