১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ হজ্জ মৌসুম ভাবনা

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

হজ্জ ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম। পাঁচ স্তম্ভের প্রথমটি ঈমান। এই ঈমান বিধান নাযিল হয় ৬১০ খ্রিস্টাব্দে আরবে প্রচলিত রমাদান মাসের ২৭ তারিখ রাতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পরপরই। প্রথম ওহী পেয়ে তিনি তাঁর অবস্থান স্থল মক্কা মুকাররমার কা’বাঘর থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত হেরা গুহা থেকে গৃহে ফিরে এসে তাঁর বিবি হযরত খাদীজাতুল কুব্রা রাদিআল্লাহু তাআলা আনহার কাছে প্রথম ওহী প্রাপ্তির সব ঘটনা খুলে বললেন। বিবি খাদীজা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হা সব ঘটনা শুনে ঈমান আনলেন। তারপর ঈমান আন্লেন কিশোর বালক হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহু, তারপর হযরত যায়েদ বিন হারিসা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু। বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে ঈমান আনলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু। ঈমানের মূলকথা হচ্ছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মাদুর রসূলুল্লাহ্। এই কলেমার ওপর সর্বান্তকরণে বিশ্বাস স্থাপনই করাই হচ্ছে ঈমান। ঈমান যাঁরা আনয়ন করেন তাঁরাই মু’মিন। হিজরতের আগ পর্যন্ত মক্কা মুকাররমায় এই ঈমানের প্রতি আহ্বান চলতে থাকে। অনেকেই ঈমান আনয়ন করে মুসলিম হয়ে যান। হিজরতের প্রায় দেড় বছর আগে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম মিরাজ গমন করেন। মিরাজ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের বিধান নিয়ে তিনি ফিরে আসেন। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদীনা মনওয়ারায় হিজরত করে যান। মদিনায় তিনি স্থাপন করেন একটি মসজিদ, যা মসজিদুন্নববী নামে পরিচিত হয়। এই মসজিদকে কেন্দ্র করে তিনি গড়ে তোলেন একটি রাষ্ট্র-কাঠামো। এই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রচিত হয় একটি সংবিধান, যা মদীনার সনদ নামে খ্যাত হয়। এই সনদই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র। এরও দুই বছর পর ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে সিয়াম বিধান নাযিল হয়। তারপর আসে যাকাত বিধান।

৬৩১ খ্রিস্টাব্দে (নবম হিজরী) নাযিল হয় হজ্জ বিধান।

হজ্জ ফরয ইবাদত। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জীবনে অন্তত একবার হজ্জ করা ফরয। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ (ইবাদত গৃহ) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাতো বাক্কায় (মক্কা)। তা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী। তাতে আছে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন, আছে মকামে ইবরাহীম। আর যে সেখানে প্রবেশ করে সে নিরাপদ। আর আল্লাহর উদ্দেশে ওই গৃহের হজ্জ করা সেই মানুষের জন্য অবশ্য কর্তব্য, যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে। (সূরা আল ইমরান : আয়াত ৯৬-৯৭)

হজ্জ বিশ্ব মানবসভ্যতার ইতিহাসে সর্ব প্রাচীন মানবতার মহাসম্মেলন ব্যবস্থা। আমরা জানি কা’বা ঘর নির্মিত হয় আদি পিতা হযরত আদম আলায়হিস সালামের সময়। হযরত নূহ আলায়হিস্ সালামের সময়কার মহাপ্লাবনে এই ঘর ধসে পড়ে। আল্লাহর নির্দেশে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম এই ঘর পুনর্নিমাণ করেন, এই ঘর নির্মাণে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ঈসমাইল (আ.) সহযোগিতা করেন। ঘর নির্মিত হয়ে গেলে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস সালামকে নির্দেশ দেনÑ এই ঘরে হজ্জ করার ঘোষণা দাও। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেনÑ আর আমি যখন ইব্রাহীমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম সেই গৃহের স্থান তখন বলেছিলাম, আমার সঙ্গে কোন শরিক স্থির করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রেখো তাদের জন্য যারা তওয়াফ করে, যাঁরা দাঁড়ায়, রুকু করে ও সিজ্দা করে। এবং মানুষের নিকট হজ্জের ঘোষনা করে দাও, ওরা তোমার নিকট আসবে পদব্রজে ও ক্ষীণকায় উটের পিঠে, ওরা আসবে দূর-দূরান্তর পথ অতিক্রম করে। (সূরা হজ্জ : আয়াত ২৬-২৭)

হযরত ইব্রাহীম (আ.) আবু কুবায়স পাহাড়ে দাঁড়িয়ে হজ্জের ঘোষণা দেন। তখন থেকে প্রতিবছর জিলহজ্জ মাসে বিভিন্ন স্থান থেকে এখানে লোকজন আসতে থাকেন। কিন্তু কালক্রমে এখানে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপিত হয়। মানুষ আল্লাহ্র ইবাদত না করে মূর্তি পূজায় লিপ্ত হয়। ৬৩১ খ্রিস্টাব্দে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তওহিদভিত্তিক হজ্জ কায়েম করেন। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ১ লাখ ৫০ হাজার সাহাবী নিয়ে হজ্জ করেন। তিনি যে নিয়মে হজ্জ পালন করেছিলেন সেই নিয়মেই আরও হজ্জ পালিত হয়ে আসছে।

এক সময় হজ্জ ব্যবস্থাপনার ব্যয় নির্বাহের জন্য মুসলিম দেশসমূহ থেকে প্রচুর অর্থ প্রেরণ করা হতো আরব দেশে। বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দীন আজম শাহ্ (১৩৯০-১৪১০) বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রেরণ করেছিলেন। তিনি মক্কা শরীফে বাবে উম্মে হানীতে একটি মাদরাসা স্থাপন করেছিলেন। এছাড়াও হাজীদের থাকা-খাওয়ার জন্য মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং মদীনা মনওয়ারায় বাবুস সালামে একটি মাদরাসা স্থাপন করেছিলেন। মুঘল সম্রাট বাবর, শের শাহ্ সুরী প্রচুর অর্থ পাঠাতেন। সম্রাট আকবর (১৫৫৬-১৬০৫) হজ্জ করার জন্য হাজীদের অর্থ প্রদান করতেন এবং হজ্জ কাফেলা এগিয়ে দেয়ার জন্য নিজে ইহ্রামের পোশাক পরিধান করে খালি পায়ে ও নগ্ন মস্তকে বহুদূর পর্যন্ত কাফেলার সঙ্গে গমন করতেন। সম্রাট শাহ্জাহান (১৬২৮-১১৫৮) তাঁর কালে মক্কা শরীফে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে মক্কা শরীফে পর্যাপ্ত অর্থ প্রেরণ করে ছিলেন।

হাজীদের খিদমতে সামর্থ্যানুযায়ী আত্মনিয়োগ করাও সওয়াবের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে প্রাচীনকাল থেকেই। যাঁর হজ্জ করার সামর্থ্য হয় তাঁর কোনোরূপ কালক্ষেপণ না করে হজ্জ করা উচিত।

বাংলাদেশ থেকে এক সময় স্টিমারে হজ্জে যাওয়ার সুবিধে ছিল। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে শেষবারের মতো স্টিমারে বর্তমান লেখক হজ্জ করেছিলেন। তারপর উড়োজাহাজে কয়েকবার হজ্জ করেছিলেন। কিন্তু স্টিমারে হজ্জে যাওয়ার আনন্দ অন্যরকম।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা

ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহাম্মদ (সা), সাবেক পরিচালক

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