২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মহীরুহরূপী এক মহারাজ স্যার

আবদুর রহমান

বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার পালরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদী অংশের দক্ষিণ বিজয়পুর গ্রামে অবস্থিত বিদ্যালয়টি বরিশাল জেলার তো বটেই দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ। ১৯৩৫ সালে জমিদার মোহন লাল সাহা চমৎকার নৈঃসর্গিক পরিবেশে স্থাপন করেন এ বিদ্যালয়টি। কালপরিক্রমায় বিদ্যালয়টি সত্যিকার অর্থেই মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এই মহীরুহে পরিণত হওয়ার পথক্রমা মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। দরিদ্র এবং অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত অঞ্চলের প্রতিষ্ঠান। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই দূর-দূরান্ত থেকে আসা। বিদ্যালয়টির সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় আশপাশে থানা তো বটেই জেলা থেকেও শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় এ বিদ্যালয়ে। পালরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মহীরুহে পরিণত হওয়ার পেছনের মানুষ হচ্ছেন এর সাবেক প্রধান শিক্ষক মহারাজ ম-ল। একনাগাড়ে তিন যুগের মতো বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। এর বেশিরভাগই সময়ই তিনি ছিলেন প্রধান শিক্ষক। মহারাজ স্যারের যতেœ বিদ্যালয়টির হাজারো শিক্ষার্থীই শুধু মানুষের মতো মানুষ হয়নি, পালরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিণত হয়েছে এক আকর্ষণীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন খুলনা বিভাগের সেরা বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পায় বিদ্যালয়টি। মহারাজ ম-লের কাছে বিদ্যালয়টি ছিল সন্তানতুল্য। তিনি বিদ্যালয় থেকে বাড়িতে ফিরতেন সন্ধ্যার পরে, কখনও বা রাতে, কখনও গভীর রাতে। আবার দেখা যেত সাত সকালে উঠেই তিনি এসে ঘুরে দেখছেন বিদ্যালয়টি। যেন ঘুম থেকে উঠেই প্রিয়মুখ দেখা! সকালে দেখভাল শেষে বাসায় ফিরে তিনি আবার বিদ্যালয়ে আসতেন স্কুলের কর্মঘণ্টা শুরুর আগেই। ঘুরে ঘুরে দেখতেন সব কিছু ঠিক আছে কি না! শিক্ষক তো বটেই, শিক্ষার্থীদের মুখও তাঁর চেনা। কোন ছাত্র অনুপস্থিত থাকলে খুব কম সময়ই তাঁর চোখ এড়াতো, বিশেষ করে নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর কেউ অনুপস্থিত থাকলে ব্যক্তিগতভাবে খোঁজ খবর নিয়েছেন তার সম্পর্কে। শুধু লেখাপড়া নয়, খেলাধুলা আর সংস্কৃতিচর্চায় মহারাজ ম-ল ছিলেন দারুণ উৎসাহী। পালরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান গৌরনদী অঞ্চলের মানুষের জন্য বার্ষিক উৎসব ও আনন্দের উপলক্ষে পরিণত হয়েছিল। মহারাজ ম-লের কষ্ট ছিল বিদ্যালয়টির সামনে স্রোতস্বিনী খালের ভাঙন থেকে এর বিশাল মাঠটিকে রক্ষা করতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে না পারা। বিদ্যালয়টির মাঠ রক্ষায় এর চারপাশে গাছ লাগিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু প্রবল স্রোত আর ঘূর্ণনে মাঠটির ভাঙন ঠেকানো সত্যই দুঃসাধ্য ছিল। মহারাজ স্যার পালরদী মাধ্যমকি বিদ্যালয় থেকে অবসরে যাবেন এটা ছিল কল্পনারও বাইরে। কিন্তু বয়সের কাছে সবারই হার মানতে হয়, একদিন বিদায় নিতে হয় তাঁকেও। মহারাজ স্যারের অবসর জীবনের কিছুদিন ঢাকায় কাটে। একসময় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান তিনি। তবে স্যারের শেষ ঠাঁই হয়েছে তাঁর প্রিয় বিদ্যালয়ের সামনে। তাঁর স্মরণে সেখানে গড়ে উঠেছে স্মৃতিস্তম্ভ, যাতে জ্বলজ্বল করছে ‘মহারাজ ম-ল’ নামটি।

গৌরনদী বরিশাল থেকে