২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নওয়াজের জয়জয়কার

প্রশ্ন : ‘মাঁঝি দ্য মাউন্টেইন ম্যান’ নিয়ে বলুন। ছবিটি করতে উৎসাহী হলেন কেন?

নওয়াজউদ্দিন : পরিচালক কেতন মেহতা আমার মাথায় কেবল একটা লাইন ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে, একজন ব্যক্তি ২২ বছর ধরে তার ভালবাসার ঋণ শুধতে পাহাড় কেটে গেছে শুধু হাতুড়ি দিয়ে। এটিই ছিল চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যেতে আমার পুঁজি। ভদ্রলোক একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন, কিন্তু তার ভালবাসা ছিল অসাধারণ। আমি ক্যামেরার সামনে তার সেই অনুভূতিকে ধারণ করতে চেয়েছি। এমন ব্যক্তিত্ব এখন আর দেখা যায় না। আমরা সুপারম্যান-ব্যাটম্যান নিয়ে আড্ডায় মাতি, কিন্তু আমাদের ভারতবর্ষেই এমন একজন জ্বলজ্যান্ত সুপারম্যান ছিলেন।

প্রশ্ন : সিনেমার প্রতি আপনার আগ্রহ কি শৈশব-কৈশোর থেকেই?

নওয়াজউদ্দিন : দেখুন, আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর প্রদেশের মুজাফফরনগরের বুদানা নামক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে নদীর পাশে একটা টিনের চালাওয়ালা সিনেমা হল ছিল, যেখানে সাধারণত সি গ্রেডের সিনেমা দেখানো হতো। সেসব দেখেই আমার বড় হয়ে ওঠা। সুতরাং আমি বলিউডের সেই সময়ের ক্ল্যাসিক মুভিগুলো মিস করে গেছি বলতে পারেন। পরবর্তীতে যখন ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামায় এলাম, তখন আমার বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে পরিচয় ঘটল। বলা যায়, সেখানে সিনেমা নিয়ে আমার পড়াশোনাই আমাকে অভিনয় শুরু করতে প্ররোচিত করেছে। আমি কেমিস্ট্রিতে গ্র্যাজুয়েট, সুতরাং সিনেমা না করলে ওই ফিল্ডেই হয়ত থাকতাম।

প্রশ্ন : যতদূর জানি একটা মঞ্চ নাটক আপনাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল। সেই ঘটনাটা কী বলবেন?

নওয়াজউদ্দিন : আমি মনোজ বাজপেয়ীর একটা থিয়েটার পারফর্মেন্স দেখেছিলাম। সেখানেই আমি প্রথম উপলব্ধি করি একজন অভিনেতা কিভাবে দর্শকদের সঙ্গে একটা বন্ধন তৈরি করে ফেলে। সেখানে অবস্থাটা এমন ছিল যে ,অভিনেতা কাঁদলে দর্শক কঁাঁদছে, সে হাসলে দর্শক হাসছে। আমি মনে করি, মঞ্চে অভিনয় করাটা এক ধরনের বডি স্ক্যান করা, যেখানে দর্শকের সামনে লুকানোর কোন সুযোগ নেই। কে কার ছেলে আর কে কার নাতি এমন ভাবার কোন সুযোগ নেই মঞ্চে। যার যা প্রাপ্য দর্শক হাততালি দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দেয়। বিষয়টা আমার মাথায় গেঁথে যায় বেশ আগেই। আমি আসলে ফিল্ম করতে চাইনি। আমি সারাজীবন মঞ্চে অভিনয় করতেই চেয়েছি।

প্রশ্ন : মঞ্চ থেকে সিনেমায় ঢোকার গল্পটা জানতে চাই

নওয়াজউদ্দিন : থিয়েটার করলাম টানা ৭ বছর। কিন্তু আর্থিক জায়গা থেকে আর পারছিলাম না। আবার এদিকে অভিনয়ের প্রেমেও পড়ে গেছি। মুম্বাইয়ে ফিল্মে রোল পাওয়া খুব কঠিন মনে হলো। তাই টিভি সিরিয়ালে ট্রাই করলাম। কিন্তু সেখানেও গ্ল্যামারের চল শুরু হয়ে গেছে ততদিনে। বাধ্য হয়ে ফিল্মে ব্যাক। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কোন রোল পেতাম না। যেমন ধরেন, আমির খানের ‘সরফরাজ’ ছবিতে আমার চরিত্র ছিল জেলখানার একজন কয়েদি, যাকে স্ক্রিনে দেখা গিয়েছিল মাত্র ৪০ সেকেন্ড। ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’ এ আমাকে দেখা যায় একজন পকেটমারের দৃশ্যে। আমি বাধ্য হয়ে কিছু বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করলাম। কিন্তু কপাল সেখানেও মন্দ, সম্ভবত আমার চেহারা ও ফিটনেসের জন্য জনসাধারণের একজন ছাড়া আমি রোল পেতাম না। কিন্তু উপায় তো নেই, আমি করতাম সেসব দৃশ্য তবে ক্যামেরা থেকে মুখ বাঁচাতে চাইতাম। বলতে পারেন কেন? কেউ যেন আমাকে চিনে না ফেলে যে, একজন ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েট জনগণের অংশ হয়ে বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয় করছে। প্রায় ১৫ বছর লেগেছে আমার সিনেমার কম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র থেকে এখনকার লিড রোলে আসতে। এ সময়টা অনেক কষ্টের, কিন্তু মাটি কামড়ে পড়ে থাকার বিধায় অবশেষে সাফল্যের দেখা পেয়েছি।

প্রশ্ন : আপনার সংগ্রামের শেষ আশার আলো, যা আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলÑ

