২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন ৭০ হাজার কোটি টাকা

  • প্রতিদিন লেনদেন ৪৩২ কোটি টাকা ;###;জুনে রেমিটেন্স এসেছে ৪ কোটি টাকা

রহিম শেখ ॥ মোবাইল ব্যাংকিংয়ে প্রতিদিনই গ্রাহক বাড়ছে। বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণ। প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে বা অতিদ্রুত শহর থেকে গ্রামে, গ্রাম থেকে শহরে সর্বত্রই টাকা পাঠানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় মোবাইল ব্যাংকিং দেশের ব্যাংকিংসেবায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে মোবাইলে লেনদেন হয়েছে ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত জুন মাসে চার কোটি টাকার রেমিটেন্স এসেছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এর আগের মাসে এসেছিল দুই কোটি ৭৫ লাখ টাকার রেমিটেন্স। গড়ে প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে ৪৩২ কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহক সংখ্যা দুই কোটি ৮৬ লাখ ছাড়িয়েছে।

জানা গেছে, কেবল এক স্থান থেকে টাকা আরেক স্থানে পাঠানোই নয়, দেশের অর্থনীতিতেও গতি সঞ্চার করেছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এই সেবা। যোগ হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান। এছাড়া এই সেবার আওতা ও সুবিধা বেড়েছে। এছাড়া বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং টাকা আদান-প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং অনেক নতুন নতুন সেবা যুক্ত হয়েছে। প্রাত্যহিক লেনদেন ছাড়াও বিদ্যুত, গ্যাস, পানির বিল অর্থাৎ ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, বেতন-ভাতা প্রদান, বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো অর্থাৎ রেমিটেন্স বিতরণ, এটিএম ইত্যাদি সেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে, যা গত বছর কয়েক আগেও ছিল অকল্পনীয়। অথচ সময় যত গড়াচ্ছে, গতানুগতিক ধারার ব্যাংকিং থেকে বেরিয়ে এখন মোবাইল ব্যাংকিং দেশব্যাপী যে কোন সময়, যে কোন স্থানে আর্থিক সেবার নিশ্চয়তা মিলছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতেও সাহায্য করছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য এ ব্যাংকিংসেবা চালু করা হলেও জনপ্রিয় হওয়ায় এখন অনেকেই এটি ব্যবহার করছেন। এ কারণে নতুন গ্রাহক যুক্ত হচ্ছেন ও লেনদেন বাড়ছে। তবে মোবাইল ব্যাংকিং যাতে খারাপ কাজের অর্থায়নের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত না হয় সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক নজর রাখছে।

সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকে প্রতিদিনই বাড়ছে গ্রাহক। ২০১৩ সালের নবেম্বর মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা এক কোটির মাইলফলক অতিক্রম করে। গত বছরের মার্চে তা দেড় কোটি ছাড়িয়ে যায়। আর গত সেপ্টেম্বরে দুই কোটি ছাড়ানোর পর ডিসেম্বর মাস শেষে হয় দুই কোটি ৫১ লাখ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, জুন মাস শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিবন্ধিত মোট গ্রাহক হচ্ছে দুই কোটি ৮৬ লাখ ৪৬ হাজার। উল্লেখ্য, কোন হিসাব থেকে টানা তিন মাস লেনদেন না হলে তা নিষ্ক্রিয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই বিবেচনায় জুন শেষে মোট হিসাবের এক কোটি ২২ লাখ ৩৪ হিসাব নিষ্ক্রিয় রয়েছে। আর জুন মাস শেষে সারাদেশে মোট এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ১৭০। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, গত ছয় মাসে মোবাইলে লেনদেন হয়েছে ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি। সর্বশেষ জুন মাসে মোট ৯ কোটি ৬১ লাখ ৫৯ হাজার ৩০৩টি লেনদেন হয়েছে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ১২ হাজার ৯৬৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর আগের মাসে লেনদেন হয়েছিল ৯ কোটি ৫৪ লাখ ১২ হাজার ১৪৬টি, টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ ১২ হাজার ৬০১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এপ্রিলে ১১ হাজার ৮৪০ কোটি, মার্চে ১২ হাজার ২২৬৪ কোটি, ফেব্রুয়ারি মাসে ১০ হাজার ৯৫৮ কোটি ও জানুয়ারি মাসে মোবাইলে লেনদেন হয়েছে ১১ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, এসব মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে রেমিটেন্সও আসছে। জুন মাসে চার কোটি টাকার রেমিটেন্স এসেছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। এর আগের মাসে এসেছিল দুই কোটি ৭৫ লাখ টাকার রেমিটেন্স।

গ্রাহক নিজের হিসাবে জমা করেছেন পাঁচ হাজার ৪৬১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। আর উত্তোলন করেছেন চার হাজার ৭৭৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া অন্যের হিসাবে পাঠিয়েছেন দুই হাজার ২৮৭ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে বেতন পরিশোধ হয়েছে ১০১ কোটি ৪০১ লাখ টাকা। আর সেবা-বিল পরিশোধ হয়েছে ১২০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অন্যান্য খাতে পরিশোধ হয়েছে ২১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এ প্রসঙ্গে বিকাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদীর বলেন, সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের কারণে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক সংখ্যা ও লেনদেন বেড়েছে।

তিনি বলেন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস চালু হওয়ার ফলে ই-কমার্সসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা বেড়েছে। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যেমন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাদের ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পন্ন করছে, তেমনি অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান তাদের সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ থেকে শুরু করে কর্মীদের বেতনও দিচ্ছে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে। এদিকে, মোবাইল ব্যাংকিং দিয়ে মোবাইল ফোনের এয়ারটাইম ক্রয়ের পাশাপাশি দোকানে কেনাকাটাসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করা যাচ্ছে। এ ছাড়াও ওয়ালেটে (এ্যাকাউন্টে) জমা টাকার ওপর দেয়া হচ্ছে ইন্টারেস্ট। ফলে গ্রাহকদের মধ্যে ওয়ালেট ব্যবহারের উৎসাহ বেড়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংক এ পর্যন্ত ২৮ ব্যাংককে অনুমোদন দিলেও এ সেবা দিচ্ছে ২০ ব্যাংক। এরমধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান বিকাশের গ্রাহক সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এবং এরপরই আছে ডাচ্ বাংলা ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং। সম্প্রতি এ সেবার নীতিমালা অনুযায়ী গ্রাহকের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ পরিচিতি ছাড়া এ্যাকাউন্ট খোলার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নাশকতা, ঘুষ লেনদেনসহ নানা অপরাধমূলক কাজে অর্থ লেনদেনে যাতে এ মাধ্যম ব্যবহৃত না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হচ্ছে।