১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাকিব হত্যা মামলার চার্জশীট শীঘ্রই ॥ বিউটি রিমান্ডে

  • লালমনিরহাটে আরেক শিশু নির্যাতিত

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ গ্যারেজ শ্রমিক শিশু রাকিব হত্যা মামলা দ্রুত বিচারের দাবিতে বৃহস্পতিবারও খুলনা নগরী দিনভর উত্তাল ছিল। মামলার অন্যতম আসামি বিউটি বেগমের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। অপর দুই আসামিও এখন গ্রেফতার রয়েছে। এদিকে বরগুনার আমতলীতে নৃশংস নির্যাতনে শিশু রবিউল আউয়ালকে হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে আসামি মিরাজ খাঁন।

এছাড়া লালমনিরহাটে চুরির অভিযোগে ১১ বছরের এক শিশুর ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন, অপরদিকে, খুলনার রাকিব ও সিলেটের রাজন হত্যার প্রতিবাদে বগুড়া শহরের কেন্দ্রস্থলে সংস্কৃতিকর্মীরা মানববন্ধন করেছে। খবর স্টাফ রিপোর্টার ও নিজস্ব সংবাদদাতার।

স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা অফিস ॥ গ্যারেজ শ্রমিক শিশু রাকিব হত্যা মামলার দ্রুত বিচারের দাবিতে খুলনায় আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। জনমতের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগও চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি চাইছে। মামলাটির দ্রুত চার্জশীট প্রদান এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটির বিচার কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে খুলনা মেট্রোপলিটান পুলিশ (কেএমপি) তৎপর রয়েছে। এদিকে শিশু রাকিব হত্যা মামলার আসামি বিউটি বেগমের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করার পর বৃহস্পতিবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে। নগরীর টুটপাড়া কবরস্থানের নিকটবর্তী গ্যারেজ মালিক ওমর শরীফ ও সহযোগী মিন্টু খানের বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে শিশু শ্রমিক রাকিব সোমবার রাতে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়ার পর থেকেই খুলনায় প্রতিবাদ, বিক্ষোভের ঝড় শুরু হয়। পৈশাচিক নির্যাতনে নিহত শিশু রাকিব হত্যাকারীদের বিচারের বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় নগরীর পিটিআই মোড়ে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে মানববন্ধন করে। সকাল সাড়ে ১০টায় রাকিবের জন্য এলাকাবাসী টুটপাড়া থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে আদালত প্রাঙ্গণে গিয়ে অবস্থান করে। পরে মিছিলটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। দুপুর একটায় রাকিব হত্যাকা-ের প্রতিবাদে খুলনা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ওয়ার্ল্ড ভিশনের শিশু সুরক্ষা ফোরাম। সামাজিক অবক্ষয়, শিশুদের অধিকার ও শিশুশ্রম আইন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বাড়ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিমত প্রকাশ করা হয়। এছাড়া বিকেল ৫টায় নগরীর রয়্যাল মোড়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে শিশু রাকিব হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করা হয়। সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ জাফর ইমাম ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শ্যামল সিংহরায় খুনীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

বিউটি বেগম তিনদিনের রিমান্ডে ॥ পুলিশ জানায়, শিশু রাকিব হত্যা মামলার তিন আসামির সকলেই গ্রেফতার হয়েছে। আসামি বিউটি বেগমকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তিনি এই মামলার প্রধান আসামি মোটরসাইকেল গ্যারেজ মালিক ওমর শরীফের মা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খুলনা থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই কাজী মোস্তাক আহমেদ জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আসামি বিউটি বেগমকে খুলনা জেলা কারাগার থেকে মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে খুলনা মহানগর হাকিম মোঃ ফারুক ইকবাল তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তাকে জিজ্ঞাসবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়।

