২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাদাসিধে শিক্ষাগুরু

আহমেদ উল্লাহ

স্যার যখন বাংলা পড়াতেন, সকলে অপলক চোখে চেয়ে থাকতাম। আবেগঘন স্বরে আবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দেহাবয়বের ছন্দময় ভঙ্গিমাটা ছিল চমৎকার! যা আজও মনের বাগানে দোদুল্যমান ফুলের মতো ভেসে ওঠে! জানি না, স্যার আজ কেমন আছেন? হয়ত বা পেনশনে গিয়ে বার্ধক্যের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। তবে লোকমুখে শুনেছি- স্যার এখনও নাকি বৃদ্ধদের শিক্ষা দিয়ে থাকেন। যিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। আমার প্রিয় ও পূজনীয় শিক্ষক। হোমনা পাইলট সরকারী (বালক) উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক মাজহারুল ইসলাম স্যার। সাদাসিধে জীবনযাপন করা এই শিক্ষকের চেহারা দেখে অনেকেই অনুমান করতে পারেনি যে, তিনি একজন উচ্চপর্যায়ের জ্ঞানীব্যক্তি। জীবন ও জগত সর্ম্পকে ছিল যাঁর সীমাহীন জ্ঞান! একজন আধ্যাত্মিক ও জ্ঞানবাদী মানুষ হিসেবে স্যারের তুলনা কমই হয়। স্কুল লাইব্রেরিটা ছিল স্যারের দায়িত্বে। স্যার যতদিন ছিলেন, বিদ্যালয়ের লাইব্রেরির দায়িত্বটা কেউ তাঁর কাছ থেকে নিতে পারেননি। একটু অবকাশ পেলেই তিনি লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ে থাকতেন। নতুন নতুন বই সংগ্রহ করতেন। নিজে বই পড়তেন। আমাদের বই পড়ার প্রতি তিনিই আগ্রহের জন্ম দিয়েছিলেন। আজও কোন একটি বই হাতে নিলেই ভক্তিপূর্ণ শ্রদ্ধায় স্যারের চেহারা মনোরাজ্যের আকাশে ভেসে ওঠে। স্যার ছিলেন অত্যন্ত সাহিত্যমনা মানুষ। কথায় কথায় তিনি নতুন গল্প বানিয়ে ফেলতেন। স্যারের মুখে গল্প শুনে আমরা কত যে হাসি-কান্নায় ভেসে বেড়িয়েছি, তার হিসাব নেই। একদিন ক্লাসে পড়াতে গিয়ে স্যার বলেছিলেন, ‘বলতো, কে তোমাদের সবচেয়ে আপন?’ অনেকেই বললÑ ‘বাবা-মা’। স্যার মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘একজন শিক্ষকই ছাত্রের সবচেয়ে আপন। আর শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছে আপন। যেমনÑ শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মুখ দেখে, সন্তানের কথা ভুলে থাকে। শিক্ষার্থীরা, শিক্ষকের আদর-স্নেহে বাবা-মায়ের কথা ভুলে থাকে। তাছাড়া দিনের বেশিরভাগ সময়ই একে অপরের কাছাকাছি থাকে।’ সাহিত্য ও ইতিহাসবিদ্যার এমন কোন বই হয়তবা নেই, যা স্যার কখনও পড়েননি। কাউকে প্রশ্ন করে স্যারের কাছ থেকে কখনও ফিরে যেতে দেখিনি। ক্লাসের পাঠ তিনি ক্লাসেই আয়ত্ত করিয়ে ছাড়তেন। তাঁর পাঠদানের প্রক্রিয়াটা ছিল বড়ই অদ্ভুত ও আনন্দঘন। যে বিষয়টি নিয়ে তিনি পড়াতেন, স্যারের মুখ থেকে শুনেই হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে যেত যে, পড়া ছাড়াই আয়ত্ত হয়ে যেত।

হোমনা, কুমিল্লা থেকে