২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হাতুরাসিংহের স্বপ্ন পূরণ

  • মোঃ মামুন রশীদ

বিশ্ব ক্রিকেটে এখন সবচেয়ে আতঙ্কের দল বাংলাদেশ। অন্তত সর্বশেষ তিন সিরিজের ফলাফল সেটারই প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। অথচ গত বছরটাই গেছে ক্রমেই উন্নতির পথে থাকা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে দুঃসময়। ঘরের মাটিতেও একের পর এক প্রতিপক্ষের কাছে নাস্তানাবুদ হতেই থাকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। এমনকি আফগানিস্তান-হংকংয়ের মতো সহযোগী সদস্য দেশ দুটির কাছেও নতি স্বীকার করতে হয়েছিল। সেখান থেকে দলকে আবার নতুন করে ফিরে এসেছে এবং পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং ঘরের মাটিতে অপ্রতিরোধ্য হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে টাইগাররা। সর্বশেষ চার সিরিজের একটিতেও হারেনি। ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের কাছে নতি স্বীকার করে গেছে জিম্বাবুইয়ে, পাকিস্তান, ভারত এবং সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বকাপেও প্রথমবারের মতো দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে। আর টাইগারদের বদলে যাওয়া এবং ভীতিকর দলে পরিণত হওয়ার পেছনে কুশীলব হিসেবে কাজ করেছেন শ্রীলঙ্কান কোচ চান্দিকা হাতুরাসিংহে এবং তাঁর সহকারীরা। তবে এসব কৃতিত্ব নেয়ার চেয়ে বরং বদলে যাওয়ার পেছনে ক্রিকেটারদের আত্মোপলব্ধি, আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা এবং নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া ও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার পথ খুঁজে পাওয়াটাকেই এগিয়ে রাখছেন হাতুরাসিংহে। তিনি মনে করেন কোচ হিসেবে যে দায়িত্ব সেটা নিজে যেমন পালন করেছেন, তেমনি ক্রিকেটারদের যে পরামর্শ দিয়েছেন সেটা কাজে লাগিয়ে নিজেরাই তাঁরা স্বীয় মানসিক উন্নয়ন ঘটিয়েছেন। আর এ মানসিক উন্নতিটাই হাতুরাসিংহের কাছে সবচেয়ে বড় আত্মতৃপ্তির কারণ। এক সাক্ষাতকারে সম্প্রতি বদলে যাওয়া বাংলাদেশ নিয়ে তিনি আরও অনেক কিছুই বলেছেন।

প্রশ্ন ॥ গত কয়েক মাস আপনার জন্য দারুণ ছিল। গত বছর থেকে এই দলটির কোচ হিসেবে আপনার অনুভূতি কি?

হাতুরাসিংহে ॥ এটা আমার জন্য অনেক বড় সন্তুষ্টির কারণ। ছেলেরা যেভাবে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে সেটা সত্যি দারুণ। আমাদের আগে যে ক্রিকেটরীতি ছিল সেটাতে পরিবর্তন এসেছে। সবাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে এবং যে কোন দলের জন্য বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিণত হয়েছে। কোচ হিসেবে এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টির ব্যাপার।

প্রশ্ন ॥ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে ২-১ এ সিরিজ জয়ে আপনার মূল্যায়ন কি?

হাতুরাসিংহে ॥ এই পরিবর্তনটা আমার কারণে নয়, ছেলেদের কৃতিত্ব। আমাদের টি২০ সিরিজে দুটি পরাজয় ছিল এবং পরে প্রথম ওয়ানডে হেরে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমাদের মধ্যে বেশ ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং তখন নিজেদের সন্তোষজনক দায়িত্বটা দেখানোর ব্যাপারটা চলে এসেছিল। এমনটা আমরা আগে কখনও করিনি। প্রত্যেকেরই দলে আলাদা দায়িত্ব আছে আর সেটাই আমাদের প্রতিযোগী জিসেবে গড়ে তুলতে পারে। আর সেটা নিয়েই আলোচনা হয়েছিল। ছেলেরা সত্যিই ওই চ্যালেঞ্জ নেয়ার ক্ষেত্রে দারুণ কার্যকর ভূমিকা দেখিয়েছিল। যদি ব্যক্তিগত শক্তিমত্তা প্রদর্শনে মনোযোগী হওয়া যায় সেটা যে কোন কঠিন কাজকে সহজ করে দেয়।

প্রশ্ন ॥ মাশরাফি ও তাঁর দলের জন্য আপনার বার্তা কি ছিল? আপনি কি তাঁদের ব্যতিক্রম কিছু করতে বলেছিলেন?

