২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জমি-জনপদ পানির নিচে

  • দক্ষিণাঞ্চলে বাঁধ ভেঙ্গে কয়েক লাখ মানুষ দুর্ভোগে

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জমি-জনপদ সব এখন পানির নিচে। বন্যার কারণে স্কুলের সাময়িক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে রয়েছে কয়েক লাখ নারী-পুরুষ-শিশু। স্টাফ রিপোর্টার ও নিজস্ব সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :

গলাচিপা ॥ পটুয়াখালী জেলার চার উপজেলার আটশ’ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ দীর্ঘদিন ধরে বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তার ওপরে সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় কোমেনের আঘাত ও পূর্ণিমার জোয়ারের জলোচ্ছ্বাসে নতুন করে আরও প্রায় ৫০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এতে বাঁধের ভেঙ্গে যাওয়া অংশ দিয়ে জোয়ারের পানির প্লাবনে উপকূলের গলাচিপা, কলাপাড়া, দশমিনা ও রাঙ্গাবালী উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের ৮৫ গ্রামের লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তারা প্রতিটি মুহূর্ত চরম দুর্ভোগে কাটাচ্ছে। অন্যদিকে, জলাবদ্ধতার কারণে রোপা আমনের আবাদ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কয়েক হাজার একর জমির আমন বীজতলা পানির নিচে ডুবে আছে। পানিতে পচে যাচ্ছে কৃষকের পরিশ্রমের বীজতলা।

ইউপি চেয়ারম্যান দুলাল চৌধুরী জানান, তার এলাকার ৫৫/২/সি পোল্ডারের কল্যাণকলস গ্রামের স্লুইসগেটসংলগ্ন এলাকার বেড়িবাঁধের তিনটি পয়েন্টে ভাঙ্গন তীব্র আকার নিয়েছে। ভাঙ্গনের অংশ দিয়ে রামনাবাদ নদীর পানি ঢুকে কল্যাণকলস, সৈয়দকাঠি ও লামনা গ্রাম তিনটি পানির নিচে ডুবে আছে। ঘূর্ণিঝড় কোমেন কেটে যাওয়ার পরে পূর্ণিমা ও মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বর্তমানে সাগর ও নদ-নদীর পানি আরও বেড়েছে। জোয়ারের সময় তা আরও অস্বাভাবিক আকার নিয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে এসব গ্রামের মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। জরুরী ভিত্তিতে ভাঙ্গন ঠেকাতে পাউবোর কোন কার্যক্রম না থাকায় মানুষ আরও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কারণ সামনেই রয়েছে ঘূর্ণিঝড় মৌসুম। এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল খায়ের জানান, এমনিতেই বাঁধের বেশ কিছু অংশ আগে ভেঙ্গে ছিল। গত কয়েক দিন ধরে জোয়ারের জলোচ্ছ্বাসে নতুন করে বাঁধ হুমকির মধ্যে পড়েছে। এরই মধ্যে আরও ৪৫ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

বাগেরহাটে ॥ বাগেরহাটে ভৈরব নদীর ভেড়িবাঁধ ভেঙ্গে বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সোমবার গভীররাতে রিং বেড়ি ভেঙ্গে কুলিয়াদাইড়, কুড়ামারা, পার-কুড়ামারা, কু-কুড়ামারা, কুড়ামারা ও ডিংশি পাড়াসহ সাত গ্রাম প্লাবিত হয়। ফলে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, বাজার, পুকুর সব পানিতে একাকার হয়ে গেছে। শতাধিক চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে। ঘরে পানি উঠে যাওয়ায় অধিকাংশ পরিবারের রান্না-বান্না প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামবাসী জরুরী ভিত্তিতে বাঁধ মেরামতের জন্য আবেদন জানিয়েছেন।

