১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইরান ॥ মধ্যপ্রাচ্যের স্বীকৃত মোড়ল

  • মুসান্না সাজ্জিল

অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যে এ যেন শান্তির আভাস। দীর্ঘ কুড়ি মাসের টানাপোড়েন শেষে বিশ্ববাসী পেল সমঝোতার সুবাতাস, যার খুশির তোড়ে ভেসে গেছে তেহরানের রাস্তাজুড়ে তরুণ-বৃদ্ধ সকলের আনন্দ-উচ্ছ্বাস। এ উৎসব গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বহাল থাকা নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি অবসানের। এ উদযাপন একটি জাতির বিশ্ববাসীর কাছে মাথা তুলে দাঁড়াবার। মার্কিন পরাশক্তির কাছে নিজেদের অধিকার খর্ব না করার, হার না মানার। সেই সঙ্গে অবসান হলো ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গত চার দশকের দীর্ঘ শত্রুতার। যদিও চুক্তি বাস্তবায়নে এখনও বেশকিছু জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা রয়ে গেছে, তবুও আশা করা যাচ্ছে ইরানে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা আপাতত বন্ধ হয়েছে।

গত ১৩ জুলাই ভিয়েনার প্যালেস কুর্বাগ হোটেলে ইরানের সঙ্গে ছয় পরাশক্তির ১০০ পাতার এ পরমাণু চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের প্রাক্কালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাবেদ জারিফ ছাড়াও ফ্রান্স, রাশিয়া, জার্মানি, চীন ও ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। প্যালেস কুর্বাগ হোটেলের রুম নম্বর ১০৩-এ শেষ মুহূর্তের নাটকীয় মুহূর্তে বেশকিছু বিষয় নিয়ে মার্কিন ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাঝে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের ঘটনাও ঘটেছিল। কিন্তু রাশিয়ার চাপে মার্কিনীরা শেষ মুহূর্তে সমঝোতায় পৌঁছতে বাধ্য হয়। এ চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইরান আগামী ১০-১৫ বছর তার পরমাণুশক্তি উৎপাদনের মাত্রা কমিয়ে আনবে। সেই সঙ্গে জতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শক টিমকে তার সব ধরনের পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শনের সুযোগ দেবে। এ চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ওপর যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে তুলে নেয়া হবে। ফলে তেল রফতানিতে ইরানের কোন রকম জটিলতা পোহাতে হবে না। ইরান আশা করছে আগামী ছয় মাসের ব্যবধানে তার তেল রফতানি দ্বিগুণ করবে। ইরান পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে বহনযোগ্য অস্ত্র ও মিসাইল অন্য দেশে রফতানি করতে পারবে। এ চুক্তি ইরানকে পরিণত করবে মধ্যপ্রাচ্যের স্বীকৃত মোড়লে এবং অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যতম পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রে।

এ পরমাণু চুক্তি অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস বয়ে আনার পাশাপাশি এনেছে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নতুন শঙ্কার মেঘ। মধ্যপ্রাচ্যে বাড়বে পরমাণু বোমা তৈরির নতুন প্রতিযোগিতা। ইতোমধ্যে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র সৌদি আরব পাকিস্তান হতে পরমাণু বোমা সংগ্রহের আগ্রহ জানিয়েছে। ইরান যদি পরমাণু বোম তৈরি করে, তবে সুন্নি রাষ্ট্রটিও বসে থাকবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। মিসর ও তুরস্কের প্রতিক্রিয়াও সৌদি আরবের মতো। প্রত্যেকটি দেশ এখন মধ্যপাচ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তার বৃদ্ধিতে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নামবে। ইরান বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় দেশটির আধিপত্য আরও কতটা বিস্তৃত হবে তা নিয়ে শঙ্কিত এখন অন্যান্য রাষ্ট্র। সৌদি আরবকে ইরানের শত্রু রাষ্ট্র ভাবা হলেও, দেশটির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরাইল। তাই ইহুদীবাদী রাষ্ট্রটি প্রথম থেকেই এ চুক্তির বিরোধিতা করে আসছিল। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ আখ্যা দিয়েছেন। গেল বছর মার্কিন কংগ্রেসেও তিনি এ চুক্তির বিরোধিতা করে ভাষণ দিয়েছিলেন। কিন্তু ওবামা প্রশাসনের দৃঢ়তার কারণে তার কোন কূটকৌশল শেষ পর্যন্ত ধোপে টেকেনি। ইসরাইল ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যেরে অন্যতম মার্কিন মিত্র সৌদি আরব এ চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষমতার কাছে হার মেনে দুই মিত্র রাষ্ট্রকে নাখোশ করে পরমাণু চুক্তি সই করল যুক্তরাষ্ট্র।

প্রেসিডেন্ট রেজা শাহ পাহলভীপরবর্তী সময়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব ও দুরত্বের শুরু। ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের প্রথম থেকেই দেশ দুটির মাঝে শত্রুতা। দীর্ঘ চার দশক ধরে এ দুই দেশের মাঝে কূটনৈতিক সম্পর্কও প্রায় বন্ধ। বর্তমানে পরমাণু চুক্তির ফলে দু’দেশের মাঝে কিছুটা হলেও সম্পর্কের তিক্ততা কমবে বলে আশা বিশ্লেষকদের। দেশ দুটি ইতোপূর্বে ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসবিরোধী হামলায় অংশ নিলেও সিরিয়া ও ইয়েমেন ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। আশা করা যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ব্যাপারেও তারা ঐকমত্যে পৌঁছবে এবং মধ্যপাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় ইরান শিল্প উদপাদনে বেশ এগিয়ে। চিকিৎসা, সামরিক, শিক্ষা, শিল্পÑ সকল স্তরে তাদের অবস্থান অন্য রাষ্ট্র হতে উন্নত। ২০০৮ সালে প্রথম পশ্চিমা গোয়েন্দারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচী সম্পর্কে জানতে পারে। ফ্রান্সের গোয়েন্দা সংস্থা ইরানের পবিত্র শহর কৌমের অদূরে আবিষ্কার করে ফোর্দ পরমাণু স্থাপনার। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তোলা কিছু ছবির মাধ্যমে তারা বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। বুশ প্রশাসন প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কোন প্রতিক্রিয়া না জানালেও ২০০৯ সালে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন পর প্রথম এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখেন। তিনি ইরানকে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম ছেড়ে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানান। কিন্তু ইরান সে আহ্বানে সাড়া দেয়নি ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতায় জাতিসংঘ ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু ইরান তার পরমাণু কর্মসূচী থেকে পিছিয়ে আসেনি। বরং পশ্চিমা শক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তার কর্মসূচী চালু রাখে। ইরান ২০১৩ সালে যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম মজুদ করেছিল, তা দিয়ে আটটি পরমাণু বোমা তৈরি করতে সক্ষম হতো। ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে ব্যাপক ধস নামায়। মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশে। জনগণ ও রাষ্ট্রের মাঝে দূরত্ব বাড়তে থাকে। দেশে নেমে আসে দারিদ্র্যের খড়গ। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানী ক্ষমতায় আসার পর অবশেষে এ অচলাবস্থার অবসান ঘটে। শুরু হয় সমঝোতা নতুন পথ।