২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পৈশাচিকতার বিপরীতে-

বরেণ্য কথাশিল্পী ও চিত্রনির্মাতা শহীদ জহির রায়হান ১৯৭১ সালে লিখেছিলেন- ‘ধর্মের নামে, বর্ণের নামে, ভাষার নামে, গোত্রের নামে মানুষ মানুষকে হত্যা করছে।’ সেই রেশ ধরে একালে তুচ্ছ কারণেও নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে মানুষকে। পাশবিক আচরণকারীরা হত্যা শেষে উল্লাসও করে। বর্বরতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া মানুষরূপী শ্বাপদরা হিংস্রতার পরাকাষ্ঠা হিসেবে যা করছে, তা বর্ণনার ভাষাও মেলে না। পৈশাচিকতা যতদূর যায় এরাও সেই পথে হাঁটছে। এদের হাতে খুন হচ্ছে শিশু-কিশোরসহ মানবিক মূল্যবোধ। লুণ্ঠিত হচ্ছে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহজাত প্রবৃত্তি। রাজনৈতিক খুনোখুনি, মারামারি আর সংঘাতের বাইরে ত্চ্ছু কারণে বর্বরোচিত হত্যার ঘটনায় ভাঙছে অনেকের সুন্দর আর সাজানো সংসার। সামাজিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চরম বিপর্যয় ঘটে চলেছে। সামাজিক সম্পর্কের অবনতিও ঘটছে। তথ্যপ্রযুক্তির কারণে সমাজ মানসে যে পরিবর্তন এসেছে তার সঙ্গে অনেকেই খাপ খাওয়াতে পারছে না। এমনিতে দেশ ও সমাজ দ্রুত বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির যুগ মনমানসিকতায় পরিবর্তন এনেছে।

আত্মকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সম্পর্কের বন্ধন আলগা হচ্ছে। পরস্পরের বিচ্ছিন্নতা, বিচারহীনতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতার সংস্কৃতিও বীভৎস হত্যাযজ্ঞের অন্যতম কারণ। শুধু ধর্ম দিয়ে নয়, সাংস্কৃতিক বিকাশ জাগ্রত করে অন্যের অধিকারের প্রতি আরও সংবেদনশীল হওয়ার লক্ষণগুলো মানসিক আধিপত্যে সংযোজন জরুরী। তদুপরি আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলায় যে সহায়ক নয়, তা বার বার প্রমাণিত হচ্ছে। যে কারণে খুনী হয়, জঙ্গী হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও। সামাজিক মমত্ববোধ সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বিষয়টিও প্রভাব ফেলে মানুষ হত্যার মতো পাশবিক প্রবৃত্তি ধারণে। সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা তাদের মতো করে পর্যালোচনায় দেখিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু-কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা, গর্ভবতী মাকে পেটের শিশুসহ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাগুলো ক্রমশ সমাজ শৃঙ্খলার গিঁটগুলো ছিঁড়ে ফেলছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রযুক্তির প্রতি অনিয়ন্ত্রিত মনোনিবেশ, ধর্মের অপব্যাখ্যা, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা, নৈতিক অবক্ষয়, প্রতিহিংসা, মাদকের প্রভাব এবং রাজনীতিতে দেউলিয়াপনা ও লুটেরা শ্রেণীর বিকাশ ইত্যাকার কারণ রয়েছে নৃশংসতার নেপথ্যে। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সামাজিক-পারিবারিক মূল্যবোধ বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা সুপ্রতিষ্ঠা। জন্মগত পাশবিক প্রবৃত্তিগুলো পারিপার্শ্বিকতার কারণে এমনিতেই ফুটে বেরোয়। মানুষের আচরণ ক্ষেত্রগুলো অনেকাংশেই পরিবার নির্ধারণ করে দেয়। ১৯৭১-১৯৭৫ এবং তৎপরবর্তীকালে নির্মম, নৃশংস হত্যাকা- অবলোকন করা বাঙালীকে সব সয়ে যেতে হয়েছে। সর্বশেষ গত জানুয়ারি-এপ্রিল মাসে পেট্রোলবোমা মেরে, বাসে আগুন দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে দেড় শতাধিক প্রাণ। অগ্নিদগ্ধরা এখনও পৈশাচিকতার চিহ্নসহ কষ্ট বয়ে বেড়ায়। এসব ঘটনায় মানুষ ক্ষুব্ধ, বেদনার্ত ও প্রতিরোধী হলেও যারা এসব কাজে জড়িত ছিল, তাদের মন-মানসিকতার মানুষ সমাজে বাড়ছে। যদিও সমাজের বেশিরভাগ মানুষ আইন নয় বিবেক দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। আইন অমান্য করে থাকে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ চেতনাধারী তাদের অনুসারীরা। প্রচার ও গণমাধ্যমগুলো যে এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে, তা তো নয়। অনেক চলচ্চিত্র, নাটক বা পরিবেশিত খবর সহিংস মানসিকতাকে চাগাড় দিয়ে তুলতে সহায়ক হয়। সিলেটের রাজন, কুমিল্লার মনির, খুলনার রাকিবসহ সাম্প্রতিক আরও পৈশাচিক হত্যাকা- পরিষ্কার করে যে, মানুষের পাশবিকতার বহির্প্রকাশ একদিনে হয়নি। অপরাধ করে দিনের পর দিন অপরাধীরা পার পেয়ে আসছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর। বিচারহীনতার হতাশাও মানুষকে খুনী করায়। জীবনানন্দ দাশের ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন’ যেন বাংলাদেশকে গ্রাস করতে চায়, তাই রাজনীতি ও সমাজ নীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে দেশ জাতি ও রাষ্ট্রের স্বার্থেই। সমাজ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য পারিবারিক শৃঙ্খলা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে নৈতিক মূল্যবোধ সংশ্লিষ্ট করা বাঞ্ছনীয়। রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এসব ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হবে। সক্রিয় হতে হবে সকলকে। নতুবা কেউই নিরাপদ নয়।