২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দাসিয়ারছড়ার মানুষ এবার স্বজন হত্যার বিচার চায়

  • ৬৮ বছর ছিটে ছিল না কোন বিচার ব্যবস্থা

রাজু মোস্তাফিজ কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া থেকে ফিরে ॥ দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের কালীরহাট গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ কৃষক মনির উদ্দিন মঙ্গলবার দুপুরে বাড়ি থেকে বাজার যাচ্ছিলেন। রাস্তায় তার সঙ্গে দেখা। তিনি জানান, আমরা এখন এ দেশের নাগরিক। আমাদের আর কোন লাঞ্ছনার ভয় নেই। এতে আমরা ভীষণ খুশি। তিন তার জীবনের করুণ কাহিনী শোনালেন। ১৯৭০ সাল। তার বাবা শরিয়ত উল্লা এই ছিটের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান বিরোধী ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য স্থানীয় মানুষকে সংগঠিত করতেন। এটি ছিল তার অপরাধ। এ কারণে পাকিস্তানপন্থীরা তাকে জবাই করে হত্যা করেছিল। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১০। কিন্তু ছিটবাসী হওয়ায় বাবার হত্যার বিচার আজও পাইনি। এখন আমরা আইনের শাসন পাব। বাবা হত্যা বিচার চাইব। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মানুষজন এগিয়ে আসবেন এ প্রত্যাশা আমিসহ দাসিয়ার ছড়ার মানুষের। আমাদের দুঃসহ জীবনের অবসান ঘটবে।

দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে দাসিয়ারছড়া ছিটমহলে ছিল না কোন আইনের শাসন। স্থানীয় প্রভাবশালীরাই গ্রাম্য সালিশ করে বিভিন্ন অন্যায় অত্যাচারের মীমাংসা করে দিত। ছিল না কোন বিচার ব্যবস্থা। খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধের ঘটনা ঘটলেও বিচার হয়নি। গ্রাম্য সালিশ কিংবা মোড়লদের চাপিয়ে দেয়া প্রহসনের বিচার নীরবে মেনে নিতে হয়েছে বিচার প্রার্থীদের। গ্রামের প্রভাবশালী এবং মোড়লরা খুনসহ অধিকাংশ বিচারের জরিমানা করতেন টাকায়। এ অর্থের সিংহভাগ টাকা ঢুকত ওই সব বিচারকের পকেটে। এখন সময় বদলেছে। স্বাধীন হয়েছে দাসিয়ারছড়াসহ বাংলাদেশের ১১১ ছিটমহল। এখন স্বজনহারা মানুষরা চার দশক আগের মানুষ খুনের ন্যায় বিচার চায়। ’৭১ পরবর্তী দাসিয়ারছড়ায় খুন হয়েছে ১১ এবং একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অনেক খুনী এখন আর বেঁচে নেই। কিন্তু স্বজনরা ভুলতে পারেনি তাদের দুঃসহ স্মৃতির সেই সব দিনের কথা।

দাসিয়ারছড়ার হাবিটারী গ্রামের প্রতিবাদী মানুষ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গণি। গ্রামের বিভিন্ন অন্যায়ের প্রতিবাদের কারণে মোড়ল কোবাদ হোসেনের পরিকল্পনায় ’৮৫ সালের দিকে খুন হন তিনি। গণির বিধবা স্ত্রী জোবেদা বেওয়া জানান, তার স্বামী গ্রামে কোন অন্যায় হলে প্রতিবাদ করত। এতে সুবিধা করতে পারত না প্রভাবশালীরা। এ কারণে তার স্বামী আব্দুল গণিকে কোবাদ হোসেন, আব্দুল মজিদ ও সিরাজ ভাটিয়াসহ আরও কয়েকজন মিলে পিটিয়ে হত্যা করে। আজও গ্রামবাসী এ ঘটনা ভুলতে পারেনি। তিনি বলেন, তখন আমার ছয়টি সন্তান খুব ছোট। এরই মধ্যে খুনী কোবাদ সুকৌশলে গণির সহচর হাবিবুর রহমান ভাটিয়া, আজিজার রহমান ও আজম আলীকে ফাঁসিয়ে দেয়। প্রহসনের খুনের বিচারে তাদের এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর থেকে তাকে দেয়া হয় মাত্র ৫/৬ হাজার টাকা। বাকি টাকা চলে যায় বিচারকদের পকেটে। জোবেদা বেওয়া বলেন, ‘আমার স্বামী বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন। এখন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। এখন আমি স্বামী হত্যার বিচার চাই।

দাসিয়ারছড়া বোর্ডের হাট এলাকার বড় গৃহস্থ ও ব্যবসায়ী বনিজ উদ্দিন ব্যাপারীর বাড়িতে পর পর ৩/৪ দফা ডাকাতি হয়। শেষবার ডাকাতদের চিনে ফেলেন তিনি। এটাই তার কাল হলো। প্রথমে আব্দুল গফুর তার বাঁ পা কুপিয়ে বিচ্ছিন্ন করে। পরে হানু ডাকাত গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিল শরিয়ত, একাব্বর, ইলসাবেচা ভাটিয়া, কান্দুরাসহ আরও কয়েকজন। এরা সবাই দাসিয়ারছড়া ছিটের অধিবাসী ছিল। বড় ছেলে নমিজ ডাকাতের ভয়ে লুকিয়ে থেকে এসব দৃশ্য অবলোকন করে। নিহত বনিজ ব্যাপারীর দুই ছেলে নমিজ উদ্দিন ও নজরুল ইসলাম এখন এ খুনের বিচার চান। তারা মনে করেন বিলম্বে হলেও খুনীরা চিহ্নিত হোক। যারা বেঁচে আছে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।

দাসিয়ারছড়ার স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছরে খুন হয়েছে আজিমুদ্দিন, মোসলেম ভাটিয়া, গণি মুন্সি, আব্দুল হক, মকবুল হোসেন, পন্থাবাড়ির মোসলেম মেম্বার, আব্দুল হক, আজিমুদ্দিন ও ছফর চেয়ারম্যান । এছাড়া প্রকাশ্যেই ধর্ষণের শিকার হন আর্জিনা নামে এক তরুণী। এ নিয়ে ওই ছিটমহলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে ওই তরুণীকে নিয়ে গোটা পরিবার দাসিয়ারছড়া থেকে পালিয়ে যায়।

ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ বদরুদ্দোজা জানান, আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কেউ কোন অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কুড়িগ্রাম জেলার কয়েক আইন বিশেষজ্ঞ জানান, বিচার কখনো তামাদি হয় না। দাসিয়ারছড়াসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১১১ ছিটমহলে তিন দশক আগে যে সব খুন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে তার বিচার এখন বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে হতে পারে। এ জন্য স্বজনদের থানায় অথবা কোর্টে মামলা করতে হবে।

বিলুপ্ত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, পুরনো ঘটনা নিয়ে আমরা আর বাড়াবাড়ি করতে চাই না। এখন থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক এটাই আমার চাওয়া।