১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মামলাজট নিরসনে আইন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ

  • বর্তমানে অন্তত চার হাজার বিচারক প্রয়োজন ;###;প্রতিবছরে বিপুল সংখ্যায় মামলা বাড়ছে, বিচার বিভাগে নতুন পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে না

বিকাশ দত্ত ॥ উচ্চ আদালতসহ সারাদেশে প্রায় ৩০ লাখ মামলা জট নিরসন ও নতুন বিচারক নিয়োগ, তাদের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ প্রদান, চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মোবাইল কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল বিধান রাখাসহ আইন কমিশন ব্যাপক কর্মপ্রক্রিয়ার সুপারিশ করেছেন। এছাড়া ১৬ কোটি মানুষের বিপরীতে অন্তত ৪ হাজার বিচারক প্রয়োজন। এত সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দেয়া সম্ভব না হলে প্রতি বছর অন্তত ২০০ জন নতুন বিচারক নিয়োগ করা যেতে পারে। আইন কমিশনের এই সুপারিশগুলো আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালের স্থায়ী কমিটির ১১৭তম বৈঠকে মঙ্গলবার দেয়া হয়েছে।

আইন কমিশনের ঐ সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রতি বছর মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বাড়ছে। কিন্তু বিচার বিভাগে নতুন কোন পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে না। নিয়োগ পর্যায় হতে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে পরিপূর্ণ একজন বিচারক হিসেবে আদালতে কাজ শুরু করতে একজন ভাবী বিচারকের কমপক্ষে তিন বছর সময় প্রয়োজন হয়। ইতোমধ্যে নতুন মামলা দায়ের থেমে থাকবে না, বরং ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকবে।

সূত্র মতে, বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৩২ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে ৮৬ হাজার বিচারক রয়েছে। সেখানে প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে ১ জন বিচারক কর্মরত আছেন। ভারতে ১২৫ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে বিচারক ছিল ১৫,৬০৮ জন; অর্থাৎ প্রতি ৮০,০০০ জনসংখ্যার বিপরীতে বিচারক ১ জন ছিল। তবে ভারত ২০০৮ সালে প্রতি ২০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে ১ জন বিচারক নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত সেখানে ৬৭,০০০ জনসংখ্যার বিপরীতে ১ জন বিচারক নিয়োজিত হয়েছেন। বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে অনুমোদিত বিচারকের পদ রয়েছে ১৬৫৫টি। তন্মধ্যে সুপ্রীমকোর্টের প্রতিবেদন অনুসারে ৪৫৭টি পদ শূন্য রয়েছে অর্থাৎ ১১৯৮ জন বিচারক প্রকৃতপক্ষে কর্মরত রয়েছেন। সে হিসেবে ১ লাখ ৫২ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে মাত্র ১ জন বিচারক নিয়োজিত আছেন। অন্যদিকে আইন মন্ত্রণালয় হতে গৃহীত পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে সর্বমোট ১২৭৮ জন বিচারক কর্মরত রয়েছেন। সে হিসেবে পরিসংখ্যান দাঁড়ায় প্রতি ১ লাখ ৪৩ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে বিচারকের সংখ্যা ১ জন। যে কোন বিবেচনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। এই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের স্তূপীকৃত (নধপশষড়ম) প্রায় ৩০ লাখ মামলা রয়েছে এবং এ সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। অপ্রতুল সংখ্যক বিচারকগণকেই এই বিশাল সংখ্যক মামলার দায়-দায়িত্ব নিতে হচেছ, অথচ অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদের দেশে বিচারকের সংখ্যা অনুপাতে মামলা নিষ্পত্তির হার বিশ্বের যে কোন দেশের তুলনায় সন্তোষজনক।

আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক আপ্রাণ চেষ্টা করে এই মূল্যবান প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন। তাঁকে সহায়তা করেন দুই সদস্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর ও ড. অধ্যাপক এম শাহ আলম। আইন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ৩০ লাখ মামলার ভারে বিচার বিভাগ আজ ন্যুব্জ এবং ক্রমাগতভাবে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাত্র ১৬শ’ বিচারকের পক্ষে এই সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করা কখনই সম্ভব নয়। সর্বশেষ, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন ও রিভিশনাল জরিপ সংক্রান্ত ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল করার ফলে অতি অল্প সময়ে লাখ লাখ মোকদ্দমার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি দ্রুত নিষ্পত্তিযোগ্য আরবিট্রেশন মোকদ্দমার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতেও বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় অধিক সংখ্যক বিচারক নিয়োগ এই সমস্যার সমাধানের প্রধান উপায়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি দশ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে একজন বিচারক রয়েছে। ভারতে প্রতি ২০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে একজন বিচারক এর পদ সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশের বিচারকের পদ সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ১০ হাজার না হোক, ভারতের মতো ২০ হাজার না হোক, আমাদের সীমিত ক্ষমতার কথা চিন্তা করে প্রতি ৪০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে অন্তত একজন বিচারক এর পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। সে হিসাবে বর্তমানে ১৬ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে অন্তত ৪ হাজার বিচারক প্রয়োজন। এই হিসাবে বিদ্যমান পদ ব্যতিরেকে আরও অন্তত ২৪০০ নতুন পদ সৃষ্টি করা জরুরী। যদিও বাস্তবতার নিরিখে এত সংখ্যক বিচারক স্বল্প সময়ের মধ্যে নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয়, কিন্তু বিদ্যমান ঠধপধহঃ পদ ব্যতিরেকে নিয়মিতভাবে প্রতি বছর অন্তত ২০০ জন করে নতুন বিচারক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এরূপ সিদ্ধান্ত জনস্বার্থে জরুরী। এমনকি এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেও অতিরিক্ত নতুন ২,৪০০ বিচারক নিয়োগে ১২ বৎসর সময় লাগবে। এইভাবে ক্রমান্বয়ে নতুন বিচারকরা দায়িত্বভার গ্রহণ করতে পারবেন। এতে মামলা জটবৃদ্ধির হার কিছুটা হলেও হ্রাস পাবে।

অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে বিচার বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের মধ্য হতে দক্ষ, সৎ, যোগ্য কর্মকর্তাগণকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা যেতে পারে। এজন্য প্রয়োজনীয় বাজেট ও সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে। নতুবা মামলা-মোকদ্দমার জটবৃদ্ধির প্রবণতা কোনভাবেই নিম্নগামী করা যাবে না। ২০০৯ সাল হতে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহে মামলা বিচার স্তরে উন্নীত হওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য কোর্ট সাব-ইন্সপেক্টরের পরিবর্তে এপিপি নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু এ উদ্যোগ বাস্তব ক্ষেত্রে খুব একটি ফলপ্রসূ হয়নি। অধিকাংশ আদালতেই এপিপিগণ নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না, কিংবা উপস্থিত থাকলেও সাক্ষী উপস্থাপনে উৎসাহ বোধ করেন না। অনেক সময় সাক্ষী ফেরত দেয়ার ঘটনাও ঘটে থাকে। ফলে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহে মামলা নিষ্পত্তি বিঘিœত হয়।

সাম্প্রতিককালে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা অতিরিক্ত ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর অধীনে প্রদত্ত দ-ের আপীল শুনানির জন্য এপিপি নিয়োগের প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি কারণে প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা নিরূপণের আবশ্যকতা রয়েছে। মোবাইল কোর্টে যে সমস্ত অপরাধের বিচার হয়ে থাকে তা মূলত অপেক্ষাকৃত লঘু প্রকৃতির অপরাধ এবং এই আইনের অধীনে কেবল দোষ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে দ- আরোপিত হয়ে থাকে। অথচ মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ১৩ ধারাতে এসব অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের জন্য ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও তৎপর দায়রা আদালত-এই দুটি আলাদা আলাদা আপীল ফোরাম বিদ্যমান রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের মূল আইনে কেবলমাত্র দায়রা আদালতে আপীলের বিধান ছিল।

