২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রতিবাদী রূপায়ণ রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ গৌতম পাণ্ডে

‘রক্তকরবী’ নাটকের পটভূমি ধরা হয় ইউরোপজুড়ে মহাযুদ্ধের পরবর্তী অবস্থাকে কেন্দ্র করে। এ যেন যুদ্ধপরবর্তী পৃথিবীর এক মানচিত্র। নাটকটি প্রথম রচিত হয় ১৯২৬ সালের ডিসেম্বরে। ‘রক্তকরবী’র প্রথম নামকরণ হয় ‘যক্ষপুরী’ নামে। শিলংয়ের শৈলবাসে বসে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন। নাট্যসমালোচক শিশির কুমার দাশের ভাষায়, মানুষের প্রবল লোভ কিভাবে জীবনের সমস্ত সৌন্দর্য ও স্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করে মানুষকে নিছক যন্ত্রে ও উৎপাদনের উপকরণে পরিণত করেছে এবং তার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ কী রূপধারণ করেছে তারই রূপায়ণ ‘রক্তকরবী’ নাটকে।

প্রাঙ্গণেমোর নাট্যসংগঠনের প্রযোজনায় নাটকটির ৪২তম মঞ্চায়ন হয় সম্প্রতি শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে এক সন্ধ্যায়। নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন নূনা আফরোজ। গত ১ আগস্ট কলকাতায় নাটকটির ৪৩তম মঞ্চায়ন করে নাট্যসংগঠন প্রাঙ্গণেমোর।

গীতিধর্মী এ নাটকে একটিমাত্র বিষয় নাটকের কেন্দ্রীয় পাঠ। একটি কারাগার। রাজার নাগপাশে বন্দী একদল লোক। এরা প্রত্যেকেই প্রচলিত সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা-গোত্র আর স্তরে স্তরায়িত। প্রকৃতির নিয়ম কিংবা সমাজের অপরিহার্য বাস্তবতায় এ নাগরিকবৃন্দ যেন প্রত্যেকেই লোভ-লালসা-প্রথা-সংস্কার আর ভয়ের জালে আটকা পড়া একেকটি জীব। যক্ষপুরীতে শ্রমিক দল মাটির তলা থেকে সোনা তোলার কাজে নিযুক্ত। চালানো হচ্ছে তাদের ওপর নির্বিচারে নির্যাতন। জটিল আবরণের আড়ালে থেকে রাজার নির্দেশ পালনে ব্যস্ত সেনাপতিসহ অন্যরা। এই অন্ধ ভূমিগর্ভ জীবনের মধ্যেই হঠাৎ ফুঁড়ে উঠে প্রেম। এই প্রেম আসে নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন্দিনীর রূপ ধরে। নন্দিনী সকলকে হাতছানি দিয়ে আলোর পথে ডাকছেÑ ‘তোমরা চলে এসো, চলে এসো।’ নন্দিনী ও সুড়ঙ্গ খোদাই বালক-কিশোরের কথোপকথন দিয়ে শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী নাটক ‘রক্তকরবী’।

নন্দিনীর ডাকে সকলের চিত্ত হয়ে উঠে অস্থির, চঞ্চল, গতিশীল আর প্রেমময়। বাদ যায় না খোদ রাজাও। কিন্তু নন্দিনী ধরা দেয় না। রাজা খুবই লোভী। লোভের পাহাড়ে বসেই সে গড়ে চলছে তার সম্পদ। আর সেই লোভের আগুনে পুড়ে মরছে তার নিযুক্ত সোনার খনির শ্রমিকরা। এখানে জীবনের কোন মায়া নেই। মনুষ্যত্ব-প্রেম-ভালবাসার সূর্য এখানে চিরতরে অস্তমিত। খনির শ্রমিকরা এখানে মানুষ নয়Ñ একেকটি সংখ্যা মাত্র। অথচ তারাই রাজার স্বর্ণলাভের একমাত্র মাধ্যম। নন্দিনী প্রেমের প্রতীক। কিন্তু নন্দিনীর এই প্রেমের পরশ রাজা পায়নি তার লোভের জন্য, সন্ন্যাসী পায়নি তার সংস্কারগ্রস্ততার জন্য আর মজুররা পেল না তারা নিজেরাই নিজেদের শেকলে বন্দী বলে। কিন্তু সেই যক্ষপুরীর শেকল ছেড়ে মুক্ত হওয়ার বারতা দিয়ে চলেছে নন্দিনী। নন্দিনীর এই আহ্বানে চঞ্চল হলো সবারই চিত্ত। জেগে উঠল সকলের মধ্যে মুক্তির স্বাদ। অত্যাচারী রাজাও পেতে চাইল নিষ্কৃতি। কিন্তু লোভী রাজা যে কায়দায় করে স্বর্ণ মজুদ, সে কায়দায় পেতে চাইল সে নন্দিনীকে। কিন্তু প্রেম আর শাশ্বত সুন্দরকে কী এভাবে পাওয়া যায়? পেল না। অতঃপর নন্দিনীকে পেতে চাইল মোড়ল। মোড়লের চাওয়াও অপূর্ণ থেকে গেল বিরোধের মধ্য দিয়ে। একে একে কিশোর, প-িত, কেনারাম সকলেই নন্দিনীর ডাকে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। তারা প্রত্যেকেই চায় নন্দিনীকে। কিন্তু নন্দিনীর সেই ভালবাসার মানুষটির নাম রঞ্জন। রঞ্জনের মধ্যেই নন্দিনী জাগিয়েছে প্রেম। অথচ রঞ্জনও তার নিজের শেকলে বন্দী। সেই শৃঙ্খলই রঞ্জনের জীবন থেকে নন্দিনীর প্রেমকে করে দিল বিচ্ছিন্ন। নন্দিনীর প্রেম বন্দী হলো কারাগারে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইঙ্গিত দিয়েছেন, এটাই হয়ত যান্ত্রিকতার পরম ধর্ম। নাটকটিতে অভিনয় করেছেন নূনা আফরোজ, অনন্ত হিরা, রামিজ রাজু, আউয়াল রেজা, শিশির রহমান, পলাশ, জসিম, সরোয়ার সৈকত, সাগর, রিগ্যান, সুমী, শুভেচ্ছা, মনির, শুভ, সুজয়, চৈতী, সোহাগ।