২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শেখ জামালের লক্ষ্য ‘ট্রেবল’- জয়

  • রুমেল খান

দলগত সাফল্য লাভের জন্য চাই খেলা অন্তঃপ্রাণ এক সংগঠক, চাই প্রয়োজনীয় অর্থ, উন্নত প্রশিক্ষণ, কঠোর শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা, অবকাঠামোগত সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা, ভাল ফলের সদিচ্ছা ও চেষ্টা এবং সবশেষে ভাগ্যের কিছুটা পরশ। মনজুর কাদেরের ফুটবল দল শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাব লিমিটেড হচ্ছে তেমনই একটি দল। ২০১০ সালে ক্লাবটির সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ক্লাবটি ফুটবলে জিতেছে মোট নয়টি শিরোপা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে তিনটি লীগ শিরোপা, তিনটি ফেডারেশন কাপ শিরোপা, একটি কিংস কাপ শিরোপা, একটি সাফাল পোখরা গোল্ডকাপ শিরোপা এবং একটি বুদ্ধ সুব্বা গোল্ডকাপ শিরোপা। এছাড়া রানার্সআপ ট্রফি আছে তিনটি (১টি লীগ, ১টি আইএফএ গোল্ডকাপ এবং ১টি ফেডারেশন কাপ)।

গত ৩০ জুলাই শেখ জামাল সর্বশেষ জেতে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের শিরোপা। ঠিক গত মৌসুমের মতোই এবারও নিজেদের দুই ম্যাচ বাকি থাকতেই মান্যবর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ফুটবল লীগের শিরোপা অক্ষুণœ রাখে তারা। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ‘বেঙ্গল ইয়োলোস’ খ্যাত শেখ জামাল ধানম-ি ৩-২ গোলে হারায় ‘ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট’ খ্যাত ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডকে। এ নিয়ে পেশাদার লীগের অষ্টম আসরে জামাল শিরোপা জিতল তিনবার। এর আগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ২০১০-১১ এবং ২০১৩-১৪ মৌসুমে। ট্রফি পেয়ে জামালের কোচ জোসেফ আফুসিকে নিয়ে দলের ফুটবলার, কর্মকর্তা, সমর্থকরা মেতে ওঠেন বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে। অথচ লীগের এখনও বেশ ক’টি ম্যাচ বাকি। জামালের ম্যাচ বাকি আরও দুটি! কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না জামালের। এখন পরের দলগুলো বাকি সব ম্যাচ জিতলেও ছুঁতে পারবে না জামালকে।

বাংলাদেশে পেশাদার ফুটবল লীগ শুরু ২০০৬-০৭ মৌসুম থেকে। শুরুর তিনটি আসরেই অপ্রতিরোধ্য ছিল ঢাকা আবাহনী লিমিটেড। জিতেছিল প্রথমবারের মতো হ্যাটট্রিক শিরোপা। পরে ২০১১-১২ মৌসুমে চতুর্থবারের মতো লীগ শিরোপা জিতে ঢাকা আবাহনী এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তবে সেই পথেই রয়েছে শেখ জামাল ধানম-ি। ঢাকা আবাহনীর মতো লীগে টানা তিন শিরোপা জিততে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ শেখ জামালের অধিনায়ক-মিডফিল্ডার মামুনুল ইসলাম। অধিনায়ক হিসেবে শেখ জামালের হয়ে টানা দ্বিতীয় লীগ শিরোপা। কেমন অনুভূতি? ‘আমি দারুণ গর্বিত ও রোমাঞ্চিত অধিনায়ক হিসেবে। দলের মধ্যে বোঝাপড়াটা দুর্দান্ত। সে কারণেই এই সাফল্য। আমি ভাগ্যবান। খেলোয়াড় হিসেবে এই নিয়ে তিনটি লীগ শিরোপা জিতলাম। দুটি শেখ জামালের হয়ে, অপরটি শেখ রাসেলের হয়ে। বলা চলে হ্যাটট্রিক!’

ব্যক্তিগত লীগ শিরোপায় হ্যাটট্রিক। এবার দলগতভাবেও সে সাফল্য পেতে চান মামুনুল, ‘শেখ জামাল সবসময়ই শিরোপা জেতার জন্য দল গড়ে। টানা দ্বিতীয় লীগ শিরোপা তারই প্রমাণ। তবে আমার লক্ষ্য শেখ জামালের হয়ে লীগে হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়। আশা করি সফল হব।’

শিরোপা নিশ্চিতের ম্যাচ। তবে গ্যালারিতে ছিল না উল্লেখযোগ্য দর্শক। এ বিষয়ে মামুনুলের পরামর্শ, ‘মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলা ফিরিয়ে আনতে হবে। বেশি বেশি ম্যাচ টিভিতে প্রচার করতে হবে। তাহলেই দর্শকদের আগ্রহ বাড়বে।’

