২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৭০৪ পেট্রোল বোমা মামলার মধ্যে চার্জশীট ১৩৭টির

শংকর কুমার দে ॥ বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে পেট্রোলবোমার সহিংস সন্ত্রাসের ঘটনায় জড়িত দুর্বৃত্তদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা, বিভাগীয় ট্রাইব্যুনালে বিচার করাসহ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর বিষয়গুলো ধামাচাপা পড়ার উপক্রম হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহিংস ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে ৭০৪টি। এরমধ্যে অভিযোগপত্র (চার্জশীট) দেয়া হয়েছে মাত্র ১৩৭টি মামলার।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্যে নির্বাচনকালীন সহিংসতায় খুনের মামলা হয়েছে ১৪টি। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি ৪৩৬ জন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অন্যান্য সহিংসতায় সারাদেশে দায়ের করা মামলার আসামি লক্ষাধিক। এসব আসামি আর গ্রেফতার হচ্ছে না, প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অনেক মামলার তদন্ত চলে গেছে হিমাগারে, বিচারের কাঠগড়ায়ও দাঁড় করানোর বিষয়টি থমকে গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতর সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন, মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় ঘিরে সহিংসতা ও হেফাজতে ইসলামের সন্ত্রাসের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় দায়ের করা অধিকাংশ মামলার তদন্তই শেষ হয়নি। তদন্তের নমুনায় অনুমিত হওয়া স্বাভাবিক যে, কিছু কিছু মামলায় পুলিশ ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করছে। অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, অনেক মামলার আসামির কাছ থেকে পুলিশের উৎকোচ গ্রহণের পথটি প্রশস্ত হয়েছে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে ঘুষের বিনিময়ে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের ‘ছাড়’ দেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ আছে। অনেক মামলায় আসামিরা প্রকাশ্যে থাকলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত সারাদেশে নিহত হয়েছেন ১৪৬ জন। সহিংসতায় প্রাণ হারান ১৮ পুলিশ সদস্য। আহত হয়েছেন কয়েক শ’। আহতদের অনেকেই এখনও চিকিৎসাধীন, আবার কেউ কেউ চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখনকার প্রতিমন্ত্রী, পুলিশের আইজিসহ সরকারের নীতিনির্ধারক মহল থেকে বলা হয়েছিল, এসব সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পারলে পুরস্কার দেয়া হবে। এমনকি সাত বিভাগে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এসব সন্ত্রাসীর বিচার করা হবে। এসব ঘোষণা এখন কাজীর গরু কেতাবে থাকার মতোই, বাস্তবে তার কোন প্রতিফলন নেই।

পুলিশ সদর দফতরের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকালীন ও নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় দায়ের করা বেশিরভাগ মামলায় বিএনপি-জামায়াতের সশস্ত্র ক্যাডার ও নেতাকর্মীরাই আসামি। তাদের সহায়তায় অনেক ক্ষেত্রে পেশাদার অপরাধীদেরও মাঠে নামানো হয়। নির্বাচন প্রতিহত করতে যানবাহনে নির্বিচারে অগ্নিসংযোগ করে সাধারণ মানুষকে হত্যার বিষয়টি দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচিত হয়। তবে নির্বাচনের এক বছর পার হলেও সহিংসতার অধিকাংশ মামলার অভিযোগ দাখিল করা হয়নি। এসব মামলা কৌশলগতভাবে হিমাগারে রেখেছে তদন্ত সংস্থা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণার পর রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে হঠাৎ নড়াচড়া শুরু হয় কোন কোন মামলার ফাইল। এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের গ্রেফতারে তৎপর হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের রেকর্ড করা মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বানচাল করতে তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশব্যাপী নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বিএনপি-জামায়াত। আগুন দেয়া ও ভাংচুর করা হয় কয়েক শ’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কয়েক জায়গায় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা করা হয়। এরপর সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে দেশব্যাপী অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীতে হেফাজতের তা-ব নিয়ে ঢাকার পল্টন, মতিঝিল ও রমনা থানায় ৪২টি মামলা করা হয়। প্রায় পৌনে দুই বছর পার হলেও অধিকাংশ মামলার চার্জশীট দাখিল করা যায়নি। থানা পুলিশের হয়ে এখন হেফাজতের অনেক মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭০৪টি মামলার মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে পাঁচটির। আর ১৩৭টি মামলার চার্জশীট দেয়া হয়েছে। অন্য মামলাগুলো তদন্তাধীন।

