১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উত্তম কুমার ॥ এক নক্ষত্রের নাম

পারিবারিক থিয়েটারের আবহে বড় হওয়া যে কারও জন্যই সৌভাগ্যের। সেই সঙ্গে যদি কারও ছোটবেলা থেকেই থাকে শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখার জন্য বিবিধ প্রচেষ্টা; বিশেষ করে রেসলিং, সুইমিং, টেনিস, লাঠিখেলা ইত্যাদির চর্চা তাহলে আর নায়ক হওয়া ঠেকায় কে। সঙ্গে বোনাস হিসেবে গান গাওয়ার অভ্যাস অর্থাৎ কণ্ঠ মাধুর্যের অধিকারী। অরুণ কুমার চ্যাটার্জি তাই যতই পারিবারিক চাহিদার কারণে সকাল বিকাল চাকরিতে ঢুকুক না কেন, অভিনয়ের পোকা সব সময় মাথায় ঘুরছিল তার। আর এই অরুণ কুমার চ্যাটার্জি পরবর্তীতে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মহানায়ক উত্তম কুমার হিসেবে আবির্ভূত হন।

কিন্তু কপাল মন্দ, প্রথম ছবি ‘মায়াডোর’-এ অভিনয় করলেন। তবে তা মুক্তি পেতে ব্যর্থ হলো। সে হিসেবে প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘দৃষ্টিদান’। তবে ফ্লপ। এত ত্যাগ স্বীকার করে সিনেমায় নেমে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন উত্তম। মাটি কামড়ে পড়ে থাকবেন নাকি চলে যাবেন আগের পেশায়? সকাল বিকাল চাকরি বরং নিরাপদ সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে। না হাল ছাড়েননি উত্তম। এমন সময় আশার প্রদীপ হয়ে এলো ‘বসু পরিবার’ ছবিটি। ব্যবসাসফল এ ছবিটির কারণে উত্তম তখনকার মতো অন্তত হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তবে সত্যিকার অর্থে ব্রেক থ্রু ফিল্মের নাম বলতে গেলে বলতে হয় ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। রোমান্টিক কমেডি ঘরানার ওই ছবিতে তার সঙ্গে প্রথম জুটি বাঁধেন আরেক কিংবদন্তি সুচিত্রা সেন। বাংলা মধ্যবিত্ত পরিবারের ড্রয়িং রুমে সেই যে স্থান করে নিলেন, তা আর হারাতে দেননি। ধরে রেখেছিলেন পরবর্তী তিন দশক ধরে। শুধু অভিনয় নয়, প্রযোজক হিসেবেও উত্তম ছিলেন সফল। ইন্ডাস্ট্রিতে উত্তম কুমারের খ্যাতি ছিল একজন রোমান্টিক হিরো হিসেবে। অবশ্য সুচিত্রা সেনের সঙ্গে অব্যাহত জুটি একটা কারণ এমন ইমেজ তৈরির পিছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। তবে ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বিচিত্র সব চরিত্রে অভিনয় করে নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন অনেকবার। যেমন ধরা যাক সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘চিড়িয়াখানা’ ছবির কথা। যেখানে অভিনয় করেছেন গোয়েন্দার ভূমিকায় কিংবা ‘নায়ক’ ছবিতে তার চরিত্র ব্যতিক্রমী। শোনা যায়, সত্যজিৎ উত্তম কুমারের কথা মাথায় রেখেই ‘নায়ক’ সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন। এমন দেখা যায় তার ‘অমানুষ’ কিংবা ‘আনন্দ আশ্রম’ ছবিতেও। তার স¤পর্কে সত্যজিৎ রায় যথার্থইই বলেছিলেনÑ ‘যদিও বা পরিচালকের দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ থাকে, কিন্তু উত্তম তার আন্তরিকতা ও একাগ্রতা দিয়ে সেটিকে এমনভাবে জয় করেন যে শেষ পর্যন্ত কাজটি পরিপূর্ণতা লাভ করে।’

একজন অভিনেতার জনপ্রিয়তা নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপর। এক তার জনপ্রিয়তা বা তার করা চরিত্রগুলো কেমন তার ওপর, দুই সে মানুষ হিসেবে কেমন তার ওপর। সে জায়গায় উত্তম উতরে যায় ভালভাবেই। একেতো মহানায়ক খেতাব, অপরদিকে রয়েছে তার সহযোগিতাপ্রবণ মনোভাব। নিজের স্ট্রাগলিং অতীতকে তিনি ভোলেননি কখনই। সিনিয়র আর্টিস্ট, জুনিয়র আর্টিস্ট, উঠতি পরিচালক কিংবা সিনিয়র পরিচালক কাউকেই কখনও নিরাশ করেননি তিনি।

বাংলা সিনেমার শ্রেষ্ঠ জুটি উত্তম-সুচিত্রার অংশীদার তিনি। পথে হলো দেরী, মরণের পর, শাপমোচন, শিল্পী, সাগরিকা, হারানো সুর, সবার উপরে, সূর্যতোরণ, চাওয়া-পাওয়া, সপ্তপদী, জীবনতৃষ্ণা, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, ইন্দ্রানী, চন্দ্রনাথ, আলো আমার আলোর মতো ৩০টির বেশি ছবিতে একসঙ্গে পর্দা ভাগাভাগি করেছেন তারা কিছু গুঞ্জন তো থেকেই যায় তাদের স¤পর্ক নিয়ে। কারণ ছিল দুজনের পর্দায় সাবলীল উপস্থিতি। আর এসব নানাবিধ জটিলতা থেকে ১৯৫০ সালে বিয়ে করা গৌরীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় তার ১৯৬৩ সালে। তারপর থেকে তিনি অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে ছিলেন। ওদিকে সুচিত্রা সেনের সংসারেও ভাঙ্গন ধরে। সুতরাং এ জুটির স¤পর্কের আর কোন তল খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে উত্তমের মৃত্যুর সময়ে সুচিত্রার স্বেচ্ছানির্বাসন থেকে বেরিয়ে এসে বিদায় দেয়াটা এখন গুঞ্জনের উৎস মিডিয়ায়। উত্তম কুমার মারা যাওয়ার ২ বছর আগে থেকেই অভিনয় থেকে বিদায় নিয়ে জনসম্মুখে বের হওয়া থেকে বিরত ছিলেন সুচিত্রা। কিন্তু উত্তম কুমার মারা যাওয়ার রাতে এসেছিলেন হাতে ফুল নিয়ে। উত্তমের স্ত্রী সুচিত্রাকে বললেন, সিনেমায় তুমিই ওকে মালা পরিয়ে দিতে, আজও তুমিই দাও। এই হল দু’জনের শেষ দেখা। অবশ্য সারাজীবনই উত্তমের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথাই শোনা গেছে সুচিত্রার মুখে।

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই এই মহানায়ক পরলোক গমন করেন। কিন্তু আজও রয়ে গেছেন আলোচনায়, জনপ্রিয়তায় কিংবা দর্শকের ভূয়সী প্রশংসায়। মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে, মহানায়ক উত্তমও বেঁচে থাক তার অজস্র কর্মের মাঝে অনন্তকাল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।