লীগকে জমজমাট করতে শক্ত প্রতিপক্ষের বিকল্প নেই। এ সম্পর্কে মামুনুলের ভাষ্য, ‘অবশ্যই। আবাহনী-মোহামেডানের মতো দলগুলোকে আরও ভালভাবে গঠন করা দরকার। তাতে লীগ আরও জমবে। তারপরও এখন আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে প্রতিযোগিতা। আগে একটি-দুটি দল শিরোপার জন্য লড়তো। এখন প্রায় পাঁচটি দল ম্যাচ থাকে শিরোপা দৌড়ে। এট অবশ্যই ইতিবাচক দিক।’

দলের ধারাবাহিক সাফল্য প্রসঙ্গে দেশসেরা এই মিডফিল্ডার বলেন, ‘আমাদের দলটা বেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ। বিদেশী ফুটবলারদের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক দারুণ। বলা চলে সবাই আমরা ভাই ভাই। সব মিলিয়ে আত্মিক সম্পর্ক। মাঠের খেলাতেও তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’

ফেডারেশন কাপের পর লীগ শিরোপা জয়। শেখ জামাল ধানম-ির এমন সাফল্যের নিগূঢ় রহস্য কি? জামালের ম্যানেজার আনোয়ারুল করিম হেলাল এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের ফুটবল দলের প্রত্যেক বিভাগের সবাই নিজের কাজে গুরুত্ব দেন। পেশাদারিত্ব রয়েছে সবার মধ্যেই। ক্লাবের বলবয় থেকে শুরু করে অফিসিয়াল সবাই একসঙ্গে কাজ করেছি। স্পিরিট ছিল সবার মধ্যেই। সবদিকেই ছিল ক্লাবের সভাপতি মনজুর কাদেরের নজর। ওনার সহযোগিতা পেয়ে থাকেন ক্লাবের সবাই। তাছাড়া উনি একটা কথাই সব সময় বলে থাকেন, আমি ফল চাই। এর জন্য যা প্রয়োজন, সব দেব। সবচেয়ে বড় কথাÑ খেলার মাঠে কখনই আমরা মনোবল হারাই না। বৃহস্পতিবার আমরা মোহামেডানের বিরুদ্ধে ২-১ গোলে পিছিয়ে ছিলাম। বিরতির সময়ে ড্রেসিং রুমে গিয়ে খেলোয়াড়দের বলেছি, এখনও আমাদের হাতে ৪৫ মিনিট বাকি রয়েছে। জিতবই আমরা। এটাই হলো আমাদের সাফল্যের অন্যতম রসদ।’ উৎসব নিয়ে হেলালের কথা, ‘আপাতত শিরোপা উৎসব আমরা করছি না। তবে শিরোপা নিশ্চিত হওয়ার পর দলের সবাইকে বিশ্রাম দেয়া হয়েছিল। বিশেষ করে মামুনুল, ইয়াসিন, মুন্না, জামাল ভূঁইয়া, ল্যান্ডিং ও এমেকাকে দু’দিনের ছুটি দেয়া হয়েছিল। লীগে আরও দুটি খেলা বাকি। সেগুলো খেলতে হবে। এরপর এএফসি কাপে খেলার জন্য দল কিরগিজস্তানে যাবে। সেখান থেকে ফেরার পরই আমরা উৎসব আকারে ফুটবলারদের সংবর্ধনা দেব। সেখানে ফুটবলারদের বোনাস ও সংবর্ধনার পাশাপাশি গান-বাজনাও হবে। বিশেষ করে গেল পাঁচ বছরে শেখ জামালের সফলতা নিয়ে আলোচনাও হবে।’ ভবিষ্যত লক্ষ্য? ‘আগামী মৌসুমেও লক্ষ্য থাকবে সব শিরোপা জেতা। ঘরোয়া লীগে আবাহনীর হ্যাটট্রিক শিরোপার পাশে আমরাও নাম লেখাতে চাই।’

জামালের সামনে এখন আরেকটি টার্গেট। এএফসি কাপ। গত জুনের শেষ সপ্তাহে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সদর দফতর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হয় ‘২০১৬ এএফসি কাপ’-এর গ্রুপিং ড্র। এতে ‘বি’ গ্রুপে পড়ে বাংলাদেশের শীর্ষ ক্লাব শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাব লিমিটেড। তাদের অপর দুই প্রতিপক্ষ হলো কিরগিজস্তানের এফসি আলগা বিশকেক এবং ম্যাকাওয়ের এসএল বেনফিকা ডি ম্যাকাও ক্লাব। খেলা হবে কিরগিজস্তানে। খেলার তারিখ ঠিক হলেও সময় এবং ভেন্যু এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। শেখ জামাল তাদের প্রথম ম্যাচ খেলবে আগামী ১৩ আগস্ট বেনফিকা এবং ১৬ আগস্ট আলগার বিরুদ্ধে। অথচ লীগ শিরোপা নিশ্চিত হতেই ক্লাব ছেড়ে চলে গেছেন দলের নির্ভরযোগ্য হাইতিয়ান ফরোয়ার্ড ওয়েডসন এ্যানসেলমে (চলমান লীগে ব্যক্তিগত ১৭ গোল করে ক্লাব সতীর্থ নাইজিরিয়ান ফরোয়ার্ড এমেকা ডার্লিংটনের সঙ্গে আপাতত আছেন যুগ্মভাবে শীর্ষ গোলদাতার তালিকায়)। যাবার কারণ যুক্তরাষ্ট্রে যাবার ভিসার মেয়াদ ঠিক রাখা।