এদিকে খুলনা প্রশাসন ও কেএমপি চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি চাইছে। ঘটনা ঘটার পর থেকে পুলিশ তৎপর রয়েছে। দ্রুত চার্জশীট প্রদানের পাশাপাশি চাঞ্চল্যকর এ মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়েই পুলিশ তৎপর রয়েছে। কেএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (নগর গোয়েন্দা) শেখ মনিরুজ্জামান মিঠু বলেন, মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন খুলনা থানার এসআই কাজী মোস্তাক আহমেদ। কেএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোঃ মাহবুব হাকিমের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের মনিটরিং টিম মামলাটির তদন্ত কার্যক্রমসহ সার্বিক মনিটরিং করছে। কেএমপি কমিশনার নিবাস চন্দ্র মাঝির নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করে ইতোমধ্যে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। কেএমপি কমিশনার নিজেও মাঠ পর্যায়ে গিয়ে খুঁটিনাটি নানা বিষয়ে অনুসন্ধান করছেন।

সূত্র জানায়, শিশু রাকিব হত্যা মামলার তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা রিপোর্ট ওসির নিকট পেশ করবেন। ওসি তদন্ত রিপোর্টটি বিচার বিশ্লেষণ করে কেএমপি কমিশনারের কাছে পেশ করবেন। পুলিশ কমিশনার হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের জন্য খুলনা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের আবেদন করবেন। খুলনা জেলা প্রশাসক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিকট থেকে অনুমোদন নিয়ে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের ব্যবস্থা করবেন বলে সূত্র জানায়।

পুলিশ জানায়, আসামি শরীফ ও মিন্টু মিয়ার দ্রুত সুস্থতার ওপর মামলার তদন্ত কাজ দ্রুত শেষ হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করছে। কারণ শরীফ ও মিন্টু সুস্থ হলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে। রিমান্ডে পাওয়া তথ্য মামলার তদন্তে অনেক সহায়তা জোগাবে। এ ব্যাপারে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও রাকিব হত্যায় গঠিত মনিটরিং টিমের প্রধান মোঃ মাহবুব হাকিম বলেন, প্রধান দুই আসামি সুস্থ হয়ে উঠলে মামলার তদন্তের গতি আরও বেড়ে যাবে। ফলে দ্রুত চার্জশীট প্রদানে সুবিধা হবে।

গণপিটুনির শিকার ভুয়া সাংবাদিক ॥ এদিকে বর্বর হত্যাকা-ের শিকার শিশু রাকিবের বাবাকে সমঝোতার প্রস্তাব দেয়ায় আলী হোসেন নামের এক ভুয়া সাংবাদিককে গণপিটুনি দিয়েছে স্থানীয়রা। তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে ভর্তি করা হয়েছে।

শিশু রবিউল হত্যার স্বীকারোক্তি ॥ বৃহস্পতিবার আমতলী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নৃশংসভাবে শিশু রবিউল আউয়ালকে হত্যার কথা স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছে প্রধান আসামি মিরাজ খাঁন (২৫)। মঙ্গলবার রাতে বরগুনার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউপি চেয়ারম্যান ইউনুছ ফরাজীর মাছের ঘের থেকে ১২ বছরের শিশু রবিউল আউয়ালের লাশ পুলিশ উদ্ধার করে। পুলিশ ঘটনার মূল নায়ক ও এজাহারভুক্ত আসামি মিরাজ (২৫) গ্রেফতার করে বৃহস্পতিবার আমতলী আদালতে সোপর্দ করেছে। বিজ্ঞ বিচারক বৈজয়ন্ত বিশ্বাস মিরাজের বক্তব্য ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করে তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। গত বুধবার দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় মাছ চুরির অভিযোগে শিশুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোনাকাটা ইউনিয়নের ছোট আমখোলা গ্রামের চতুর্থ শ্রেণীতে মাদ্রাসা পড়ুয়া দুলাল মৃধার ছেলে রবিউল আউয়াল সোমবার রাতে মাছ ধরতে ইউনুছ ফরাজীর ঘেরে যায়। এরপর তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। মঙ্গলবার রাতে ওই ঘের থেকে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানান ছোট আমখোলা গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য লকনার খাল দখল করে ইউপি চেয়ারম্যান ইউনুছ ফরাজী, তারই ভাই রফেজ ফরাজী ও খালেক সরদার মাছের ঘের করে। ওই ঘেরে রবিউল মাছ ধরতে গেলে চোর সন্দেহে মিরাজ, খালেক সরদার, মালেকসহ ঘেরের লোক জন মারধর করে তার একটি চোখ উপরে ফেলে এবং তাদের নির্মম নির্যাতনে রবিউলের মৃত্যু হয়েছে বলে বাবা দুলাল মৃধা সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেছে। ওইদিন দুপুরে রবিউলের পিতা দুলাল মৃধা বাদী হয়ে তালতলী থানায় মিরাজসহ অজ্ঞাত ৫ জনকে আসামি দিয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

