২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ শিশুর অবস্থা উন্নতির দিকে

  • মায়ের দুধ খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ শিশু সুরাইয়ার অবস্থা এখন আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতির দিকে। তার খাবারে বেড়েছে মায়ের দুধ খাওয়ার পরিমাণ। সোমবার ২ ঘণ্টা পরপর ১০ এমএল করে মায়ের বুকের দুধ দেয়া হয়েছিলো। মঙ্গলবার সকাল থেকে এর পরিমাণ বাড়িয়ে ১২ এমএল করা হয়। শিশুটির শরীরে ধারণক্ষমতার ওপর খেয়াল রেখে এ পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। তবে দুধ পান করানো হচ্ছে নলের সাহায্যে। মায়ের কাছে এখনও সন্তানকে নেয়া হচ্ছে না দুধ পানের জন্য। কারণ শিশুটির শরীরের এখনও জন্ডিসের প্রভাব রয়ে গেছে। এছাড়া মায়ের শরীরে ইনফেকশন আছে। সন্তানের এ উন্নতির কথা শুনে মা অধীর অপেক্ষায় কখন সে সন্তানকে বুকে নিতে পারবেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশুটির চিকিৎসক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ কানিজ হাসিনা শিউলি জানান, আস্তে আস্তে শিশুটির খাবারের পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছে। প্রথমে যখন শিশুটিকে এখানে (আইসিইউতে) আনা হয় তখন তার জ-িস ছিল ১৭ পয়েন্ট। এখন ১২ পয়েন্টে নেমে এসেছে। প্রথমে শিশুটির হিমোগ্লোবিন ছিল ৫০ হাজার, যা দরকার দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ। বর্তমানে হিমোগ্লোবিন ৮০ হাজারে উন্নীত হয়েছে। সব মিলিয়ে অবস্থা উন্নতির দিকে বলা গেলেও পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নয়। ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে আশা করি অবস্থার আরও উন্নতি হবে। অবস্থার উন্নতি হলে কয়েক দিনের মধ্যেই সন্তান তার মায়ের কাছে দেয়া হবে।

এদিকে মঙ্গবার গুলিবিদ্ধ শিশুটি দেখতে ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে যান মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি ও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। মঙ্গলবার সকাল ১১টায় মাগুরায় গুলিবিদ্ধ শিশু ও তার মায়ের সঙ্গে দেখা করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। তখন তিনি শিশু ও মায়ের চিকিৎসার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মা নাজমা বেগমের হাতে ৫০ হাজার টাকা অনুদানের চেক তুলে দেন।

মেহের আফরোজ চুমকির তখন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অপরাধী কোন দলের বা গোত্রের তা বিচার করা হবে না। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো এ বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেখবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন, তারা অমানুষ। তারা মানুষের কাতারে পড়েন না। মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটা স্বীকার করতেই হবে সরকার অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছে না। এ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেফতার করার ঘটনাতেই এটা প্রমাণ হয়েছে। যারা অপরাধী, তারা সব সময় তৎপর থাকেন। এ ধরনের ঘটনায় সরকারের পাশাপাশি সক্রিয় ভূমিকা রাখতে জনগণের প্রতিও তিনি আহ্বান জানিয়েছেন।

দুপুর ২টায় শিশুটিকে দেখতে হাসপাতালে যান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। নির্ধারিত পোশাক পরে করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ওয়ার্ডে প্রবেশ করেন। এরপর যান গাইনি বিভাগে, সেখানে চিকিৎসাধীন শিশুটির মা নাজমা বেগম। চিকিৎসায় কোন ধরনের সমস্যা হবে না বলে মন্ত্রী নাজমা বেগম ও শিশুটির বাবা বাচ্চু ভূঁইয়াকে আশ্বস্ত করেন। এছাড়া মন্ত্রী তাদের আর্থিক সহযোগিতাও করেন।

পরে সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেন, শিশুটির প্রতি সরকারের নজর রয়েছে। তাদের চিকিৎসায় কোন অর্থ লাগছে না। সব খরচ সরকার দিচ্ছে। আর গুলির ঘটনায় জড়িতদের সরকার ছাড়বে না। তিনি চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। তাদের চিকিৎসায় মায়ের গর্ভে গুলিবিদ্ধ শিশুটি নিরাপদে রয়েছে। এটি একটি বিরল ঘটনা মায়ের গর্ভেই শিশু গুলিবিদ্ধ। ডাক্তারদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি শিশুটিকে তার মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। আশা করি শিশুটি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে মায়ের কোলে ফিরে যাবে।

এদিকে সোমবার সকালে সন্তানের মুখ দেখলেন মা। পাশাপাশি কক্ষে ৩ দিন ধরে থাকার পরও শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ার কারণে দেখা হয়নি মা-সন্তানের। ১২ দিনের মাথায় নাড়ি ছেঁড়া ধনকে দেখলেন মা নাজমা বেগম। চেয়ারে বসে কাচেঘেরা বেষ্টনীর ভিতরে থাকা প্রিয় সন্তানের মুখ দেখেই সাত রাজার ধন পাওয়ার মতো প্রাপ্তির হাসি। ১৫ মিনিটের এ মিলনে প্রিয় সন্তানকে দেখে মনে শান্তি পেলেও ছুঁতে পারেননি, বুকে নিতে পারেননি আদরের ধনকে। শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকরা সুরাইয়ার সঙ্গে মাকে দেখা করতে দিলেও সবচেয়ে নিরাপদ যে কোল সেই মায়ের কোলে চরতে দেয়নি। ১১ দিনের অপেক্ষার অবসানে তার চোখ বেয়ে নামল জলধারা। বাচ্চার কাছে নিয়ে যাওয়ার সময় চিকিৎকরা তাকে অনুরোধ করেন, কাঁদবেন না। এতে বাচ্চার ক্ষতি হবে। নাজমাও ওড়নায় মুখ চেপে ধরলেন। তবু বাঁধ মানেনি অশ্রু। সবাই তাকে শান্ত থাকতে বললেন। বোঝালেন, আপনার সন্তান খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে। তবে নাজমা দেখলেন তার নাড়িছেঁড়া ধন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। মাঝে-মধ্যে কেঁদে উঠছে। তবুও তাকে বুকে তুলে নিয়ে আদর করতে পারলেন না।