২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিন্ডিকেটের দখলে রডের বাজার

  • প্লেট ও বিলেটের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ব্যাপকভাবে হ্রাসের পরও ব্যাপক তারতম্য

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ জাহাজের পাশাপাশি বিলেটের মূল্য ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় দেশে স্ক্র্যাপ জাহাজের প্লেট থেকে উৎপাদিত রড ও আমদানির বিলেট থেকে উৎপাদিত রডের বাজারমূল্যে ব্যাপক তারতম্য বিরাজ করছে। অভিযোগ উঠেছে, বিলেট আমদানির মাধ্যমে যে সমস্ত রি-রোলিং মিল রড উৎপাদন করছে তা বাজারজাতকরণে সিন্ডিকেট গঠনের মাধ্যমে মূল্যের পতন ধরে রেখেছে। পক্ষান্তরে আমদানির স্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে প্রাপ্ত প্লেটের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পাওয়ায় এ থেকে উৎপাদিত রডের মূল্য টনপ্রতি ৯ হাজার টাকা হ্রাস পেয়েছে। পক্ষান্তরে, বিলেট থেকে উৎপাদিত রডের বাজার মূল্য হ্রাস পেয়েছে মাত্র এক হাজার টাকা। এরফলে নির্মাণ কাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারে রড ক্রেতারা ঠকছে। সিন্ডিকেট প্রকৃত বাজার মূল্যের চেয়ে অধিকহারে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

স্ক্র্যাপ জাহাজ, রড ব্যবসায়ী ও এ সেক্টরের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ জাহাজের প্লেট ও ৪০ ও ৬০ গ্রেডের লোহা উৎপাদনের কাঁচামাল বিলেটের মূল্য সমভাবে ব্যাপকহারে হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য পরিসংখ্যান দিয়ে সূত্র জানায়, গেল অর্থবছরে আমদানিকৃত স্ক্র্যাপ জাহাজের গড়মূল্য ছিল টনপ্রতি ৪৮০ মার্কিন ডলার। যা কমে বর্তমানে ৩৪০ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। একইভাবে বিলেটের মূল্য ৫শ’ মার্কিন ডলার থেকে কমে ৩২৫ ডলার হয়েছে। এই দু’পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য কমা এখনও অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় দেশে স্ক্যাপ জাহাজ থেকে প্রাপ্ত প্লেট থেকে উৎপাদিত প্রতিটন রডের মূল্য ৩৭ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। অথচ, তিনমাস আগেও এ ধরনের রডের মূল্য ছিল টনপ্রতি ৪৮ হাজার টাকা। পক্ষান্তরে, বিলেটের মূল্য যখন টনপ্রতি ৬শ’ ডলার ছিল তখন বিলেট থেকে উৎপাদিত রড বিক্রি হত টনপ্রতি ৫৫ হাজার টাকায়। বর্তমানে বিলেটের আন্তর্জাতিক বাজার ৩২৫ মার্কিন ডলারে নেমে আসার পরও দেশে এ থেকে উৎপাদিত রড বিক্রি হচ্ছে টনপ্রতি ৫৪ হাজার টাকায়। দু’ধরনের রডের দেশীয় বাজারমূল্যে এত তারতম্যের কারণে স্ক্র্যাপজাত লোহা থেকে উৎপাদিত রডের ব্যবসা মার খাচ্ছে। পক্ষান্তরে, বিলেট আমদানিতে জড়িতরা সিন্ডিকেট গঠনের মাধ্যমে অধিক মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে।

এদিকে, বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং এ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিএ) সূত্র পরিসংখ্যান দিয়ে জানিয়েছে, গেল ২০১৪ সালের শুরু থেকে এবং বিশেষ করে চলতি বছরের প্রথমার্ধে দেশজুড়ে ভয়াবহ সহিংসতার কারণে এ ব্যবসায় রীতিমত বিপর্যয় নেমে আসে। টানা প্রায় ছয়মাস জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পে স্ক্র্যাপ লোহা, তামা, পিতলসহ সব ধরনের মালামাল বিক্রি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকে। কিন্তু ইয়ার্ড বন্ধ থাকলেও ব্যাংক ঋণের সুদ গণনা বন্ধ ছিল না। এ অবস্থায় জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ এখন ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশিতে উন্নীত হয়েছে। ফলে স্ক্র্যাপ জাহাজের বিপরীতে গৃহীত ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ইয়ার্ড মালিকরা ক্রয়মূল্যের চেয়ে বহু কমদামে মালামাল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এ অবস্থায় মোটা অঙ্কের অর্থের লোকসানের শিকার হয়ে পুঁজি হারিয়েছেন বেশকিছু স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিকারক ও ইয়ার্ড ব্যবসায়ী। অনেকেই বাধ্য হয়ে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিই বন্ধ করে দিয়েছে। অপরদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামে ফৌজদারহাট থেকে সীতাকু- উপকূলজুড়ে গড়ে উঠা দেশের একমাত্র জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের ১২৫টি ইয়ার্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪০টি এখন সক্রিয় রয়েছে। এর জের হিসেবে এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ৫ লাখ শ্রমিক কর্মচারীদের কর্মসংস্থান বিপর্যয়ের দিকে চলে গেছে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক জারিকৃত ডেফার্ট পেমেন্টে এলসির ক্ষেত্রে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ঋণের কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আরোপ করার ফলে এ খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য তা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আবির্ভূত হয়েছে বলে সূত্রে দাবি করা হয়েছে। কারণ, বছরে যেখানে কিস্তি পরিশোধের কথা ছিল সেখানে এখন ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে তা পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ ধরনের সার্কুলার সাংঘর্ষিক বলেও দাবি করা হচ্ছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএসবিএ’র পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইতোমধ্যেই নানা সুপারিশ প্রেরণ করা হয়েছে। যারমধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক শিল্প, হিমায়িত খাদ্যসহ বিভিন্ন খাতে সরকার যে প্রক্রিয়ায় সাবসিডি প্রদান করছে এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে রেয়াতিহারে অর্থায়ন করা হচ্ছে অনুরূপ শিপ রিসাইক্লিং সেক্টর রফতানির সঙ্গে জড়িত থাকা সত্ত্বেও এ পর্যন্ত কোন প্রণোদনা পায়নি। সুপারিশে এ সেক্টরের জন্য বিশেষ ফান্ড গঠনের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, এ সেক্টরকে স্মরণকালের মহাসঙ্কট থেকে রক্ষার জন্য শীপ ইয়ার্ড মালিকদের প্রদত্ত ঋণের সুদ মওকুফ করে মূল অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে রিস্ট্রাকচারিং করা বাঞ্ছনীয়।