বর্তমানে এ আইনের অধীনে একজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক প্রদত্ত সাজার বিপরীতে প্রথমে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে এবং উক্ত আপীল রায়ে সংক্ষুব্ধ হলে অতঃপর দায়রা আদালতে আপীল দায়ের করতে হয়। আবার স্বয়ং ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলে এই একই আইনের আওতায় দন্ডিত ব্যক্তির জন্য আপীল ফোরাম দুটির বদলে একটি হয়ে যায়, যা সার্বিকভাবে আইনটিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে। তার চেয়ে বরং সংশ্লিষ্ট চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মোবাইল কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপীলের বিধান রাখা হলে রাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিচার প্রার্থীদের হয়রানি লাঘব হতো এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হতো।

মোবাইল কোর্ট আইনের অধীনে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি আপীল ফোরাম না রেখে বরং চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট মোবাইল কোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত দ-াদেশের আপীলের বিধান রাখলে তা যৌক্তিক হয়। উক্ত আপীল এর রায়ের বিরুদ্ধে শুধু আইনের প্রশ্নে দায়রা আদালতে রিভিশনের বিধান রাখা যেতে পারে।

আইন কমিশন সূত্র জানা গেছে, সদ্য অনুষ্ঠিত ডিসি কনফারেন্সে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটগণ যে সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন তা হচ্ছে- বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কে পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করা হলেও প্রায়শই পুলিশ কর্তৃপক্ষ সে ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না। ব্রিটিশ আমল থেকে এমনকি পাকিস্তান আমলেও নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকগণকে বিচার কার্যে নিয়োগ করার পূর্বে যথোপযুক্ত তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতো। তাদের সার্ভে এ্যান্ড সেটেলমেন্ট ট্রেনিং, ফাউন্ডেশন ট্রেনিং, ল্যান্ড এডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং, জুডিসিয়াল এডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং কোর্স এবং ডেপুটি কমিশনার অফিসসহ সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক দফতরে প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন আদালতে কর্মরত বিচারকের সঙ্গে আদালতে বসে বেশ কিছুদিন প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হতো। এইভাবে প্রায়োগিক ও তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ প্রায় ২ বছরকালীন প্রদান করা হতো। কিন্তু কিছু কাল পূর্বেও অনেক বিচারককে মাত্র ২ সপ্তাহকাল প্রশিক্ষণ প্রদান করার বিচার কার্যে সরাসরি পদায়ন করা হয়েছিল। বিচারকদের সে সময় ফৌজদারি মামলায় ৭ দিন এবং দেওয়ানি মোকদ্দমায় ৭ দিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেই বিচারের গুরু-দায়িত্ব পালন শুরু করতে হয়। বিচারকের প্রকৃত প্রশিক্ষণ কখনই প্রদান করা হয় না এবং ফলশ্রুতিতে ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায় যা আপীল ও রিভিশনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবার অন্যতম প্রধান কারণ।

সুপ্রীমকোর্ট প্রশাসন এবং আইন মন্ত্রণালয় উভয়ই বিচারগণের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা স্থিত করার লক্ষ্যে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে কোন কিছুই ফলপ্রসূ হবে না। এ সত্য আমরা যত দ্রুত উপলব্ধি করব তত দ্রুত বিচার বিভাগ তথা জাতির মঙ্গল হবে। সম্প্রতি বিচার বিভাগের সর্বস্তরেই অতি দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির ওপর অতিরিক্ত তাগিদ দেয়া হচ্ছে যা অনেক সময়েই বিচারের গুণগত মানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবান্বিত করতে পারে। আশঙ্কা হয় যে মামলা অতি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে গিয়ে যদি সুবিচারের পরিবর্তে তা বিচারহীনতায় না পর্যবসিত হয়, সে ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ এর প্রয়োজনীয়তা নিয়েই ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে। সে দিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন বলে মনে করে আইন কমিশন।