১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এবার তিস্তার পথে

এবার তিস্তার পথে
  • তিস্তা চুক্তির পথে এগোচ্ছে ঢাকা দিল্লী ;###;এ মাসেই মমতা-মোদি বৈঠক ;###;সিকিম থেকে পশ্চিমবঙ্গের পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে দিল্লীর উদ্যোগ

তৌহিদুর রহমান ॥ ছিটমহল বিনিময়ের পর এবার তিস্তা চুক্তির পথে এগুচ্ছে ঢাকা-দিল্লী। উভয়পক্ষ এখন তিস্তা জট খুলতে কাজ শুরু করেছে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী ১১-১২ আগস্ট দিল্লীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক বৈঠকে বসছেন। এদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট সিকিম থেকে তিস্তায় পানি প্রবাহের নিশ্চয়তা চায় পশ্চিমবঙ্গ। এ বিষয়ে সিকিমের সঙ্গে আলোচনায় বসছেন মোদি। কূটনৈতিক সূত্র এসব তথ্য জানায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের মধ্যে দিয়ে সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন চলছে। সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় গত ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশ ও ভারতের ১৬২টি ছিটমহল বিনিময়ও হয়েছে। তবে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পরে এবার ঢাকা-দিল্লীর মধ্যে তিস্তা চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য আলোচনা শুরু হয়েছে।

ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুটি সমস্যার মধ্যে একটি সীমান্ত চুক্তি, অপরটি তিস্তা চুক্তি। তবে নানা কারণে এই দুটি চুক্তি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পরে সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন হয়েছে। এখনও তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। আর তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রে এক সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিকে পশ্চিমবঙ্গকে পাশকাটিয়ে তিস্তা চুক্তি করতে পারছে না মোদি সরকারও। তাই যেভাবেই হোক মমতাকে রাজি করিয়ে তিস্তা চুক্তি করতে চায় দিল্লী। সেকারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ৬ জুন ঢাকা সফরে এলে মমতাকেও সফরসঙ্গী করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতা-মোদির একসঙ্গে বৈঠকও হয়। বৈঠকে ভারতের দুই নেতাই তিস্তা চুক্তির বিষয়ে আশ্বাস দেন।

দিল্লীতে মোদি-মমতা বৈঠক ॥

সীমান্ত চুক্তির পরে ঢাকা-দিল্লী তিস্তা চুক্তি করতে উদ্যোগ নিয়েছে। এই চুক্তির লক্ষ্যে আগামী ১১-১২ আগস্ট দিল্লীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে এক বৈঠক হবে। সোমবার ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে বলেছে, আগামী ১১-১২ আগস্ট মোদির সঙ্গে বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বৈঠকে কেন্দ্রীয় দিল্লী সরকার ও রাজ্য সরকার সমন্বিতভাবে একটি আর্থিক সহায়তা প্রকল্প চালু নিয়ে আলোচনা করবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে তিস্তা চুক্তির বাস্তবায়ন, পরবর্তী প্রভাব মোকাবেলা ও নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও সেচসহায়তা, ভূগর্ভের পানিতে আর্সেনিক সমস্যার সমাধান ও নতুন নাগরিকদের পুনর্বাসন এ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

সিকিম নিয়ে মমতার অভিযোগ ॥ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, সিকিম থেকে তিস্তায় পানি সরবরাহ কমে আসছে। কেননা সিকিম সরকার তিস্তার মুখে চারটি বাঁধ দিয়ে বড় বড় বিদ্যুত প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ওই বাঁধের কারণেই শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পর্যাপ্ত পানি আসে না। তাই তিস্তা চুক্তি হওয়ার আগেই সিকিম থেকে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে চান মমতা। তিনি এই বিষয়টি ইতোমধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে জানিয়েছেন। এছাড়া মমতা নিজেও সিকিম সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনার জন্য আগ্রহও প্রকাশ করেছেন।

সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা কখনই বলেননি যে, তিনি এই চুক্তির বিপক্ষে। তিনি সব সময় বলে আসছেন, তিস্তা চুক্তিতে তিনি আগ্রহী। তবে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ অক্ষুণœœ রেখেই তিস্তা চুক্তিতে আগ্রহী বলে মমতা জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতি করে তিনি তিস্তা চুক্তির পক্ষে আগ্রহী নয়। আর সিকিম থেকে ঠিকমতো পানি পেলেই পশ্চিমবঙ্গের এ বিষয়ে কোন আপত্তি নেই বলেও মমতা জানিয়েছেন।

সিকিমকেও রাজি করাবেন মোদি ॥ গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়া যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে পাশে রেখেছিলেন, মোদিও ঠিক সেভাবেই মমতাকে পাশে রেখে তিস্তা চুক্তি করতে চাইছেন। তিস্তায় যাতে উজান থেকে বেশি পানি আসে এবং পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ তাদের হিস্যা পায় সেজন্য মোদি সিকিমের সঙ্গেও কাজ করছেন বলে জানা গেছে। সিকিমের পানিই তিস্তায় প্রবাহিত হচ্ছে। আর সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী পবন চামলিং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে কারণে কোন বাঁধা ছাড়াই সিকিমের পানি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে আসতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে আগ্রহী মোদি। এ বিষয়ে সিকিমের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি।

