২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মিলেমিশে চাষাবাদ, বসবাস- অভাবী মানুষ মেলা ভার

মিলেমিশে চাষাবাদ, বসবাস- অভাবী মানুষ মেলা ভার
  • ফলের গ্রাম ইদিলপুর

ইফতেখারুল অনুপম ॥ টাঙ্গাইলের ইদিলপুর গ্রাম। বিখ্যাত নানা ধরনের ফলের জন্য। পাওয়া যায় বছরের যে কোন সময়। রসে ভরা আনারস, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, আম, কমলা, কলা, পেঁপে, বাঙ্গি, কুলসহ সব ধরনের ফল পাওয়া যায় ইদিলপুরে। ছায়ায় সুনিবিড়, সারাক্ষণ পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকে গ্রামটি। গারো আদিবাসী আর অন্যান্য জাতি গোষ্ঠীর লোকদের মিলেমিশে বসবাস, চাষাবাদ। এ গ্রামেই প্রথম আনারসের চাষ শুরু হয়। সে থেকেই সারাদেশে এর চাষাবাদ ছড়িয়ে পড়ে।

মধুপুরের আউশনারা ইউনিয়নের গ্রাম ইদিলপুর। গ্রামটি স্থানীয়দের কাছে ‘ফলের গ্রাম’ হিসেবে সমধিক পরিচিত। গ্রামের এক পাশে বাইদ, আরেক পাশে লাল মাটির উঁচু-নিচু টিলা। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট নালা। গ্রামের একপাশ থেকে আরেক পাশে হেঁটে গেলে দেখা যাবে, বিশাল বিশাল আনারসের বাগান। বাগানের আইলের চারপাশে দাঁড়িয়ে হরেক প্রজাতির ফলদ বৃক্ষের সারি। এসব গাছপালার কোনটা প্রাকৃতিকভাবে আবার কোনটা কৃষকের লাগানো। আনারসের পাশাপাশি এসব গাছ থেকে প্রতিবছর কৃষকের বাড়তি আয় হয়, ঘুচে যায় দারিদ্র্য।

গ্রামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত আনারস, কলা, কাঁঠাল, পেঁপে, লেবু আর লিচু বাগান দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। আদিবাসী গারো আর বাঙালীরা এখানে প্রায় শতাব্দী ধরে শুধু ফলের আবাদ করেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। সুলতানী আমলে আদিবাসী গারোরা প্রথমে জঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন করে। ব্রিটিশদের শাসনামলে বাঙালীরাও এ জনপদে গারোদের সঙ্গে বসবাস শুরু করে। জুম চাষের জমিতে বাঙ্গি, বিচি কলা, চিনি চাম্পা, সিমলাই আলু আর ক্ষীরার আবাদ দিয়ে ফল চাষে হাতেখড়ি। শতাব্দীর পরিক্রমায় ফল চাষের বিবর্তনে জায়গা জুড়ে নেয় কাঁঠাল, আনারস, কলা, পেঁপে, কুল আর লিচু। এখন চাষ হচ্ছে উচ্চফলনশীল বিভিন্ন জাতের ফল। গ্রামের লোকসংখ্যা প্রায় চার হাজার, অর্ধেকই গারো।

জানা গেছে, ১৯৪২ সালে ভারতের মেঘালয় থেকে চারা এনে এ গ্রামে প্রথম আনারস আবাদ শুরু করেন গারো কৃষক সনাতন মৃ। পরে আনারসের আবাদ মধুপুর গড়জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে শুধু মধুপুর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার একরে আনারসের আবাদ হয়। মধুপুর হতে এ আনারস পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সিলেট ও উত্তরবঙ্গে। আর কাঁঠাল তো মধুপুর গড়ের নিজস্ব ফল। পঞ্চাশের দশকে শুরু হয় লিচুর আবাদ। আর সর্বশেষ এসেছে কলা আর পেঁপে। এ গ্রামে এখন তিন হাজার ছয় শ’ একরে ফলের আবাদ হয়। তবে সব ছাপিয়ে বাণিজ্যিক আবাদে উঠে এসেছে আনারস, লিচু, লেবু আর কলা। বর্তমানে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আদা, কচু ও হলুদ চাষ। প্রতিবছর এ গ্রামে ৪০-৪৫ কোটি টাকার ফল উৎপন্ন হয় বলে জানালেন ইদিলপুর আনারস চাষী সমবায় সমিতির সম্পাদক আলী আকবর ফকির।

সভাপতি মফিজ উদ্দীন ফকির জানান, এ গ্রামে এখন কোন অভাবী মানুষ নেই। গ্রামের ৯৮ ভাগ মানুষ শুধু ফলের আবাদ করে দারিদ্র্য বিমোচন করেছে। গ্রামের হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ফজলুর রহমান আঙ্গুর জানান, সারা বছরই এ গ্রামে ফল পাওয়া যায়। তবে মে হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত ফলের ভরা মৌসুম। এ সময় সারা গ্রাম ফলের ম ম গন্ধে ভরপুর থাকে। গ্রামের বিয়ে-শাদীসহ নানা অনুষ্ঠান এ সময়েই হয়। এ গ্রামের জেভিযার চিশিম একটানা ৭০ বছর ধরে আনারস আবাদ করেন। আজগর ম-ল ৫৫ বছর, মোকছেদ ম-ল ৫২ বছর এবং নিভারানী রিছিল ৫০ বছর ধরে আনারস আবাদ করেন। ফল আবাদে একেকজন পারদর্শী ও অভিজ্ঞ চাষী। আনারস চাষে তাদের জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা সকলকে বিস্মিত করে বলে জানান স্থানীয় কৃষিবিদরা। এ গ্রামের চাষীরা এক সময়ে আনারস চাষের জন্য মহাজনী ঋণের দ্বারস্থ হতো। এখন অবশ্য এ চিত্র পাল্টে গেছে। ১৯৭৭ সালে আনারস চাষীরা সকলে মিলে একটি সমবায় সমিতি গড়ে তোলেন। চাষীরা সমিতির নাম দিয়েছেন ‘ইদিলপুর আনারস চাষী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড’। সমিতির মূলধন এখন প্রায় আড়াই কোটি টাকা। অসময়ে চাষীরা এখান থেকেই ঋণ গ্রহণ এবং তা পরিশোধ করেন। ফল চাষের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনে মডেল হওয়ায় ‘ইদিলপুর আনারস চাষী সমবায় সমিতি’ জাতীয়ভাবে দু’বার স্বর্ণপদক লাভ করে।

ফল চাষীরা জানান, এ গ্রামে একটি হাইস্কুল, একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাদ্রাসা, ২টি মিশনারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং অনাথ শিশুপল্লী রয়েছে। আর এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ফলচাষীদের উদ্যোগ আর প্রচেষ্টায়। বর্তমানে এ গ্রামে শিক্ষার হার ৮০ শতাংশ।

অভাব-অনটন দূর করার পর এবার ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সমিতির সবাই মিলে কাজ করছেন।

মধুপুর শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে ইদিলপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কাকরাইদ-হাঁটুভাঙ্গা পাকা সড়কের পাশে আনারস গাড়িতে তুলতে ব্যস্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এবার আনারসের দাম ভাল পেয়ে বেজায় খুশি কৃষক। ক্রেতা ও পাইকারেরও কোন অভাব নেই। মধুপুরের আনারস গুণে ও মানে ভাল থাকায় এর চাহিদা প্রচুর। ফলে বিক্রেতারাও লাভবান হচ্ছেন।