১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিনেমার ইবনে মিজান

  • জাফর ওয়াজেদ

কোথায় গেলেন ইবনে মিজান, কোথায় আছেন তিনি

ক্ষমতা ছিল জাদুকরী; মুগ্ধ হয়ে তাই সিনেমা গিলি

জাদু কিংবা পরাবাস্তব গুলিয়ে বায়োস্কোপের কাহিনী

পাতালপুরে রাজকন্যে নাগিনী প্রেমে উড়ে কাঁচুনি

সিনেমাতে সবই সম্ভব; অসম্ভবেরে পায়ে ঠেলে

দেখিয়েছিলেন ইবনে মিজান জাদুটোনার খেলে...

বায়োস্কোপের দিনই ছিল, টিকিট কাটতে উপচানো ভিড়

কালোবাজারে চড়া দামে মিলে যেত বাগদাদের চোর

হুর-ই-আরব, নিশান, এক মুঠো ভাতÑ এমন সব নাম

নিন্দামন্দ জুটত তার, সৃজনের পায়নি যে যথার্থ দাম

আমরা তখন সত্তর দশকে সিনেমা দেখি সিনেমা গিলি

গিলতে-গিলতে স্বপ্ন দেখি বনবাসে রূপবানেতে মিলি

দক্ষ হাতে ক্যারিশমা এক দেখিয়েছেন ইবনে মিজান

আমরা তার গুণমুগ্ধ গ্রামবাংলার ছিলেন জান পেহচোন

জাদুবাস্তব পরাবাস্তব যতই যা কিছু আজ বলুন যা হয়

সেরাই ছিলেন ইবনে মিজান-স্বপ্ন বিলাতেন মায়াময় ॥

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের স্নাতকোত্তর ছাত্রটির মধ্যে সিনেমার বীজ প্রবেশ করেছিল ছাত্রাবস্থায়ই। হিন্দি, উর্দু সিনেমার মনোযোগী দর্শক ছিলেন। সেসব ছায়াচিত্রের দৃশ্যগুলো তাকে আলোড়িত করেছিল। মনে গেঁথে গিয়েছিলও। যা পরবর্তীকালে তার নির্মিত চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে কাহিনীসহ। এমনকি নির্মাণশৈলী কিংবা গানও হুবহু। সাধারণরাই ছিলেন তার দর্শক। শ্রমক্লান্ত মানুষের চিন্তার জগতে তিনি ফ্যান্টাসি বলি আর রূপকথাই বলি, এক ধরনের ঘোর তৈরি করতে পারতেন। তার ছবি মানে প্রেক্ষাগ্রহ উপচে পড়া দর্শক। বক্স অফিস হিট। শিক্ষিত শ্রেণীর কাছে ছিলেন পরিত্যজ্য। এমনকি চলচ্চিত্র বোদ্ধারাও তার সমালোচনায় থাকতেন মুখর। সমালোচিত হতে সম্ভবত ভালবাসতেন ইবনে মিজান। তিনি এসবের কোন জবাবই দেননি। বরং তার দর্শকদের জন্য তিনি ছবির পর ছবি নির্মাণ করেছেন। তার প্রায় সব ছবির মূূল সূত্র পুরনো দিনের বা তার সময়ের হিন্দী বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র।

