১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শেখ কামাল- আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনের রূপকার

  • জাহিদ রহমান

আজ ৫ আগস্ট। ঠিক এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ক্রীড়াঙ্গনের এক রূপময় যাদুকর শেখ কামাল। আবাহনী ক্রীড়া চক্রের (বর্তমানে আবাহনী ক্রীড়া লিমিটেড) প্রতিষ্ঠাতা যিনি। ঠিক এ মাসেই আবার ঘাতকের বুলেটে নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন তিনি। তাঁর জন্ম আর মৃত্যু তারিখের ব্যবধান মাত্র দশ দিন। স্বভাবতই শেখ কামাল অনুরাগীদের কাছে আগস্ট মাস গুরুত্ববহ। আগস্ট এলেই শেখ কামালকে একটু অন্যভাবে মনে করতে হয়। বিশেষ করে রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তার নিবিড় সম্পৃক্ততা, আবাহনী ক্লাবকে আধুনিক ধাঁচে গড়ে তোলা, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় আধুনিকতার সংযোজন, ক্রীড়াক্ষেত্রে দেশকে অন্য এক উচ্চমাত্রায় নেয়ার স্বপÑ এসবই শেখ কামালকে অন্যরকম মর্যাদায় আসীন করেছে। তবে শেখ কামাল এবং আবাহনী অবিচ্ছেদ্য নাম। আজ ক্রীড়াঙ্গনে আবাহনীর যে উত্থান সেই স্বপ্নের সূচনা ছিল তাঁর হাত ধরেই। আর এ কারণেই একাত্তর পরবর্তীতে ফুটবলে এক নতুন আমেজ তৈরি করেছিলেন। আশির দশকে যার পরিপূর্ণ রূপ আমরা দেখেছিলাম। শেখ কামাল এবং তার ক্রীড়ানুরাগ নিয়ে যারা অনুসন্ধান করেছেন তাদের কাছে এটি স্পষ্ট যে, ক্রীড়া নিবেদিত এ মানুষটি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আধুনিকতার ছোঁয়া আনতে ভীষণ অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে স্বাক্ষরও রেখে যান তিনি। দারুণ সৃজনশীলতায় আবাহনী ক্রীড়া চক্রকে চোখের পলকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। একসময় শাহীন স্কুল এ্যান্ড কলেজের ক্লাসমেট আর ক্রিকেট মাঠের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশের কিংবদন্তি ফুটবলার কাজী সালাহউদ্দিনকে তিনিই টেনে এনেছিলেন আবাহনী ক্লাবে। এর পরের গল্প তো সবারই জানা। দ্রুতই ফুটবলে আবাহনী দেশের তরুণ সমাজের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিল। আর তাই জনপ্রিয় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের বৃত্ত ভেঙ্গে আবাহনী হয়ে উঠেছিল সত্যিকারের তারুণ্যের প্রতীক। যার কারিগর ছিলেন শেখ কামাল। শেখ কামাল ছিলেন কৃতী ক্রীড়া সংগঠক। তার দূরদর্শী ক্রীড়া সাংগঠনিক দক্ষতার কারণেই আবাহনী ক্রীড়া চক্র (বর্তমানে আবাহনী লি.) এক আধুনিক এবং জনপ্রিয় ক্লাবে পরিণত হয়েছিল। এ ক্লাবের প্রতিটি কণায়, স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে শেখ কামালের নাম। ছাত্রজীবনেই শেখ কামাল এই ক্লাবটিকে তাঁর হ্নদয়ের বন্ধনে তৈরি করেছিলেন। এর পেছনে অবশ্য সঙ্গত কারণও ছিল। তাঁর সতীর্থদের কাছ থেকে জানা গেছে, ছাত্রজীবনে তিনি নিয়মিত ক্রিকেট, বাস্কেটবল এবং ভলিবল খেলতেন। কাজী সালাহউদ্দিনসহ অন্য বন্ধুদের সঙ্গে ধানম-ি ও সোবহানবাগ মাঠ তাঁর পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠত। নিজেই ক্রিকেট টিম আজাদ স্পোর্টিং ক্লাবের ওপেনার ছিলেন। খেলার মাঠে তাঁর বন্ধুস্বজনের সংখ্যাও ছিল অনেক।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের আগেই শেখ কামাল তরুণ সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি প্রথম ধানম-ি ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরের বছরই শেখ কামাল আবাহনী সমাজকল্যাণ সমিতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। ওই সময় বর্তমান যে আবাহনী লি. তার নাম ছিল আবাহনী সমাজকল্যাণ সমিতি। আবাহনী সমাজকল্যাণ সমিতি গঠিত হয় ৬৬ সালের মার্চ মাসে। প্রতিষ্ঠা লগ্নে আবাহনী সমাজকল্যাণ সমিতির সভাপতি ছিলেন গোলাম আওলিয়া তালুকদার এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন হারুনুর রশিদ। সে সময় আবাহনী সমাজকল্যাণ সমিতি গড়তে মুখ ভূমিকা পালন করেনÑ বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তায় থাকা বাচ্চু, ওমর, মাহফুজ, হারুন, সেন্টু, শফি, মঞ্জু, বাদল, বাবলু, জিলু, ফিরোজ, মাসুম, খোকা, মোশাররফ, ফারুক, কমলসহ আরও অনেকে। জানা যায়, ওই সময় আবাহনীর সঙ্গে শেখ কামালের সম্পৃক্ততা গড়ে তোলার ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান নিজে। একদিন শেখ মুজিব নিজে ছেলে শেখ কামালকে ডেকে বলেন, সে যেন আবাহনীর সমাজকল্যাণ সমিতির সঙ্গে যুক্ত হয়। এর পর শেখ কামাল আবাহনী সমাজকল্যাণ সমিতিতে যুক্ত হলে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়।

শেখ কামাল আবাহনী সমাজকল্যাণ সমিতির নেতৃত্বে আসার পরপরই প্রথমবারের মতো আবাহনী সংশ্লিষ্ট মাঠে আয়োজন করেন ‘তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া’ স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। জানা যায়, আজকের যে আবাহনী মাঠ ওখানে সরকারের পক্ষ থেকে ২২ জন সিএসপির নামে প্লট বরাদ্দের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন স্থানীয় খেলোয়াড় ও ক্রীড়াসংগঠকরা। পরে এটি বাতিল করা হয়। বিষয়টি সুকৌশলে রুখে দিতেই সে সময় আয়োজন করা হয় ‘তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া’ স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। এই টুর্নামেন্ট শেখ জামাল ইলেভেন ক্রিকেট টিম নামে একটি দলও অংশগ্রহণ করে। এই দলটি গড়তে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন শেখ কামালের ক্রীড়ামাঠের বন্ধু বরকত-ই খোদা। সোবহানবাগ মাঠে ক্রিকেট খেলতে গিয়েই যার সঙ্গে শেখ কামালের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। এদিকে ’৭০ সালে দেশে বন্যা হলে ক্লাবের সবাইকে নিয়ে ত্রাণ তৎপরতায় অংশ নেন শেখ কামাল। এরপর একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ক্লাবের সবাইইকে নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নিজে সেনাবাহিনীতে কমিশন প্রাপ্ত হয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করে শেখ কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনে ফিরে আসেন। নিজেকে আরাও ব্যাপকমাত্রায় খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। এদিকে আবাহনী সমাজকল্যাণ সমিতি মূলত আবাহনী ক্রীড়া চক্র নামে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ’৭১ সালেই। জানা যায়, ওই বছর প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগে নিজের কোনো একটি ফুটবল দলকে খেলানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন শেখ কামাল। কিন্তু সারাসরি এরকম কোন সুযোগ না থাকায় প্রথম বিভাগে ওঠা মোহাম্মদপুরের ইকবাল স্পোটিং ক্লাবের সমস্ত স্বত্ব কিনে নেন শেখ কামাল এবং আবাহনী ক্রীড়া চক্র নামে নতুন ক্লাব রেজিস্ট্রেশন করান। এ সময় তিনি পাশে পান্না, হারুন, মন্টু, তারেক, জিলানী, শাহান, বরকত, আলী ইমাম, সেন্টু, বুলু, জামাল, শাহরিয়ারসহ আরও অনেককে সহযোগী হিসেবে পান। শেখ কামালের অনুপ্রেরণায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানাসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের আরও অনেকেই এই ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হন। উল্লেখ্য, এসময় আবাহনী ক্লাব ছিল ধানম-ি ১৯ নম্বর রোডে, ওখান থেকেই সব কার্যক্রম পরিচালনা হতো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শেখ কামালের নেতৃত্বেই আবাহনী ফুটবলে দারুণ সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয় এবং দ্রুতই এ ক্লাবটি সর্বমহলে জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। আবাহনী ক্লাবকে প্রাণের চেয়েও ভালবাসতেন শেখ কামাল। আর তাই মৃত্যুর আগের দিনও ১৪ আগস্ট স্ত্রীকে নিয়ে তিনি নতুন ক্লাবভবনে এসেছিলেন। সেদিনের সেই কথা স্মরণে এসে শেখ কামালের অন্যতম ক্রীড়াবন্ধু বরকত-ই খোদা স্মৃতি আওড়িয়ে বলেন, ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় শেখ কামাল স্ত্রী সুলতানাসহ ক্লাবে আসেন। সে সময় ক্লাবপ্রাঙ্গণে উল্লেযোগ্যদের মধ্যে ছিলেনÑ ক্রীড়া সংগঠক হারুনুর রশিদ, ইকবাল হাসান টুকু, শেখ মারুফ, ফারুক, বাচ্চু, লে. (অব.) কাদেরসহ আরও কয়েকজন। এ সময় ক্লাব চত্বরে দাঁড়িয়ে খেলাধুলা নিয়ে আরও অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনার কথা বলেন শেখ কামাল। এরপর এখানে মিটিং শেষ করে শ্বশুরবাড়ি যান, ওখান থেকে ফিরে আসেন ৩২ নম্বরে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঘাতকদের বুলেটে নির্মমভাবে নিহত হন দেশসেরা এই তরুণ ক্রীড়া সংগঠক। সে সময় শেখ কামালের বয়স ছিল মাত্র ২৬। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শেষ পর্বের ছাত্র ছিলেন। ১৫ আগস্ট ঘাতকরা ৩২ নম্বরে হামলা করলে শেখ কামাল স্টেনগান দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা চালান। তরুণ বয়সেই শেখ কামাল আবাহনী আর এদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে যে সাংগঠনিক দক্ষতা দেখান তা ইতিহাসই বটে। আর এ কারণেই ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর নামটি বারবার উচ্চারিত হয়। ১৫ আগস্ট খুনীরা বুলেট দিয়ে শেখ কামালকে হত্যা করলেও হত্যা করতে পারেনি তাঁর স্বপ্নের ক্রীড়াঙ্গনকে। আর তাই এখনও ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর কথা চলে আসে অনিবার্যভাবে। ক্রীড়াঙ্গনের স্বাপ্নিক এ মানুষটিকে এখনও সবাই স্মরণে আনেন। এ মানুষটি ক্রীড়াক্ষেত্রে আধুনিকতার স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন সবার আগে।

নির্বাচিত সংবাদ