১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রেড তালিকায় শতাধিক প্রকল্প

  • যে কোন সময় বাতিল

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ রেড তালিকাভুক্ত করা হয়েছে শতাধিক প্রকল্প। যে কোন সময় বন্ধ করে দেয়া হতে পারে এসব প্রকল্প। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (এডিপি) আওতায় বাস্তবায়নাধীন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা এ সব প্রকল্প নানা কারণে বছরের পর বছর কোন অগ্রগতি ছাড়াই এডিপিতে আছে। অনুমোদনের কয়েক বছর পার হলেও এ সব প্রকল্পে পাঁচ শতাংশের কম অর্থ ব্যয় হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রালয়ের নির্দেশে এমন প্রায় ১২৫টি প্রকল্পের তালিকা করেছে বাস্তবায়ন মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগ (আইএমইডি)। এ সব প্রকল্পের ভাগ্য এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যে কোন সময় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেলেই এ সব প্রকল্প বাদ দেয়া হবে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল বলেছেন, এখন থেকে একটি প্রকল্পের সংশোধন বারবার করা যাবে না। প্রকল্পের সংশোধনের প্রয়োজন হলে নতুন প্রকল্প হিসেবে আনতে হবে। যেসব প্রকল্প বছরের পর বছর ধরে চলছে এ রকম ১০০ থেকে ১২৫টি প্রকল্প বর্তমানে বছরের পর বছর ধরে চলমান রয়েছে। আমরা মনে করি, এ সব প্রকল্প বাস্তবায়নের আর দরকার নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেতে এ প্রকল্পগুলো আমরা একনেকে উত্থাপন করবো।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমি সঙ্কট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, তদারকিতে আইএমইডির দুর্বলতা, কারিগরি দক্ষতার অভাব, অর্থ ছাড়ে বিলম্বসহ নানা কারণে প্রকল্প সঠিক সময়ে শেষ করা যায় না। রাজনৈতিক কারণে সামর্থ্য ও সক্ষমতা বিবেচনা না করে মাত্রাতিরিক্ত প্রকল্প হাতে নেয়ার ফলেই এমনটি হচ্ছে। চিহ্নিত এ সব সমস্যা এখন পুরনো। কিন্তু এগুলোর সমাধান বা উত্তরণে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও সেগুলোর এখন কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি। বারবার উন্নয়ন প্রকল্প সংশোধনের নামে ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। ফলে এ সব প্রকল্প থেকে যে সুফল পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এডিপি বাস্তবায়নে পুরনো সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে ঝুলে থাকা প্রকল্প বাদ দেয়া হচ্ছে।

সূত্র জানায়, কুমিল্লা শিল্পনগরী-২ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১০ সালের জুলাই মাসে। কিন্তু জমিসংক্রান্ত জটিলতায় কোন কাজ শুরু হয়নি। প্রকল্পের মেয়াদ প্রথম দফায় শেষ হওয়ায় আরও একবার বাড়ানো হয়। সেটিও শেষ হয়েছে ২০১৩ সালের জুনে। এরপরও সাড়ে ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৭ লাখ টাকা। এ প্রকল্পটি রুগ্ন হওয়ার কারণ হিসেবে জানা গেছে, জমি নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় কোন কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। প্রথম উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) যে জমি ঠিক করা হয় সেটি পরে পাওয়া যায়নি। নতুন স্থান নির্ধারিত হলেও মূল্য বেশি দেখিয়ে ফেরত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। তবে গ্যাস ও বিদ্যুত লাইনের মূল্যায়নসহ শিল্প মন্ত্রালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের রেড তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য এমন কয়েকটি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছেÑ শ্রীমঙ্গল শিল্পনগরীর হাওর অঞ্চলে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, ভৈরব বিসিক শিল্পনগরী, পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া থেকে গঙ্গামতি সড়কে আন্দারমানিক নদীতে ৬৫০ মিটার দীর্ঘ আরসিসি ডেকযুক্ত প্রি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ, ৪০০/২৩০ কেভি গ্রীড নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট, সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বাংলাদেশ চ্যান্সেরী কমপ্লেক্স নির্মাণ, ১৫০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী গাড়ি সংগ্রহ, রেলওয়ের ডেম্যু সংগ্রহ, রেলওয়ের কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন পুনর্বাসন, শীপ পার্সোনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন, পাবনা নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন এবং চকবাজারের লালচান্দ রোড সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন।

ঝুলে থাকা প্রকল্পগুলোর বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল আরও বলেন, এডিপির আওতায় বারো থেকে তেরো শ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর মধ্যে একটি বড় অংশ নানা জটিলতায় বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। এ সব প্রকল্প আইএমইডি চিহ্নিত করেছে। মূলত জমি, মামলা মোকদ্দমাসহ নানা জটিলতায় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। আবার অনেক প্রকল্পের আগে প্রয়োজনীয়তা থাকলেও সময়ের প্রেক্ষাপটে দরকার নেই। আগে যে নদীটি ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন ছিল, সেটি পুরোপুরি ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থা বেরিয়েছে। এমন রুগ্ন প্রকল্পগুলো বাদ দেয়া হবে। তিনি বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে একনেক বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। সেখান থেকেও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দিক নির্দেশনা পাওয়া যাবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ঝুলে থাকা এ সব প্রকল্পগুলো বাদ দিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় কমানো যেতে পারে। যেসব প্রকল্প ৫ থেকে ১০ বছরেও এক তৃতীয়াংশ বাস্তবায়ন হয়নি, সেগুলো এডিপিতে বছরের পর বছর ধরে রাখার কোন যুক্তি নেই। তিনি বলেন, সরকারের বা নেতৃত্বের সঙ্গে অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আসে। তখন অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন মুখ থুবড়ে পড়ে।

আইএমইডির এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩Ñ১৪ অর্থবছরে ২৩৩টি প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন করা হয়নি। প্রতিটি প্রকল্পে অতিরিক্ত সময় লেগেছে দুই বছরের বেশি, যা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৭৪ শতাংশ বেশি সময়ক্ষেপণ। এ দীর্ঘ কালক্ষেপণের কারণে সমাপ্ত হওয়া প্রকল্পগুলোর প্রতিটির বিপরীতে গড় ব্যয় বেড়েছে ৫১ দশমিক ১১ শতাংশ বা ৪০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এ হিসাবে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৯ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। সময়মতো বাস্তবায়ন হলে অতিরিক্ত এ ব্যয় হতো না।

প্রকল্পের গুণগত বাস্তবায়ন বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী এর আগে বলেছিলেন, এডিপি বাস্তবায়নে আমরা একটা দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়েছি। কোন বছর একটু বেশি বাস্তবায়ন হয়। কোন বছর একটু কম। বারবার উন্নয়ন প্রকল্প সংশোধনের নামে ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, এ সব প্রকল্প থেকে যে সুফল পাওয়ার কথা তা পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এডিপি বাস্তবায়নে পুরো কালচারকে পরিবর্তন করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রকল্প প্রস্তাবনা, প্রণয়ন ও মূল্যায়নের গতানুগতিক পদ্ধতির পরিবর্তন আনতে হবে। তাহলে দাতা সংস্থাগুলোর অর্থ যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে উন্নয়নে দুর্নীতি কমে আসবে।