ইবনে মিজান ১৯৬৪ সালে প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন উর্দু ভাষায় ‘আওর গাম নেহী’। এতে খলনায়ক চরিত্রে আজিমকে অভিনয়ে প্রথম নিয়ে আসেন। কিন্তু ছবিটি নানা কারণে মুক্তি পায়নি। ১৯৬৫ সালে সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘রূপবান’ ছবিটি সুপার-ডুপার হিট। ব্যাপক সাফল্য পায় ছবিটি। এরই প্রভাবে ১৯৬৬ সালে ইবনে মিজান নির্মাণ করেন ‘আবার বনবাসে রূপবান’। এটাও ব্যবসায়িক সাফল্য লাভ করে। এরপর ইবনে মিজান আর থেমে থাকেননি। একের পর এক নির্মাণ করতে থাকেন চলচ্চিত্র। বাংলা চলচ্চিত্র জগতে ফোক-ফ্যান্টাসি নির্মাণে যত পরিচালক রয়েছেন, তারা সকলে ইবনে মিজানের কাছে শিশুই যেন। তার মতো এত সুন্দর কাহিনী নির্বাচন এবং এত অসাধারণ করে সিনেমা তৈরি করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তিনি তার প্রতিটি ছবিকে একটা নতুন আঙ্গিকে নির্মাণ করতেন। পুনরাবৃত্তি ঘটত না। নিজের সঙ্গে নিজের এই চ্যালেঞ্জে তিনি অনেক গল্প বলার ভঙ্গি সৃষ্টি করেছেন, যা পরবর্তীকালে অনেকেই অনুসরণ করেছেন। তার প্রতিটি ছবিতেই ছিল এক নতুন কিছু, যা দেখার জন্য দর্শক উদগ্রীব হয়ে থাকত। যে পরিচালকের নামে সিনেমা চলত, তার মধ্যে সবচেয়ে সেরা ছিলেন ইবনে মিজান। ভারতীয় সিনেমা যেহেতু এদেশে আসত না, তাই সেসব কাহিনী অবলম্বনে সিনেমা বানাতেন। সত্তর ও আশির দশকে শীর্ষ নকল নির্মাতার তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন ইবনে মিজান।

বাংলা সিনেমার স্বর্ণালী সময়কালে যে ক’জন পরিচালক দক্ষতায়-যোগ্যতায় সমৃদ্ধ হয়েছিলেন, তাদের একজন ইবনে মিজান। ষাট দশকের মাঝামাঝি থেকে আশির দশক পর্যন্ত তার সিনেমা মানেই সুপারহিট। প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা তার ছবির প্রদর্শনে আগ্রহী থাকতেন। ফোক-ফ্যান্টাসি সিনেমার মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন। সামাজিক এ্যাকশনধর্মী ছবিতেও তার সাফল্য কাহিনী অবিস্মরণীয় বলা যায়। গত ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। বয়স এখন আশি ছুঁই ছুঁই। থাকেন পুত্র টিটু মিজানের সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়ার করোনা শহরে। বয়সের কাছে পরাজিত তিনি। যখন তিনি নামী-দামী পরিচালক; তখন বিশাল দেহধারী আর রাশভারী একটা ইমেজ নিয়ে চলাফেরা করতেন।

ব্যবসায়িক সাফল্যের বরপুত্র ইবনে মিজান যেসব ছবি নির্মাণ করে অমর হয়ে আছেন, তার মধ্যে রয়েছেÑ একালের রূপকথা, আবার বনবাসে রূপবান, রাখাল বন্ধু, জরিনা সুন্দরী, পাতালপুরীর রাজকন্যা, আমির সওদাগার ও ভেলুয়া সুন্দরী, শহীদ তিতুমীর, নাগিনীর প্রেম, কত যে মিনতি, কমলরানীর দীঘি, ডাকু মনসুর, জিঘাংসা, দুই রাজকুমার, বাহাদুর, শাহজাদা, তাজ ও তলোয়ার, একমুঠো ভাত, নিশান, নাগ নাগিনীর প্রেম, পাতাল বিজয়, লাইলী মজনু, পুনর্মিলন, রাজবধূ, বাগদাদের চোর, রাজকুমারী, রাজ নর্তকী, বসন্তমালতি, বাহাদুর, নওজোয়ান ইত্যাদি।

সিরাজগঞ্জে ১৯৩৭ সালে জন্মগ্রহণকারী ইবনে মিজান তার সময়কালে নন্দিত- নিন্দিত ও ছিলেন। কিন্তু দর্শকের কাছে ছিলেন গ্রহণীয়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তার অবদান অবশ্যই মূল্যায়িত হবে তার সৃজনের শিল্প কুশলতায়।