২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মিসরে সাংবাদিক সমাজ অবরুদ্ধ

  • এনামুল হক

সিনাইয়ের উত্তরাঞ্চলে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের সঙ্গে যুক্ত জিহাদীদের সঙ্গে মিসরীয় সেনাবাহিনীর লড়াই চলছে। গত ১ জুলাই সেখানে সহিংসতা তুঙ্গে পৌঁছায়। জিহাদী জঙ্গীরা একসঙ্গে অর্ধডজন সেনাচৌকির ওপর যুগপৎ হামলা চালায়। বেশ কিছু সৈন্য নিহত হয়। কিন্তু নিহতের সংখ্যা গোনার জন্য কোন রিপোর্টার সেখানে ছিল না। কারণ মিসরীয় সেনাবাহিনী ঐ অঞ্চলে মিডিয়ার লোকজনের প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

তবে অজ্ঞাতনামা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে স্থানীয় ও বিদেশী সংবাদ মাধ্যমগুলো নিহত সৈনিকের সংখ্যা প্রাথমিকভাবে ৬০ থেকে ৭০ বলে উল্লেখ করা হয়। চার বছর ধরে মিসর উত্তর সিনাইয়ে পোড়ামাটির কৌশল অবলম্বন করা সত্ত্বেও জিহাদীদের এই সহিংসতা চলছে এবং সেখানে একদিনে সেনাবাহিনীর এতজন সদস্য আগে আর কখনো মারা যায়নি। তবে মিডিয়ায় আসা এতজন সেনার প্রাণহানির খবরটি মোটেও ভালভাবে নেয়নি সেনাবাহিনী। তাদের তরফ থেকে নিহত সেনাদের সংখ্যা ২১ বলে উল্লেখ করা হয়। সেনাবাহিনীর ফেসবুক পেজে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয় যে, মিসর এখন দুই ফ্রন্টে লড়ছে। এক ফ্রন্ট স্থলভাগের লড়াই এবং অন্য ফ্রন্ট বিদেশী মিডিয়ার পরিচালিত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হিংস্র যুদ্ধ।

মিসরে মিডিয়ার ওপর এক অদৃশ্য অবগুণ্ঠন বিছিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসির সরকার দ্বিতীয় ফ্রন্টে লড়াইয়ের জন্য জোরেশোরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগে থেকেই দেশে অনেক কঠিন কঠিন আইনকানুন বলবত আছে। সেগুলোর শক্তি বৃদ্ধির জন্য এখন এক নতুন সন্ত্রাস দমন বিলের প্রস্তাব করেছে সরকার। বিলের ৫৫টি অনুচ্ছেদের মধ্যে একটিতে বলা আছে যে, কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে সরকারের দেয়া তথ্যের পরিপন্থী কোন অসত্য সংবাদ ও বা তথ্য উপাত্ত ছাপলে, তার জন্য তাকে অন্যূন্য দুই বছরের কারাদ- দেয়া হবে।

মিসরের মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও জাতীয় সাংবাদিক ইউনিয়ন খসড়া আইনটিকে সংবিধান পরিপন্থী ও নিদারুণ হানিকর আখ্যায়িত করেছে। তবে রাজপথে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে প্রণীত একটি বিতর্কিত আইন যেমন পার্লামেন্টে পাস হয়েছিল এবং সেই আইনে বেশ কয়েকজন শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, তেমনি এই আইনটিও নির্বিঘেœ পাস হওয়ার কথা। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ফিল্ড মার্শাল সিসির সরকারের উত্তরোত্তর সামরিকীকরণ ঘটেছে। গত জুন মাসে ইসলামপন্থীদের হাতে দেশের প্রধান কৌশলী নিহত হওয়ার পর সরকারের কাছে পরিস্থিতিটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, তারা বাক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো মোটেই গ্রাহ্য করছে না।

সোজা কথায় মিসরে এখন সিসির স্বৈরাচারী শাসন চলছে। সিসি অবশ্য এমন শাসনের যৌক্তিকতা দেখাতে ছাড়েন না। বলেন, তিনি দেশকে স্থিতিশীলতা এনে দেবেন। মিসরের মিডিয়া অবশ্য সিসির জন্য কোন ঝামেলা সৃষ্টি করে না। মিসরের সবচেয়ে নামী-দামী পত্রিকার সম্পাদকরা সিসির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হওয়ার পর কথা দিয়েছেন যে, তারা রাষ্ট্রের সমালোচনা সীমিত পরিসরে রাখবেন। বিরুদ্ধবাদী টিভি নেটওয়ার্কগুলো এবং মিডিয়া মালিকরা সরকারের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সমালোচনামূলক বক্তব্য প্রচার বন্ধ রেখেছে।

প্রধান কৌশলী নিহত হওয়ার পর মিসরের দৈনিকগুলো প্রায় অভিন্ন শিরোনাম দিয়েছে। অবশ্য এমন ব্যাপার এই প্রথম হয়েছে, তা নয়। সিসির সরকার বিরোধীদলীয় লোকদের গণহারে সাজা দিয়েছে এবং নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুরতার জন্য অভিযুক্ত পুলিশদের গণহারে খালাস দিয়েছে। অনেক মিসরীয় এ ঘটনা ভুলতে পারে না।

তবে বিদেশী মিডিয়া সিসি সরকারের ওপর বেশ ক্ষ্যাপা। আল-জাজিরা সিসির ঘোর সমালোচক এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি সহানুভূতিশীল। এই চ্যানেলের তিন সাংবাদিক জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষতিসাধনের অভিযোগে ৪শ’ দিন জেল খেটেছে। স্পেনের দৈনিক এল পাইস আসন্ন গ্রেফতার এড়াতে মিসর থেকে পালিয়ে গেছেন। মিসরের রিপোর্টাররাও এখন দারুণ ঝুঁকির মুখে। অন্তত ১৮ জন জেলে আছেন। অসাংবাদিকদেরও কণ্ঠ এখন স্তব্ধ। কারণ তাদের ওপর নেমে আসছে নানা ধরনের হুমকি।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট