২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বুকের ভেতরে জগদ্দল পাথর... রাতজাগা পাখির ক্রন্দন

বুকের ভেতরে জগদ্দল পাথর... রাতজাগা পাখির ক্রন্দন
  • শোকাবহ আগস্ট

মোরসালিন মিজান ॥ বুকের ভেতরে জগদ্দল পাথর নিয়ে/রাতজাগা পাখির ক্রন্দন শুনে শুনে/আমিও মুজিব মুজিব বলে চিৎকার করে উঠি...। এই চিৎকার, সব হারানোর এই কান্না হারায়নি। বিয়োগব্যথায় এখনও নীল বাঙালী। বিশেষ করে আগস্টে বার বার পিতা এসে সামনে দাঁড়ান। শোকের মাসের প্রথম দিন থেকেই রাজধানীজুড়ে অবিসংবাদিত নেতার প্রতিকৃতি। বঙ্গবন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে যেন বাংলাদেশটা দেখা যায়! এই বাংলা দুঃখিনী অনেক। ১৫ আগস্টের সেই কালরাত ভুলতে পারছে না দেশমাত্রিকা। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে কত কত আয়োজন! সবই পিতার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার উপলক্ষ মাত্র।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠ কীর্তি- বাংলাদেশ। শোষিত বঞ্চিত বাঙালীকে একটি সার্বভৌম ভূখ- উপহার দিয়ে ইতিহাসের মহানায়ক হয়েছিলেন তিনি। অথচ স্বপ্ন দিয়ে গড়া দেশে নির্মম নিষ্ঠুরভাবে খুন হন স্বপ্ন দেখার সর্বোত্তম পুরুষ। স্বাধীনতা এনে দেয়ার মাত্র আড়াই বছরের মাথায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তাঁকে। সপরিবারে হত্যা করা হয়। কালো দিবসটি- ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫। দেশী বিদেশী শত্রুরা ভেবেছিল, শিকড়সুদ্ধ উচ্ছেদ করা গেছে মুজিবকে। আদতে মুজিব মৃত্যুঞ্জয়। মুজিব বাংলাদেশের অপর নাম। এই নাম কী করে মুছে যাবে? আজকের বাংলাদেশ তাই মুজিবের মানচিত্র। তবে হ্যাঁ, এতকিছুর পরও, বঙ্গবন্ধুকে হারানোর গভীর ক্ষত শুকোয়নি। কপালে কলঙ্ক তিলক মেখে আছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে আগস্ট এলে পিতা হত্যার পাপ গিলে খেতে চায় বাঙালীকে। মুজিবের মতো নেতাকে রক্ষা করতে না পারার গ্লানি বয়ে বেড়াতে হয়। সব মিলিয়ে অন্যরকম এক আবহ তৈরি করে আগস্ট।

প্রতিবারের মতো এবারও শোকের মাসে আমূল বদলে গেছে রাজধানী শহর ঢাকা। যেদিকে চোখ যায়, শেখ মুজিবের প্রতিকৃতি। বিলবোর্ড, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড সবখানে তিনি। বড় রাস্তার ধারে ধানম-ি ৩২ নম্বরে গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশ দৃশ্যমান হচ্ছে। দেখামাত্রই মন বিষণœ হয়ে যায়। হু হু করে ওঠে বুক। লাল রক্তের ধারা যেন বইছে এখনও! এখনও অভিশাপ দিচ্ছে। লালের পাশাপাশি শোকের কালো রঙে ছেয়ে গেছে সব অলি গলি। কালো পতাকায় মোড়ানো যেন চারপাশ। মাঝে মাঝে মনে হয়, সবুজ বৃক্ষরাও শোকের কালো রং মেখে নিয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে রেসকোর্স। কোন কোন ছবিতে উত্তাল রাজনীতির শেষ গন্তব্য শেখ মুজিব। তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। ধারাবাহিক সংগ্রাম। আগস্টে বাঙালীর শৌর্য বীর্যের প্রতীক হয়ে ফিরে এসেছেন মুজিব। নতুন প্রাণ পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু। গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের গানের কথায়- ‘একটি মুজিবরের থেকে/লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি/আকাশে বাতাসে ওঠে রণী...।’

শোকের মাসে কবির কবিতায়ও প্রকাশিত হচ্ছেন রাজনীতির কবি। বিভিন্ন ছবির সঙ্গে জুড়ে দেয়া হচ্ছে প্রিয় কবিতার পঙ্ক্তি। ধানমণ্ডির একটি বিলবোর্ডে লেখা আছে- তার ছায়া দীর্ঘ হ’তে-হ’তে/ মানচিত্র ঢেকে দ্যায় সস্নেহে, আদরে...। আবৃত্তি শিল্পীরাও গভীর মমতায় পাঠ করছেন বঙ্গবন্ধুকে। টিএসসির রিহার্সেল রুম থেকে ভেসে আসছে- তোমার ছবি টাঙাতে পারি না ঘরে,/ তাই তো আমার দেয়াল শূন্য রাখি,/ আমার বুকের গভীর ভালোবাসায়/ উন্নতশির তোমার ছবি আঁকি...। অথবা বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশ উল্লেখ করে টেলিভিশন অনুষ্ঠানে বলা হচ্ছে- চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি শরীর/ একজন বললো দেখো ভিতরে কী স্থির/ মৃত নয় দেহ নয় দেশ শু’য়ে আছে/ সমস্ত নদীর উৎস হৃদয়ের কাছে...। এখন বার বার আঁকা পিতার মুখ নতুন করে আঁকছেন শিল্পীরা। শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালা প্লাজা ভরে উঠেছে তেল রঙে জল রঙে আঁকা শেখ মুজিবে। নবীন প্রবীণ শিল্পীরা স্ব স্ব কল্পনার জগত থেকে তুলে এনেছেন বঙ্গবন্ধুকে। প্রতিদিনই আলোচনা সভা। আলোচনায় তিনি। মিছিলও। এসব আয়োজনের কোনটিতেই কৃত্তিমতা নেই- এমন দিব্যি দেয়া যাবে না। তবে বঙ্গবন্ধুকে অনুভব করার বুকে বাঁচিয়ে রাখার যে বাঙালী, তার কাছে তাদের কাছে বাকি সব নস্যি। আগস্টের শোকে যেমন কাঁদছে তাঁরা, তেমনি জ্বলে উঠছে শক্তিতে। এই শোক এই শক্তি গড়বে আগামী বাংলাদেশ- সকলের তাই প্রত্যাশা।