বৃহস্পতিবার আমতলী কোর্ট প্রাঙ্গণে আসামি মিরাজ সাংবাদিকদের কাছে বলেন সে ওই ঘেরের নৈশপ্রহরী হিসেবে কাজ করত। রবিউল প্রায় রাতে মাছের ঘের থেকে মাছ চুরি করত। সে আরও স্বীকার করেন ঘটনার রাতে (সোমবার) রবিউল মাছ চুরি করতে ঘেরে আসে। তার আগমন টের পেয়ে অন্ধকারে চোর চোর বলে চিৎকার করলে রবিউল দৌড়ে পালাবার সময় তাল গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মাথায় ও চোখে আঘাত লাগায় ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়েছে। মিরাজের বাড়ি তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নের ছোট আমখোলা গ্রামে। তার বাবার নাম দেলোয়ার খান। তার স্ত্রী হোসনেয়ারা ও মারিয়া নামের ১৮ মাসের শিশু কন্যা রয়েছে।

রাজনৈতিক দলের অফিসে শিশুকে নির্যাতন ॥ লালমনিরহাটে এক রাজনৈতিক দলের অফিসে চুরির অপবাদে ১১ বছরের শিশুকে নির্যাতন করার হয়। পরে ৫ হাজার টাকা জরিমানা ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে স্বজনদের কাছে শিশুটিকে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে শিশুটি ৩ দিন ধরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসা চলছে।

প্রত্যক্ষদর্শী, গ্রামবাসী ও স্বজনদের সূত্রে জান যায়, জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান বাজারের রবিবার ভোরে শেখ সুন্দর গ্রামের মুদি দোকানদার আব্দুল কাদেরের বাড়িতে চুরি হয়। এই চুরি সঙ্গে জড়িত সন্দেহে শিশু জব্বারকে (১১) অভিযুক্ত করা হয়। সে একই গ্রামের কাদের মিয়ার পুত্র। সানিয়াজান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছে শিশুটিকে সোপর্দ করে মুদি ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের। শিশুটির মা মনোয়ারা বেগম জানান, সানিয়াজান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অফিস চত্বরে নিয়ে তাকে চেয়ারম্যান মেম্বাররা মারধর করে। সাদা কাগজে তার পিতা কাছে স্বাক্ষর নেয়। ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে তাকে ছেড়ে দেয়। পরে তার কান ও মুখ দিয়ে রক্ত ঝরতে ঝরতে অজ্ঞান হয়ে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে তাৎক্ষণিতভাবে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পঞ্চম তলায় ১৮ নম্বর ইউনিটে তার চিকিৎসা চলছে। সানিয়াজান ইউপি চেয়ারম্যান এনায়েত উল্লাহর মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করে পাওয়া যায়নি। হাতীবান্ধা থানা পুলিশের ওসি মোঃ আব্দুল মতিন জানান, শিশু নির্যাতনের কোন অভিযোগ তার থানায় আসেনি। খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।