নওয়াজউদ্দিন : যখন অনুরাগ কশ্যপ্যের সঙ্গে দেখা হলো তখন কিছুটা আশা পেলাম। তিনি অনেক অভিনেতাকে তুলে এনেছেন। ‘ব্যাক ফ্রাইডে’ সিনেমার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলাম। কিন্ত সেন্সর বোর্ড ছবিটি আটকে দিল। ২০০৯ এর পরে আমাকে সবাই একটু আধটু চিনতে শুরু করে। কারণ ইন্ডিয়ান সিনেমা তখন একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দিকে এগোচ্ছিল। আমি একাধারে পিপলি লাইভ, ডেভ ডি, নিউইয়র্ক, মিস লাভলি, পাতাং, তালাশ প্রভৃতি সিনেমায় কাজ করতে শুরু করলাম। এগুলোর কিছু কিছু দেশের বাইরেও প্রদর্শিত হয়। তবে কাহানি মুক্তি পাওয়ার পর আমাকে সবাই ভালভাবে চিনে যায় ।

প্রশ্ন : দর্শক নির্দ্বিধায় আপনাকে কোন্ চরিত্রে বেশি গ্রহণ করেছে বলে মনে হয়?

নওয়াজউদ্দিন : আমার মনে হয় গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরের ফায়জাল খান।

প্রশ্ন : আপনার করা সবচেয়ে কঠিন চরিত্র, যা কিনা আপনার উৎরাতে কষ্ট হয়েছে?

নওয়াজউদ্দিন : মাঁঝির চরিত্রটি বেশ কঠিন ছিল আমার জন্য। কারণ আমাকে ২২ বছর থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত অনেক ভিন্ন ভিন্ন লুকে অভিনয় করতে হয়েছে। শারীরিকভাবেও এটা একটা চ্যালেঞ্জ বলতে পারেন। আমি শূটিংয়ে আসল হাতুড়ি ব্যবহার করেছি যেন দৃশ্য বেশি বাস্তবধর্মী হয় সে জন্য। আমি পারতাম নকল হাতুড়ি ব্যবহার করতে, কিন্তু দর্শক বুঝে ফেলত আমি ডামি ব্যবহার করছি।

প্রশ্ন : আপনার ফিল্ম নিয়ে লেখা রিভিউগুলো পড়েন নিয়মিত?

নওয়াজউদ্দিন : আমি যখন আমার ছবির রিভিউ পড়ি তখন তখন মনে হয় যারা লিখেছে, তারা সবাই একটা ঘোরের মাঝে রয়েছে, তাই আমার দুর্বল পয়েন্ট তাদের চোখে পড়ছে না। আসলে কি জানেন? আমি আমাকে পর্দায় সহ্য করতে পারি না, কারণ আমি আমার উইক পয়েন্টগুলো বুঝতে পারি। সিনেমা মুক্তি পাওয়ার আগে আমি একবার পুরোটা দেখে ফেলি এবং আর দেখি না। পরের ছবিতে ভুল না হয়, সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকি।

প্রশ্ন : আপনি বলছেন আপনার অভিনয়ে অনেক দুর্বল পয়েন্ট আছে। কিন্তু সম্প্রতি আপনি কিক, বজরঙ্গি ভাইজান এসব বিগ বাজেটের কমার্শিয়াল ছবিতে অভিনয় করছেন। এসব কিন্তু আপনার পক্ষেই যাচ্ছেÑ দুর্বলতা থাকলে নিশ্চই ডাক পেতেন নাÑ

নওয়াজউদ্দিন : দেখুন সাজিদ নাদিদওয়ালা ‘কিক’-এ নিয়েছেন, কবির খান ‘বজরঙ্গি ভাইজান’-এ নিয়েছেন কিংবা রাহুল ঢোলাকিয়া শাহরুখের সঙ্গে ‘রইস’-এ নিয়েছেন আমাকে, আমি মনে করি, তারা মনে করছেন যে আমার নওয়াজকে চাই। এখানে পরিচালক ও অভিনেতাদের মাঝে একটা বিশ্বাসের খেলা চলে। আমি বিশ্বাস করি আমার পরিচালক আমাকে অপব্যবহার করবেন না, যথাযথ চিত্রায়ন করে প্রতিশ্রুত চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলবেন। অপরদিকে ডিরেক্টর কেন আমার কাছে আসছে বা সে কি ভাবছে? সে ভাবছে নওয়াজ ছাড়া এই চরিত্র কেউ পারবে না। সুতরাং....

প্রশ্ন : সম্প্রতি দেখা কোন চলচ্চিত্র যেটি দেখে মনে হয়েছে এই চরিত্রে যদি আমি অভিনয় করতে পারতাম...

নওয়াজউদ্দিন : হুম, থিওরি অফ এভরিথিং ছবিতে স্টিফেন হকিংয়ের রোলটা করতে পারলে ভাল লাগত কিংবা ধরুন লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওর দ্যা ওলফ অফ ওয়াল স্ট্রিট ছবির ক্যারেক্টার দেখে মনে হয়েছিল, যদি আমি করতে পারতাম...

প্রশ্ন : আপনার জীবন নিয়ে সিনেমা নির্মিত হলে আপনার ভূমিকায় কাকে পছন্দ আপনার?

নওয়াজউদ্দিন : আমি চাইব দীলিপ কুমার আমার চরিত্রে অভিনয় করুক। কারণ আমারও একটা স্বপ্ন আছে, ‘মুঘল এ আজম’ এ তার অসাধারণ পারফর্মেন্স আমাকে মুগ্ধ করেছিল। আমিও সে ছবির মতো কোন চরিত্রে জীবনে একবার অভিনয় করতে চাই।