২০১৩ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় চট্টগ্রাম জেলায় মামলা হয়েছে ২৮১টি। এছাড়া কক্সবাজারে ৫৭, ফেনীতে ৩৫, কুমিল্লায় ১৩৪, লক্ষ্মীপুরে ৬১, রাঙ্গামাটিতে ১৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৪৫, চাঁদপুরে ৮৫, নোয়াখালীতে ৮৩, খাগড়াছড়িতে ৮ ও বান্দরবানে চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি গ্রেফতার হয় ছয় হাজার ৪৩০ জন।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সংঘর্ষ, যানবাহন ও ট্রেনে আগুন, রেললাইন উৎপাটনসহ নানা রকমের নাশকতা চালানো হয়। এমনকি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে পুলিশ সদস্যদের হত্যা ও আগ্নেয়াস্ত্র লুট করা হয়। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানাগুলোয় মামলা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৪২ মামলা ছাড়াও দেশের অনেক এলাকায় হেফাজতের অন্তত অর্ধশতাধিক কেন্দ্রীয় নেতাসহ লক্ষাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা রয়েছে। রাজধানীতে ৪২ মামলার মধ্যে অন্তত আটটি মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতায় রাজশাহীতে ৪৬টি মামলা হয়। এরমধ্যে ৪৩টি মামলার চার্জশীট দাখিল করা হয়েছে। মামলাগুলো আদালতে বিচারাধীন। অন্য তিনটি মামলা তদন্তাধীন। নির্বাচনের আগে ও পরে গাইবান্ধায় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগসহ সহিংসতায় ১৫৯টি মামলা হয়েছে। এতে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের তিন হাজার ৯১৬ নেতাকর্মীকে আসামি কর হয়। এরমধ্যে এক হাজার ৯৯ জনকে অভিযুক্ত করে ৯২টি মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় বলে জানা গেছে।

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের কর্মী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মবেশে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। সরকারী সম্পদ ধ্বংস, গাছ কাটা, অগ্নিসংযোগ করে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গায় জামায়াত-শিবির কুপিয়ে হত্যা করে চার পুলিশ সদস্যকে। ওই দিন সুন্দরগঞ্জ সদরে সহিংসতায় নিহত হন আরও চারজন। এসব ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা হয়। মার্চ মাসে বগুড়া জেলাজুড়ে তা-ব চালায় জামায়াত-শিবির। জেলা সদরের পাঁচটি পুলিশ ফাঁড়ি, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির বাড়ি, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক এক সংসদ সদস্যের বাড়ি এবং নন্দীগ্রাম উপজেলা পরিষদ কার্যালয় ও উপজেলা চেয়ারম্যানের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। ওই সব ঘটনায় আটটি থানায় ৫৪টি মামলা করা হয়।

পুলিশ সদর দফতরের নথি থেকে জানা যায়, নির্বাচনের পর দেশের ১৪টি স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় ১৮টি মামলা হয়েছে। পুড়িয়ে দেয়া হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২৫ জেলায় বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সহিংস ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ৬৩টি মামলা হয়েছে যশোরে। এছাড়া দিনাজপুরে ৪৬, লক্ষ্মীপুরে ৩১ ও ঠাকুরগাঁওয়ে ২০টি মামলা হয়েছে। বেশিরভাগ মামলায় আসামি ‘অজ্ঞাত’ বলে উল্লেখ রয়েছে। এসব মামলায় পুলিশের কিছু সদস্য বাণিজ্যে জড়ায় বলে অভিযোগ আছে। সহিংসতা, নির্বাচনসামগ্রী ভাংচুরসহ নানা অপরাধে জড়িত বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের আটকের পর টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগও উঠছে। যেসব জেলায় অধিক মাত্রায় আটক বাণিজ্য হয়েছে তার মধ্যে লালমনিরহাট, যশোর, নড়াইল, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, মাগুরা, মেহেরপুর, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, গাজীপুর, রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জে গ্রেফতার বাণিজ্য হয়েছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।