২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পে ক্ষতি দু’দেশেরই

  • বাস্তুচ্যুত হবে লাখো মানুষ ;###;কৃষি ও জীববৈচিত্র্যে প্রভাব ফেলবে

শাহীন রহমান ॥ ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতেও ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ প্রকল্পের ফলে বাস্তুচ্যুত হবে সেখানকার লাখ লাখ মানুষ। এমনকি ভারতের পানি উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ক জাতীয় কমিশনের গবেষণা রিপোর্টেই ভারতে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। নদীতে পানিস্বল্পতা দেখা দেয়ার কারণে দেশের প্রধান নদীগুলোতে সমুদ্রের লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু ভারতেও এর প্রভাব কোন অংশে কম হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতামত, এ বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ভারত সরকার কোন বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়াই বার বার আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পটি সামনে নিয়ে আসছে। কিন্তু স্বয়ং ভারতের পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা এ প্রকল্প বাস্তবায়নে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ১৯৯৯ সালের ভারতের পানি উন্নয়ন বিষয়ক জাতীয় কমিশনের রিপোর্টেই বলা হয়েছে, এ প্রকল্পের ফলে ভারতের আর্থসামাজিক, মানবিক ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের দিক দিয়েও অসম্ভব। যেসব এলাকা বা রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে সেখানকার জনগণের কাছ থেকেও প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হবে। বিশেষ করে যেসব জনগণ মনে করবে এ প্রকল্পের মাধ্যম তারা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তারা প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া পরিবেশবাদী সংগঠন ও পরিবেশবিদদের কাছ থেকে বাধার সম্মুখীন হতে হবে। এছাড়া এ প্রকল্পের ফলে ব্যাপক পরিমাণ লোক তাদের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হবে, যা সৃষ্টি করবে একটি মানবিক বিপর্যয়।

সম্প্রতি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পুনরায় এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর জোর দেয়ার কথা বলা হচ্ছে। গত ১৩ জুলাই ভারত সরকারের প্রেস ইনফর্মেশন ব্যুরো কর্তৃক জারিকৃত একটি প্রেস রিলিজে জানানো হয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পানি সমৃদ্ধ রাজ্যগুলোকে সদিচ্ছা এবং সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার প্রতি আগ্রহী হতে বলেছেন। নয়াদিল্লীতে আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনার বিশেষ কমিটির পঞ্চম সভায় তিনি বলেন, এই মেগা প্রকল্পটি বহুদূর পাড়ি দিয়ে দেশের পানি ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি জোরদার করবে। সভায় মধ্য ও দক্ষিণ ভারতে প্রস্তাবিত ও চলতি অন্য আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। মন্ত্রী বলেন, তার মন্ত্রণালয় খুব শীঘ্রই মানস সংকোশ তিস্তা-গঙ্গা সংযোগ প্রকল্পটি নিয়ে অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার সরকারের সঙ্গে আলাপ করে কাজ শুরু করবে। এই প্রকল্পটি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারকে শুধুমাত্র সেচ ও পানি সরবরাহের সুবিধাই নয়, এক বিরাট পরিমাণ পানি দক্ষিণের রাজ্যগুলোকে সরবরাহ করতে পারবে। নদী পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, উনিশ শ’ পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ভারতের পরিকল্পনাবিদরা দেশব্যাপী আন্তঃনদী সংযোগের প্রস্তাব করেন। ১৯৯৯ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনাটি জেগে ওঠে। মোট ৩০টি ক্যানাল সিস্টেমের ওই প্রকল্পে বৃষ্টিপ্রধান উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে খাল কেটে পানি সরিয়ে নিয়ে পশ্চিম এবং দক্ষিণ ভারতে পাঠানোর কথা রয়েছে। প্রকল্পটি রাজস্থান, গুজরাট ও দক্ষিণ ভারতের জনগণকে লাভবান করবে বিধায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনগণ এতে বাধা দেবে। তিনি বলেন, আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ১নং খালের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে পানি এই অঞ্চল দিয়ে নিতে হলে প্রায় ১শ’ মিটার উঁচুতে তুলে ডুয়ার্সের উচ্চভূমি দিয়ে পার করতে হবে। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর ও মালদহ জেলাগুলোতে নদীর মতো খাল কাটতে হবে, যা লাখ লাখ মানুষকে উচ্ছেদ করবে ও পরিবেশ বিপর্যয় হবে। ব্রহ্মপুত্র থেকে গঙ্গায় আনা পানি ১০নং সংযোগ খালের মাধ্যমে বীরভূম, বাঁকুড়া, উত্তর এবং দক্ষিণ মেদিনীপুর জেলাগুলোর ওপর দিয়ে খাল কেটে দক্ষিণ ভারতে নেয়া হবে, যা লাখ লাখ মানুষকে উচ্ছেদ করবে ও পরিবেশ বিপর্যয় হবে। তাছাড়া দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে সংগৃহীত পানির সিংহভাগই বাষ্পীভবন হয়ে উবে যাবে। বিহারের নদীগুলোতে যে পানি রয়েছে তা ওই এলাকার জন্য যথেষ্ট। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ১২ ও ২নং খালের মাধ্যমে মেচি ও কোশী নদীর পানি বিহারের তরাই অঞ্চল দিয়ে এবং ৩নং খাল দিয়ে গন্ডক নদীর পানি সমভূমির ওপর দিয়ে গঙ্গায় ফেলা হবে। এতে ওই সব নদীর অববাহিকার জেলাগুলোতে নদীর মতো খাল কাটতে হবে, যা এই এলাকার কোন উপকারে তো আসবেই না বরং লাখ লাখ মানুষকে উচ্ছেদ করবে ও পরিবেশ বিপর্যয় হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের শুরু অসমের ব্রহ্মপুত্র নদ এবং এর উপনদ মানস থেকে। এই নদ দুটির পানি অন্যত্র সরাতে হলে গুয়াহাটি অথবা গোয়ালপাড়াতে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ব্যারাজ নির্মাণ করতে হবে। এই ব্যারাজ অসমের বন্যার পানি দ্রুত সরে যাওয়াকে বাধাগ্রস্ত করে পরিস্থিতি আরও খারাপ করবে। তাছাড়া মানস নদ সংযোগ প্রকল্পের ১৪নং খালটির মাধ্যমে পানি সরাতে অসমের বরপেটা, কোকড়াঝড় ও ধুবড়ী জেলাগুলোতে নদীর মতো খাল কাটতে হবে, যা এই এলাকার কোন উপকারে তো আসবেই না বরং লাখ লাখ মানুষকে উচ্ছেদ করবে ও পরিবেশ বিপর্যয় হবে।