হাতুরাসিংহে ॥ আমরা শুধু একটা বিষয়েই আলোচনা করেছি সেটার হচ্ছে সবারই নিজস্ব কিছু দায়িত্ব আছে দলের প্রতি এবং সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুরোপুরি লেগে থাকতে হবে। আমি নিজেও নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য একমাত্র দায়িত্বশীল ব্যক্তি। অন্যান্য স্টাফদেরও নিজ নিজ দায়িত্বের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা আছে। একাদশের মধ্যে যদি ৭ জনও নিজের দায়িত্বটা সেভাবে পালন করতে পারে সেক্ষেত্রে জেতার অবস্থানে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি বেড়ে যায়। আমরা উচ্চপর্যায়ের ক্রিকেটে উচ্চ মানসিক ক্ষমতা নিয়ে খেলার ক্ষেত্রে ভিত নই। এখন ছেলেরাও সেটা অন্তঃকরণ করতে পেরেছে। আমার কাছে ক্রিকেটারদের এ মানসিক উন্নতিটাই বড় পাওয়া। এখন তারা জানে যে কোন অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে কি করতে হবে। আমরা হয়ত সবসময়ই এমনটা করতে পারব না, কারণ প্রতিপক্ষরাও একইভাবে চ্যালেঞ্জ জিততে প্রস্তুত থাকবে।

প্রশ্ন ॥ কোন ফলাফলটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্টি দিয়েছে?

হাতুরাসিংহে ॥ কোচ হিসেবে আমার জন্য এবং আমার কোচিং স্টাফরাও একই কথা বলবেন যে এ ধরনের একটি দলকে প্রশিক্ষণ দিতে পারাটাই সবচেয়ে বড় সন্তুষ্টির। অনেক বেশি সামর্থ্য আছে এ দলটির, কিন্তু সেই সামর্থ্যটা আগে কখনও তারা দেখাতে পারেনি। যতসব জয় এসেছে, যেভাবেই এসেছে আমরা সেটাকে সাধুবাদ জানিয়েছি খুব ভালভাবে। এটাই আমি খেলোয়াড়দের বলি নিজেদের সাফল্যটা উপভোগ করো। এ সিরিজ শেষেও একই কথা বলে তাদের নিজেদের প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে সাফল্য ভাগাভাগি করে উপভোগের জন্য বলেছি। তাঁদের কাছে যাও যারা তোমার বর্তমান ক্যারিয়ার গড়ার পেছনে কুশীলব ছিলেন। তাঁদের মতো আমাদের কাছেও সবগুলো জয়ই ছিল উপভোগ্য। তবে মনে হয় ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়টা বেশি আনন্দের ছিল। তাদের হারিয়ে আমরা বিশ্বকাপের কোয়ার্টারে উঠেছিলাম। আর অবশ্যই ভারতকে পরাজিত করাটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমি বলছি না পাকিস্তান তারচেয়ে কম বড় দল। আমরা তাদের বেশ ভালভাবেই পরাজিত করেছি। আর দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও জয়টা অনেক বড় প্রত্যাবর্তন আমাদের জন্য।

প্রশ্ন ॥ বিশ্বকাপের পর ক্রিকেটাররা আপনার ওপর আস্থা খুঁজে পেয়েছেন। এটা কিভাবে সম্ভব হলো?

হাতুরাসিংহে ॥ দীর্ঘ সময় ধরে আপনি কেমন আচরণ করছেন সেটার ওপরই বিশ্বাস জিনিসটা তৈরি হয়। আপনি যদি জীবনে যা করতে চান সেটার প্রতি লেগে থাকেন এবং করে যেতে থাকেন আমার মনে হয় মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করতে শুরু করবে। তারা জানবে যে কি আপনি দিতে সক্ষম। আর এটাই মনে হয় অন্যতম কারণ আমাকে বিশ্বাস করার।

প্রশ্ন ॥ বর্তমানে বাংলাদেশ দলে নতুন খেলোয়াড় সুযোগ পাওয়ার প্রবাহ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আপনি কি সৌম্য ও মুস্তফিজ সম্পর্কে কিছু বলবেন?

হাতুরাসিংহে ॥ সৌম্য কি এখন ম্যাচজয়ী পারফর্মার নয়? তিনি বিশ্বমানের। আমি তাঁকে একটি প্র্যাকটিস ম্যাচে ব্যাট করতে দেখেছি। সেদিন মাত্র ১৩ রান করেছিলেন। কিন্তু পেসার রুবেল হোসেনকে পয়েন্ট ও গালির মাঝ দিয়ে যেভাবে চার হাঁকিয়েছিলেন সেটাই আমার মনে ধরে গিয়েছির। পরে তিনি সিøপে দুর্দান্ত একটি ক্যাচ নিয়েছিলেন। আমি তখনই নির্বাচকদের বলেছিলাম (গত ডিসেম্বরে) জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে পুরো সিরিজেই তাঁকে খেলাতে। কিন্তু তিনি শুধু শেষ ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। আর মুস্তাফিজের বিষয়ে আসলে আমরা সজাগ হতে পারিনি আগে। কিন্তু যখন কাউকে দলের জন্য অবদান রাখতে দেখি তখন বিবেচনা করি না তিনি কয়টা ম্যাচ খেলেছেন। আমি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সিরিজের আগে দেশে থাকা সব বাঁ-হাতি পেসারকে বোলিংয়ের জন্য ডাকতে বলেছিলাম। কারণ তাঁদের দলে তিনজন বাঁ-হাতি পেসার ছিল। মুস্তাফিজ সেভাবেই এসেছে। আমরা তাঁকে পরীক্ষার জন্য দুটি অনুশীলন ম্যাচ খেলিয়েছিলাম অবস্থা বুঝতে। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাটসম্যানরা জিততে পারেনি, তিনিই জিতেছেন। এরপর আমরা বুঝতে পেরেছিলাম এই ছেলেকে আমাদের প্রয়োজন এবং তাঁকে খেলানো উচিত।