২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সোনা চোরাচালান মামলায় উপজেলা চেয়ারম্যান গ্রেফতার

সোনা চোরাচালান মামলায় উপজেলা চেয়ারম্যান গ্রেফতার

স্টাফ রিপোর্টার ॥ অবশেষে রাজধানীর পল্টন থেকে উদ্ধারকৃত সোনার চালানের মামলার আসামি ও সিরাজগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা রিয়াজউদ্দীন আহমেদ ধরা পড়েছেন। বুধবার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি শক্তিশালী টিম তাকে রাজধানীর উত্তরার তিন নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে আটক করে। আটকের পরই কঠোর নিরাপত্তায় নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টু রোডের গোয়েন্দা দফতরে। বিগত সাত মাস ধরেই তাকে আটকের জন্য তৎপর ছিল গোয়েন্দা টিম। গতকাল রিয়াজকে যখন আটক করা হয়, তখনও তিনি চেষ্টা করেন ডিবির হেফাজত থেকে নিজেকের মুক্ত করার জন্য। এজন্য প্রভাবশালী কয়েক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেও ব্যর্থ হন। তাকে আজ আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়া হবে বলে জানা যায়।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের জনসংযোগ শাখার উপ-পুলিশ কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম জানান, রিয়াজউদ্দীন আহমেদকে বুধবার তার উত্তরার বাসা থেকে আটক করা হয়েছে। মহানগর গোয়েন্দা (উত্তর) অঞ্চলের একটি শক্তিশালী টিম তাকে আটক করে নিয়ে আসে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি পল্টন থেকে উদ্বারকৃত সোনা ও মুদ্রা উদ্ধার মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই পলাতক ছিলেন।

গত ২৫ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুরানা পল্টনের ২৯/১ নম্বর ভবনের ৬ তলা থেকে ৬১ কেজি সোনা ও ৮ কোটি টাকার কয়েকটি বস্তা উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় ফ্ল্যাটের মালিক ও আলী সুইটসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলীকে গ্রেফতার করে শুল্ক গোয়েন্দা ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। বাসার খাটের নিচ থেকে এগুলো উদ্ধার করা হয়।

গ্রেফতারের পর মোহাম্মদ আলী দাবি করেন, এ অর্থ ও স্বর্ণের প্রকৃত মালিক তিনি নন। তার কাছে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। এর প্রকৃত মালিক সিরাজগঞ্জ সদরের উপজেলা চেয়ারম্যান রিয়াজউদ্দীন আহমেদ। গোয়েন্দা শুল্ক বিভাগের পক্ষ থেকে সিরাজগঞ্জের উপজেলা চেয়ারম্যানকে ফোন করা হলে এ অর্থ ও স্বর্ণ তার নয় বলে জানান। রিয়াজউদ্দীন মোহাম্মদ আলী নামে কাউকে চেনেন না বলেও জানান। এরপর এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করে। মামলায় মোহাম্মদ আলী ও রিয়াজউদ্দীনকে আসামি করা হয়। মোহাম্মদ আলীকে ডিবিতে রিমান্ডে নেয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। মূলত তার জবানবন্দীতেই ডিবি রিয়াজকে আটকের জন্য ঢাকায় ও সিরাজগঞ্জে অভিযান চালায়। কিন্তু তিনি বার বার আত্মগোপনে থেকে উল্টো গ্রেফতার এড়াতে তদবির চালায়। এ সময় বেশ কজন প্রভাবশালী ঢাকায় বসে মিডিয়ার উপরও তদবিরে তৎপর হয়। তবে ডিবির এডিসি মাহফুজুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, কিছুতেই তাকে ছাড় দেয়া হবে না। যত প্রভাবশালীই হোক তাকে আটক করা হবে।

এদিকে এ ঘটনার পর থেকে সিরাজগঞ্জে নিজ উপজেলায় বসে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে নিজের সাফাই গান রিয়াজউদ্দীন।

ডিবি জানায়, তাকে আটকের পর থেকেই ঢাকায় ও সিরাজগঞ্জে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়। কিন্তু বার বার তিনি ফসকে যান। এ অবস্থায় বুধবার তার উত্তরার বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। জানা যায়, রিয়াজউদ্দীন বর্তমানে সিরাজগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান। তার এক ছেলে প্রকৌশলী ও তিন মেয়ে চিকিৎসক। এলাকাবাসী জানায়, ৯০ দশকে রিয়াজউদ্দীন জনতা ব্যাংকে চাকরি করতেন। এ সময় তার পোস্টিং ছিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এ সময় তিনি সোনা ও ডলার চোরাচালান ব্যবসায় তৎপর হন। তারপর তিনি হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিয়ে এলাকায় জনসেবায় মেতে উঠেন। এলাকায় দুই হাত ভরে মানুষকে দান করতে থাকায় তিনি বেশ আলোচিত হন। এতে তার ব্যাপক পরিচিতি ও নামডাক রটে যায়। এমন অবস্থায় তিনি ২০০৯ সালে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দাবি করেন। দল তাকে মনোনয়ন না দিয়ে জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক পদেও দায়িত্ব দেয়। কিন্তু তার শখ উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়া। সেটা পূর্ণ হয় ২০১৩ সালের নির্বাচনে। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাস করার পর আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেন।

ডিবি জানায়, রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও রিয়াজ চোরচালানে বিরতি দিতে পাারেননি। তিনি রাজধানীর অপর গডফাদার মোহাম্মাদ আলীর সঙ্গে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এর চোরচালানের শীর্ষ এই দুই গডফাদারের নেতৃত্বেই গত দুই বছর ধরে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে মণের পর মণ সোনা পাচার করা হয়। শেষ পর্যন্ত শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালক ডক্টর মইনুল খানের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশ হানা দেয় পল্টনের ওই বাড়িতে। সেদিনের অভিযানে বাংলাদেশী টাকা ছাড়াও সৌদি রিয়ালসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা পাওয়া যায়। অভিযানকালে ফ্ল্যাটের মালিক প্রথমে ‘তার কাছে অবৈধ টাকা নেই’ দাবি করলেও বক্স সিলিং থেকে বেশিরভাগ মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। মোহাম্মদ আলীর ধানম-িতে আলী সুইটস নামের একটি মিষ্টির দোকান রয়েছে। কাস্টমসের সন্দেহ এগুলো বিমানবন্দরে পাচারকৃত স্বর্ণ ও টাকা।

ওই সময় জনকণ্ঠের কাছে বেশ জোর গলায় বলে উঠেন, ‘উদ্ধার করা সব টাকাই আমার, সোনা আমার না, এটা সিরাজগঞ্জের চেয়ারম্যান রিয়াজউদ্দীনের। তাকে জিজ্ঞেস করুন। সে আমার কাছে রাখতে দিয়েছে, তাই রেখেছি।’

তখন রিয়াজউদ্দীনকে জিজ্ঞাসা করা হলে জবাব দিয়েছেন আরও তীর্যক কণ্ঠে, ‘সবই ষড়যন্ত্র; সবই ষড়যন্ত্র। আমাকে শেষ করে দেয়ার জন্যই এমন করা হচ্ছে। আমি মোহাম্মদ আলী নামের কাউকে চিনিই না।’