তাদের মতে, বাংলাদেশে শুকনা মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি শতকরা ৮০ ভাগ চাহিদা পূরণ করে। যার ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের কৃষি ও জীব পরিবেশ গড়ে উঠেছে। এর একটা বিরাট অংশ ভারতের পশ্চিমে চালান করলে বাংলাদেশে বিশাল পরিবেশ বিপর্যয় হবে। সমুদ্রের লবণাক্ততা পদ্মার গোয়ালন্দ, মধুমতির কামারখালী, ধলেশ্বরীর মানিকগঞ্জ এবং মেঘনার ভৈরব ছাড়িয়ে যাবে। সমগ্র যমুনা নদীর নাব্য হারিয়ে যাবে। সারাদেশের নদী ও অভ্যন্তরীণ জলাভূমির প্রায় অর্ধেক এলাকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। মিষ্টি পানির অভাবে সারাদেশের প্রায় অর্ধেক এলাকার জীব এবং জনজীবন অভূতপূর্ব বিপদের মুখে পড়বে। মোহনা এলাকার জীববৈচিত্র্য, মৎস্য এবং জলজসম্পদ বিপর্যস্ত হবে।

ভারতের পানি উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ক ওই রিপোর্টে ভারতে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্ষতির বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের রিপোর্টে বলা হয়েছে, যেখানে ফারাক্কা বাঁধের পানিবণ্টন নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে একটি চুক্তি রয়েছে। এ চুক্তি অনুযায়ী ভারত থেকে ফারাক্কা পয়েন্ট দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি বাংলাদেশকে দেয়ার নিশ্চয়তা দেয়া আছে। সেখানে আন্তঃনদী সংযোগ বাস্তবায়ন করা হলে চুক্তি অনুযায়ী কিভাবে বাংলাদেশকে পানি দেয়া সম্ভব?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে পানি নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ওই সময় পাকিস্তানের পূর্ব অংশে গঙ্গা নদীর পানি নিয়ে কোন সমঝোতা ছাড়াই ভারত গঙ্গার উপর ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ শুরু করে। ১৯৭৫ সালে ব্যারাজটি চালু করে পানি প্রত্যাহার শুরু হলে বাংলাদেশ বিশেষভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। পাকিস্তান আমলের শুরুতে হার্ডিঞ্জ সেতুর কাছে শুকনা মৌসুমে গঙ্গা নদীর গড় প্রবাহ ছিল প্রায় এক লাখ কিউসেক। ১৯৭৭ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম ৩৪ হাজার ৫শ’ কিউসেক পানি সরবরাহের গ্যারান্টি ছিল। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে সর্বনিম্ন ২৭ হাজার ৬৩৩ কিউসেক পানি দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলেও চুক্তি অনুযায়ী কোন পানি পাওয়া যাবে না। ফলে দেশের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।

ভারতের পানি বিষয়ক ওই কমিশনের রিপোর্টেই বলা হয়েছে, কোন রাজ্যে তাদের পানি সর্বোচ্চ ব্যবহার না করে তা অন্য রাজ্যে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত সরকার কমিশনের এ রিপোর্টের ওপর জোর না দিয়ে কোন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ না করে সুপ্রীমকোর্টের রায়ের ওপর ভিত্তি করেই এ প্রকল্প নিয়ে বার বার অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের ওই রায়ে বলা হয়, এ জাতীয় প্রকল্পের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ আগে বিবেচনা করতে হবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে রাজ্য সরকারকে সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, খরাপ্রবণ এলাকার অনাহার ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এটা করা প্রয়োজন। পরিবেশগত দিক এবং বাস্তবায়নের বিষয়ে কোন কথা বলা হয়নি। কিন্তু কমিশনের সুপারিশে আগেই বলা হয়েছে, যদি কোন নদীতে অতিরিক্ত পানি থাকে তাহলে আন্তঃবেসিন সিস্টেমে সেটা ব্যবহার করা যেতে পারে। তার আগে ওই এলাকার পানির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও ভারতে এই প্রকল্প বন্ধ করার জন্য ২০০২ সালে প্রায় ৫৮ জন বিখ্যাত ব্যক্তি (বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী) রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রকল্প একটি বাজে ধারণা থেকে এসেছে। তারা জরুরী ভিত্তিতে এ ধরনের প্রকল্প বন্ধের আহ্বান জানান। স্বয়ং ভারতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের উচিত ছিল বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে এ বিষয়ে পরামর্শ নেয়া।