বরগুনা ॥ বেরিবাঁধ ভেঙ্গে মাঝের চর রক্ষা বাঁধের ৫০ ফুট ভেঙ্গে প্লাবিত হয়েছে শতাধিক পরিবার। প্রবল জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলী ক্ষেত ও ভাসিয়ে নিচ্ছে মাছের ঘের। অস্বাভাবিক জোয়ারের পানির চাপে জনজীবনসহ ব্যাহত হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এতে প্রতিদিন দুইবার অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে ভাসছে আর ভাটায় শুকাচ্ছে এসব এলাকার মানুষ। এছাড়াও পানির অস্বাভাবিক চাপে বরগুনা পৌর শহরসহ প্লাবিত হয়েছে পাথরঘাটা, বামনা, বেতাগী, আমতলীসহ তালতলীর নি¤œাঞ্চল।

সাতক্ষীরা ॥ জলাবদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় জেলার তালা উপজেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ২৫টি কেজি স্কুল রয়েছে। সোমবার থেকে এসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে এই পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে ৩৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিতে ডুবে যাওয়ায় সেখানে সাময়িক পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া ১০টি মাধ্যমিক ও মাদ্রাসার পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। আর ৫০টি বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা পানির মধ্যে ক্লাস করছে। সবমিলিয়ে উপজেলায় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জলাবদ্ধতার কারণে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

রাঙ্গুনিয়া ॥ অতিবর্ষণের পর পাহাড়ী ঢলে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কর্ণফুলী, ইছামতি ও কয়েকটি শাখা নদীর দুই তীরের বাসিন্দারা তীব্র ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে। বৃষ্টি থামার পর নদী ভাঙ্গনের তীব্রতা ও ব্যাপক হারে পাহাড় ধস শুরু হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে ঠাঁই নেয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠী আতঙ্কে বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছে। নদী ভাঙ্গন আতঙ্কে রয়েছে রাঙ্গুনিয়া পৌরসভা ও ১২ ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী ৪০ হাজার পরিবার। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ থামার পর অসংখ্য মসজিদ, স্কুল, মাদরাসা অভ্যন্তরীণ সড়কের অংশবিশেষ ও অন্যান্য স্থাপনা এখন ভাঙ্গনকবলিত। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পাহাড় ধস। অতিবর্ষণে পাহাড় ধসে বেতাগী ইউনিয়নের চেংখালী, বালুছড়া, ঢেমিরছড়ায় ৬টি মেটো ঘর ধসে পড়েছে। পারুয়া ইউনিয়নের জঙ্গল পারুয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ও লক্ষিরখীলে ৬টি। সরফভাটা ইউনিয়নের পোড়ামুড়া গ্রামে ৪টি ঘর। এছাড়া পদুয়া ইউনিয়ন ও কোদালা ইউনিয়নে পাহাড় ধসে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

ঝালকাঠি ॥ বিষখালী নদীর করাল গ্রাসে ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া উপজেলা নিঃস্ব হয়ে পড়ছে হাজারো মানুষ। দিন দিন ছোট হয়ে আসছে এই উপজেলার মানচিত্র। সিডর, আয়লা, মহাসেন প্রভাবের পরে এ বছরের অতি বৃষ্টিতে বিষখালীর ভাঙ্গন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে ভূমিহীনে পরিণত হচ্ছে শ’ শ’ পরিবার। ভাঙ্গনের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে আমুয়া বন্দর, স্টিমারঘাট প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হাসপাতাল, কচুয়া রোড সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বহু হাট-বাজার, মসজিদ, মন্দির এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

কুষ্টিয়া ॥ কুষ্টিয়ায় অতি বর্ষণে সবজিসহ অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব ফসলের মধ্যে রয়েছে ভুট্টা, বেগুন, করলা, শসা, পটল, মরিচ ও পেঁপে। কুষ্টিয়া জেলার ৬টি উপজেলায় এবার মোট ২ হাজার ৮৪৬ হেক্টর জমিতে আমন বীজতলা করা হয়। এর মধ্যে ৪৪ হেক্টর জমির বীজতলা বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরে পরিস্থিতি উন্নতির কারণে তা পুষিয়ে যায়।