তিস্তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত ॥ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এবারের ঢাকা সফরের আগেই ওই সময়ে যে বহু আলোচিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হবে না, তা আগেই ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছিল। তখন তিস্তা চুক্তি নিয়ে ধৈর্য্য ধরার পরামর্শ দিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সব কিছু রাতারাতি হয় না। এটা নিয়ে আলোচনা চলছে। মোদির ঢাকা সফরের একদিন আগেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, তিস্তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে কূটনৈতিক পর্যায়ে। ডিপ্লোমেসিতে সব কিছু তো পাবলিকলি হয় না। অনেক কিছুই চোখের আড়ালে হয়। তিস্তা চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি।

মোদির আশ্বাস ॥ ঢাকা সফরে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, আমি আত্মবিশ্বাসী যে, ভারতের রাজ্য সরকারগুলোর সহযোগিতায় তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বণ্টনে সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছাতে পারব। আমাদের নদীগুলো দূষণমুক্ত ও নাব্য বজায় রাখতে একসঙ্গে কাজ করব। আমাদের নদীগুলো আমাদের সম্পর্ককে লালন করবে, বিভেদের উৎস হবে না। নদী সীমান্তের দুই পাড়ের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে তা প্রভাবিত করে। পানি একটি মানবিক ইস্যু, যা আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেব।

তিস্তা সমাধানে আগ্রহী মমতা ॥ ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের ঢাকা সফরের সময় তিস্তা চুক্তি সই হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ মুহূর্তে আপত্তি তোলায় বিষয়টি আটকে যায়। এর প্রায় সাড়ে তিন বছরের মাথায় গত ২১ ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকা এসে শীঘ্রই তিস্তার জট খোলার আশা দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর মোদির ঢাকা সফরের সময় মমতারও আসার আলোচনা শুরু হলে পুরনো কাঠামোতে তিস্তা চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আবারও বেঁকে বসেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ঢাকা সফরে তিস্তা চুক্তি না করার আশ্বাস দিয়েই প্রধানমন্ত্রী মোদি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে সফরে আসতে রাজি করান।

মোদির ঢাকা সফরের প্রায় এক সপ্তাহ আগেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ স্পষ্টই জানিয়ে দেন মোদির সফরে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সই হচ্ছে না। তবে তিস্তার আলোচনা প্রসঙ্গে মাহমুদ আলী বলেছিলেন, তিস্তার জন্য একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা অনেক সমস্যার সমাধান করেছি। আর আমাদের সম্পর্ক একটি ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। আমরা নিশ্চই এ বিষয়ে আরও আলোচনা করব।

তিস্তা চূড়ান্ত করতে চায় বিজেপি ॥

দিল্লীর কূটনৈতিক সূত্র জানায়, ঢাকা সফরের পরে এখন তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে তাদের পরিকল্পনা চূড়ান্ত রূপ দিতে চায় বিজেপি সরকার। মমতা গত ১৯-২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সফরে এসে তিস্তার বিষয়ে তাঁর প্রতি আস্থা রাখতে বলেন। তবে তিনি আস্থা রাখতে বললেও তাঁর বিরোধিতার কারণেই ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি হতে হতেও আটকে যায়। ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে সফরে আসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে নিজেকে সরিয়ে নেন মমতা। তিনি তখন বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে এই চুক্তিকে তিনি সমর্থন করতে পারেন না। মনমোহনের সেই সফরে স্থল সীমান্ত একটি চুক্তির প্রটোকল সই হয়, যার মধ্য দিয়ে ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের ১৬২টি ছিটমহল বিনিময়ের পথ খোলে। কিন্তু এই প্রটোকল কার্যকর করতে ভারতের সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হওয়ায় বিষয়টি ঝুলে থাকে। এরপর মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে লোকসভায় সীমান্ত চুক্তি বিল পাসের মধ্যে দিয়ে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা হয়।

ভারতের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি বিষয় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শুরু করলে সীমান্ত চুক্তি ও তিস্তা জট খোলার আশা তৈরি হয়। গত বছর শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করে তিস্তা চুক্তি সইয়ের বিষয়েও জোর চেষ্টা চালানোর আশা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা থেকে ফিরে গিয়ে মমতা বাংলাদেশ সফর নিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে মমতা লিখেন তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে তার বিরোধিতা নেই। এই চুক্তি নিয়ে জট খুলতে তিনি মোদিকে সহযোগিতা দিতেও প্রস্তুত রয়েছেন। এসবের ধারাবাহিকতায় তিস্তাজট এখন খুলতে শুরু করেছে।