১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাইশে শ্রাবণ

আজ বাইশে শ্রাবণ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিরোধান দিবস। আজ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হবে কবিকে। যাঁরা বিখ্যাত, দেশের মানুষের শ্রদ্ধেয়, প্রাতঃস্মরণীয় মানুষ, তাঁদের অনেককেই আমরা স্মরণ করি দুটি দিবসেÑ জন্ম এবং মৃত্যু। এটাই দেশ ও সমাজে দেখা যায়। তবে এমন কিছু মানুষ থাকেন যাঁদের ওই দুটি দিবসে স্মরণ করা হলেও বছরে এমন কোন দিন থাকে না, যেদিন তাঁদের স্মরণ করা হয় না। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের মধ্যে একজন। তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করার জন্য দুটি দিন রয়েছে- পঁচিশে বৈশাখ এবং বাইশে শ্রাবণ। বাংলাদেশ ও ভারতে এ দুটি দিনেই তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। কিন্তু আমাদের এমন কোন দিন নেই যেদিন তাঁকে স্মরণ করি না। আমাদের প্রয়োজনেই তাঁকে স্মরণ করতে হয়। এ দেশের মানুষ সংস্কৃতিমনা ও ঐতিহ্যমনস্ক। আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। জড়িয়ে আছেন আমাদের ভাষার সঙ্গে। জড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর নাম। তাঁকে আমরা ভালবাসি শুধু কবি হিসেবে বা সঙ্গীত রচয়িতা বা সুরস্রষ্টা হিসেবেই নয়, আমাদের মাতৃভাষার উন্নয়নে তিনি একা যে কাজ করে গেছেন, মাতৃভাষাকে বিশ্বাঙ্গনে পরিচিত করানোর জন্য তাঁর যে অবদান সেই জন্যও আমরা তাঁকে ভালবাসি, তাঁর প্রতি আমাদের বাংলাভাষী মানুষের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তাঁকে আমাদের সংস্কৃতি থেকে বাদ দেয়ার উপায় নেই।

পাকিস্তান আমলে তাঁকে বাদ দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল, নিষিদ্ধ করা হয়েছিল তাঁর গান। এ দেশের মানুষ সে চেষ্টাকে প্রতিহত করেছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ দেশের মানুষকে বিশেষ করে ভাষা ও সংস্কৃতির বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে হয়। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে প্রথম থেকেই অনীহা প্রকাশ করে এবং ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে এ দেশের মানুষকে সরিয়ে নেয়ার নানা কৌশল করে। সে সময় এ বিষয়ে নানা অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যায় এবং বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন গুলি করে নিস্তব্ধ করে দেয়ার চেষ্টাও করা হয়। এ সবের একপর্যায়ে নিষিদ্ধ করা হয় রবীন্দ্রসঙ্গীত। কিন্তু এ দেশের মানুষ তাদের সব অপচেষ্টা নস্যাত করে দিয়েছে। এ দেশের মানুষ নানা সঙ্কটে বিপর্যয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছে। তারা রক্ষা করেছে তাদের সংস্কৃতিকে, তাদের কৃষ্টিকে। নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাক সত্ত্বেও সব সময় সঙ্গে রেখেছে রবীন্দ্রনাথকে।

আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এ জন্য আমাদের পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘপথ, চড়াই-উতরাইয়ের পথ। এ সব পথেই আমাদের সঙ্গে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর লেখা, তাঁর গান আমাদের প্রেরণা দিয়েছে, সাহস যুগিয়েছে। তঁাঁর গান আমাদের দেশপ্রেমে অধিকতর সঞ্জীবিত, উদ্বুদ্ধ করেছে, দেশজননীর দুর্যোগে তার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে নিতে সাহস যুগিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁরই গান ‘আমার সোনার বাংলা’ আমাদের জাতীয় সঙ্গীত, আমাদের প্রাণের সঙ্গীত।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভাষাকে যেমন ঘরের বাইরে বিশ্ব অঙ্গনে নিয়ে গেছেন, তেমনি আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে বাইরের সংযোগ ঘটিয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি হলেও তাঁকে বলা হয় বিশ্বকবি। তাঁর কাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে বিশ্বমানবতা, বিশ্বজনীনতা। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণরূপে কূপম-ূকতার বিরুদ্ধে, গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। রবীন্দ্রনাথ কাব্যে ও জীবনে ছিলেন সকল প্রকার সঙ্কীর্ণতার উর্ধে, মানবাধিকারের পক্ষে, অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনার এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পক্ষে; ছিলেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে, শান্তির পক্ষে সোচ্চার। কৃষকের উন্নতির চিন্তা থেকেই নিজের নোবেল পুরস্কারের টাকা দিয়ে তিনি কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য, গান এখনও আমাদের প্রেরণা দিচ্ছে, উদ্বুদ্ধ করছে, আপ্লুত করছে। আজ এই বিশেষ দিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা।