২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জয়কে অপহরণের পর হত্যার ষড়যন্ত্র ফাঁস

জয়কে অপহরণের পর হত্যার ষড়যন্ত্র ফাঁস
  • বিএনপির কয়েক নেতা জড়িত ॥ জাসাস নেতা মামুন আসামি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণের পর হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এমন ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর বাংলাদেশেও সজীব ওয়াজেদ জয় অপহরণ ও হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্রের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সহসভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে। এছাড়া বিএনপিসহ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন শীর্ষ নেতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে মামলায়। তবে মামলায় তাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

সোমবার রাতে রাজধানীর পল্টন মডেল থানায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের পরিদর্শক ফজলুর রহমান পিপিএম, বিপিএম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলা নম্বর-১। তারিখ ৩ আগস্ট ২০১৫ইং।

মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে বিএনপি এবং জোটের শীর্ষ পর্যায়ের কতিপয় নেতার যোগসূত্র থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িতরা দেশ-বিদেশে অবস্থান করে অর্থের যোগান দিয়েছেন। আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত মামলার এজাহারনামীয় একমাত্র আসামি জাসাসের সহসভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনকে গ্রেফতার করতে প্রয়োজনে সেদেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত, কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি ও ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, মামলার এজাহারনামীয় একমাত্র আসামি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন। পরিবার নিয়ে কানেটিকাটের ফেয়ারফিল্ড কাউন্টিতে বসবাস করেন তিনি।

দায়েরকৃত মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র পুত্র ও প্রধানমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় বসবাস করেন। ২০১১ সালের আগ থেকেই সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্র চলছিল। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর বাংলাদেশে এ মামলাটি দায়ের করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে দায়ের করা মামলায় জাসাস নেতা মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনের ছেলে রিজভী আহম্মেদ সিজারের সাড়ে ৩ বছর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) প্রাক্তন স্পেশাল এজেন্ট রবার্ট লাষ্টিকের বিচার চলছে। এ মামলায় লাষ্টিকের বন্ধু জোহান্স থ্যালারের আড়াই বছর সাজা দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালত।

বাংলাদেশে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েক নেতারা সজীব ওয়াজেদ জয় অপহরণ ও হত্যা ষড়যন্ত্রে জড়িত। যদিও মামলায় তাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র পুত্র ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যা পরিকল্পনার ঘটনায় দুইটি মামলা হলো। প্রথম মামলাটি দায়ের হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় এবং বাংলাদেশের পল্টন থানাধীন জাসাস অফিসে বসে জয়কে অপহরণের পর হত্যার পরিকল্পনা হয়। পল্টনের জাসাস অফিসে হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের কতিপয় নেতা জড়িত। যারা বর্তমানে বাংলাদেশেই অবস্থান করছে। এমনকি পরিকল্পনার সময়ও তারা বাংলাদেশে অবস্থান করেই জয়কে অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনা করেছে। বাংলাদেশের পরিকল্পনাকারীরা জয়কে অপহরণের পর হত্যা করতে মোটা অঙ্কের টাকারও যোগান দিয়েছে।

চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল পুলিশ সদর দফতরের তরফ থেকে জানানো হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ব্যক্তিগত তথ্য ও অভ্যন্তরীণ দলিল সংগ্রহের চেষ্টা চলার তথ্য প্রকাশ পায়। জয়ের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) একজন প্রাক্তন বিশেষ এজেন্ট রবার্ট লাষ্টিক (৫২) ও তার বন্ধু জোহান্স থ্যালার (৫১) এবং বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাসাসের সহসভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনের ছেলে রিজভী আহমেদ সিজার (৩৬) জড়িত। অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

এ সংক্রান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাষ্টিস ডিপার্টমেন্টের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করে পুলিশ সদর দফতর বলছে, সজীব ওয়াজেদ জয় সম্পর্কে গোপন তথ্য সংগ্রহের জন্য রিজভী আহমেদ সিজারের কাছ থেকে এফবিআইয়ের প্রাক্তন স্পেশাল এজেন্ট লাষ্টিক ও তার বন্ধু থ্যালার কমপক্ষে এক হাজার ইউএস ডলার গ্রহণ করেন।

চলতি বছরের ৯ মার্চ সজীব ওয়াজেদ জয় ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাজে লিখেন, তিনি সেই আদালতে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন, ‘যে আদালতে বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের সহসভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনের ছেলে রিজভী আহমেদ সিজারের সাজা ঘোষণা হয়।’

সজীব ওয়াজেদ জয় আরও উল্লেখ করেন, তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অপহরণের পর হত্যার করার চেষ্টা করা হয়। এজন্য তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব জড়িত। তথ্য সংগ্রহ করতে সাজাপ্রাপ্ত সিজার মাসে ৪০ হাজার ইউএস ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। প্রথম দফায় তথ্য ফাঁসকারীদের ৩০ হাজার মার্কিন ডলার নগদ প্রদান করেন সাজাপ্রাপ্ত সিজার। মামলাটির তদন্ত চলায় নৈতিকভাবে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নাম প্রকাশ করতে পারেন না বলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন সজীব ওয়াজেদ জয়। বিএনপি তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অপহরণের পর হত্যার পরিকল্পনা করছিল বলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একমাত্র পুত্র ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন।

পুলিশ সদর দফতরের ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে বিষয়টি অবহিত করেন। এমনকি সজীব ওয়াজেদ জয় বিএনপি হাইকমান্ড তার ক্ষতি করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এমন ঘটনার প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৩১ মে রাজধানীর রমনা মডেল থানায় পুলিশের তরফ থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি হয়। যার নম্বর ২২৭২। প্রায় দুই মাস ধরে সাধারণ ডায়েরির তদন্ত চলে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের বিষয়টি আদালতকে জানানো হয়। পাশাপাশি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আদালতের কাছে মামলা দায়েরের অনুমতি চাওয়া হয়। আদালত মামলা দায়েরের অনুমতি দেয়। সেই অনুমতির ভিত্তিতেই পল্টন থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়।

মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে গত বছরের সেপ্টেম্বরের আগে যে কোন সময় থেকে তদন্তকালীন সময় পর্যন্ত বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাসাসের সহসভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনসহ বিএনপি ও দলটির নেতৃত্বাধীন জোটভুক্ত অন্যান্য দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের ঢাকার পল্টনের জাসাসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় আসামিরা একত্রিত হয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণের পর হত্যার পরিকল্পনা করে। ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য জাসাস নেতা মোহাম্মদ উল্লাহ মামুনসহ বিএনপি ও বিএনপির জোটভুক্ত অন্যান্য দলের কতিপয় শীর্ষ নেতা রিজভী আহমেদ সিজারকে দায়িত্ব দেয়। পাশাপাশি দেশে ও বিদেশী অবস্থানকারী পরিকল্পনাকারীরা রিজভী আহমেদ সিজারকে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে দেশ-বিদেশী থেকে অর্থের যোগান দেন।