এখন ওয়েডসনের চলে যাওয়াতে শেখ জামালের আক্রমণভাগে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, সেটা পূরণ হবে কিভাবে? হেলাল বলেন, ‘হ্যাঁ, সামনেই এএফসি কাপ। এখন ওয়েডসন যদি এ আসরে আমাদের ক্লাবে আবারও খেলতে চায়, তাহলে অবশ্যই তার জন্য আমাদের দরজা খোলা থাকবে।’ আগামী বছর লীগ শিরোপা জিতে আবাহনীর মতো হ্যাটট্রিক করাই নয়, জামাল জিততে চায এ মৌসুমের ট্রেবল শিরোপাও। লীগ শেষ হওয়ার পরেই অনুষ্ঠিত হবে স্বাধীনতা কাপ এবং সুপার কাপের খেলা। জামাল এর আগে এই দুটি আসরের ট্রফি কখনও জিততে পারেনি। এবার সেই ব্যর্থতা ঘোটাতে তারা বদ্ধপরিকর। উল্লেখ্য, এর আগে মৌসুমে ট্রেবর ট্রফি জিতেছে শুধুমাত্র দুটি ক্লাব। ১৯৮২-৮৩ মৌসুমে ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেড এবং ২০১২-১৩ মৌসুমে শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র লিমিটেড। এবার ২০১৪-১৫ মৌসুমে সেই গৌরবের অংশীদার হতে চায় শেখ জামাল ধানম-িও। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা ও সুপার কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ চারটি শিরোপা করায়ত্তের বিরল কীর্তি স্থাপন করতে চায়। পারবে কি তারা? সেটাই এখন দেখার বিষয়।

মনজুর কাদের। তাঁর নামটিই যেন চমকময়। সেখানেই স্পর্শ করেন, সোনা ফলিয়ে ছাড়েন সেখানেই। একজন সফল, জনপ্রিয় ও দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিরাজ করছেন। চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসেন বরাবরই।

১৯৯৩ সালে তখনকার সাদামাটা ফুটবল ক্লাব মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের দায়িত্ব নিয়ে সে ক্লাবটিকে মনজুর কাদের পরিণত করেছিলেন শীর্ষ ফুটবল ক্লাবে। এটা অনেকের কাছেই ছিল ঈর্ষণীয় ও অকল্পনীয়। সে সময়কার ফুটবলের জোয়ারের তোড়ে একঝাঁক তারকা ফুটবলারকে নিয়ে গঠন করেছিলেন ‘ড্রিম টিম’ মুক্তিযোদ্ধা। এনে দিয়েছিলেন নজরকাড়া সাফল্য। কয়েক বছরের বিরতি দিয়ে এবার দায়িত্ব নিলেন আরেকটি ক্লাবের। আবারও নতুন দায়িত্ব, নতুন চ্যালেঞ্জ। সে চ্যালেঞ্জেও জয়ী কাদের। শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে নিরন্তর সুকঠিন সাধনা করেন। ফলও পান হাতেনাতে। ‘শেখ জামাল’ নামটি যুক্ত হওয়ার আগে ধানম-ির এ ক্লাবটি আগে থেকেই ছিল একটি মাঝারি সারির ফুটবল দল। সেই মাঝারি সারির ক্লাবটি রাতারাতি বদলে গেল কাদেরের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায়। সঠিক, সুষ্ঠ পরিকল্পনা এবং যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আসে সেই কাক্সিক্ষত সফলতা। ২০১০ মৌসুমে ঘরোয়া পেশাদার ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর ‘বাংলাদেশ লীগ’-এ প্রথমবার আত্মপ্রকাশ করেই বাজিমাত করে শেখ জামাল ধানম-ি শিরোপা করায়ত্তের মাধ্যমে। আগের ‘মিডিওকার’ ধানম-ি ক্লাব রূপান্তরিত হয় দেশের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠিত ও শক্তিশালী ক্লাবে। এ সাফল্যের রূপকার বা নেপথ্য কারিগর হচ্ছেন মনজুর কাদের। শেখ জামালকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসার মাধ্যমে দেশীয় ফুটবলের উত্তেজনায় কাদের যোগ করেন সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মাত্রা।

চমক সৃষ্টি আর যে কোন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে ভালবাসেন মনজুর কাদের। তাঁর লক্ষ্য, সর্বক্ষেত্রেই নাম্বার ওয়ান হওয়া। এখন দেখার বিষয়, এ দক্ষ ও সফল ফুটবল সংগঠক ইস্পাতকঠিন সঙ্কল্প নিয়ে ক্লাবের কা-ারি হিসেবে সফল হতে পারেন কি না আসন্ন স্বাধীনতা কাপ ও সুপার কাপে।