১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চিঠি থেকে ইনবক্স

  • তৌফিক অপু

আমার মা,

আশা করি ভালই আছ। কিন্তু আমি ভাল নাই। তোমায় ছাড়া কিভাবে ভাল থাকি! তোমার কথা শুধু মনে হয়। আমরা ১৭ জন। তার মধ্যে ৬ জন মারা গেছে, তবু যুদ্ধ চালাচ্ছি। শুধু তোমার কথা মনে হয়, তুমি বলেছিলে, ‘খোকা মোরে দেশটা স্বাধীন আইনা দে’, তাই আমি পিছপা হই নাই, হবো না, দেশটাকে স্বাধীন করবই। রাত শেষে সকাল হইব, নতুন সূর্য উঠব, নতুন একটা বাংলাদেশ হইব... তোমার পোলা নুরুল হক, যুদ্ধক্ষেত্রে হইতে। চিঠিটা ১৯৭১ সালের ১৯ নবেম্বর লেখা। এক মুক্তিকামী সন্তান অশ্রুভেজা চোখে তার মাকে এই চিঠিটা লেখে। এই চিঠি যেন শুধু চিঠি নয়। এই চিঠিতে জড়িয়ে আছে মমতা, রয়েছে আকুলতা, সেই সঙ্গে বিজয় ছিনিয়ে আনার দৃপ্ত শপথ তো রয়েছেই। ছোট্ট একটা চিঠি যে কত মাত্রার হতে পারে তা এই চিঠিটি পড়লেই বোঝা যায়। এ যেন শুধু কাগজে-কলমে লেখাই নয়, জীবনের এক প্রতিচ্ছবি। চিঠি যে কত প্রাণবন্ত আর শক্তিশালী হতে পারে এ যেন তারই প্রমাণ, চিঠিটি নুরুল হক নিজে লেখেনি। অন্যের সাহায্য নিতে হয়েছিল। যে কারণে চিঠিতে কিছুটা মুখের ভাষা ও শুদ্ধভাষার সংমিশ্রণ ঘটেছে। হয়তো বানানও ভুল আছে দু-একটি। কিন্তু তাতে মায়ের হয়তো কিছু যায় আসেনি। সেও হয়তো কাউকে দিয়ে পড়িয়ে শুনেছে, সেসব কিছুই তুচ্ছ হয়ে প্রাণাবেগই দৃঢ়তার স্বাক্ষর রেখেছে। আর চিঠি এমনই।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমরা যখন অভ্যস্ত ছিলাম না তখন চিঠিই একমাত্র একাধারে অনেক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো, কারণ এই চিঠিই কখনও বিনোদনের খোড়াক যোগাত, কখনও ব্যথাতুর হৃদয়ে কান্না ঝরাতো, কখনও উৎফুল্ল করত, কখনও করত আবেগে আপ্লুত, কী সেই অদ্ভুত টান কালি ও কাগজে লেখা চিঠিতে যা বোঝা বড়ই দায় ছিল। কিছু কিছু চিঠি তো বারবার খুলে পড়ে আবার ভাঁজ করে রাখতে রাখতে ভাঁজের অংশগুলোই ছিঁড়ে যায়। বিশেষ করে প্রেমের চিঠি, চিঠি পাওয়ার আকুলতা কিংবা চিঠি পড়ার আনন্দ সব কিছুই যেন আজ ম্লান। কবি মহাদেব সাহা তার একটি কবিতায় চিঠি পাওয়ার যে আকুলতা দেখিয়েছেন তা সত্যিই মনে রাখার মতোÑ

‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও,

খামে ভরে তুলে দিও

আঙ্গুলের মিহিন সেলাই

ভুল বানানেও লিখো প্রিয়ো,

বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,

এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও

তোমার শাড়ির মতো

অক্ষরের পাড় বোনা একখানি চিঠি...’

কবির এ আকুলতা আজ কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। আসলে ব্যাপারটা শুধুমাত্র সময়ের। এ সময়টা যে কবিতা লিখে চিঠি পাঠানোর নয়, এসময়টা এখন রিমোট কন্ট্রোল আর লেফট-রাইট ক্লিকের সময়, কর্পোরেট ব্যস্ততার সময় । পৃথিবীর ছুটে চলা গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবার সময়। হাইটেক গ্লোবাল ভিলেজে এখন আর চিঠিতে মন ভরছে না। মুঠোফোন, ইন্টারনেট, চ্যাট, ই-মেইল, এসএমএস এবং ফেসবুকের কারণে চিঠি এখন আর লেখা হয় না। চিঠি সময়সাপেক্ষ একটি ব্যাপার বলে এ যুগে আর খাপ খাইছে না। যে কারণে ‘নাই টেলিফোন, নাইরে পিয়ন, নাইরে টেলিগ্রাম, বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম’ গানগুলোও অতীতের ঝুলিতে জমা পড়ে আছে। এখন শুধুমাত্র অফিসিয়াল চিঠি ছাড়া আর চিঠি লেখা হয় না।

ইন্টারনেটের এ যুগে চিঠির প্রচলন অনেক কমে গেলেও তা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। অনেক অফিসিয়াল চিঠি এখনও প্রতিদিন ডাক বিভাগের মাধ্যমেই আসে। তবে আশার কথা হচ্ছে প্রযুক্তির ছোঁয়া ডাক বিভাগেও লেগেছে। প্রচলিত মানি অর্ডার সেবার পাশাপাশি দেশের সব জেলা সদরের প্রধান ডাকঘরসহ গুরুত্বপূর্ণ সাব পোস্ট অফিস এমনকি উপজেলা পর্যায়ের অনেক ডাকঘরে চালু হয়েছে ইলেক্ট্রনিক্স মানি ট্রান্সফার সার্ভিস (ইএমটিএনএস)। এ সার্ভিসের মাধ্যমে মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের সাহায্যে দ্রুততার সঙ্গে এসব অফিসে টাকা পাঠানো যায়।

ফেসবুক টুইটার কিংবা মেইলে চিঠি বা তথ্যের আদান-প্রদান যত দ্রুত হোক না কেন চিঠির সেই আবেগময়তা যেন আজও ভুলবার নয়। সেই প্রাচীন যুগে যখন রানার চিঠি বহন করে নিয়ে বেড়াত এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত, পায়ে বাঁধা থাকত ঘুঙুর হাতে বল্লম, পিঠে চিঠির বোঝাÑ এ নিয়ে রচিত হয়েছে কবিতা ও গান। ভূপেন হাজারিকা গেয়েছেন সুকান্ত ভট্টাচর্যের কবিতা থেকেÑ

‘রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম

ঘণ্টা বাজছে রাতে

রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,

রানার চলেছে, রানার।

রাত্রির পথে পথে চলে কোন নিষেধ জানে না মানার

কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।’

সুকান্তের অসাধারণ কবিতা কণ্ঠে ধারণ ভূপেন হাজারিকা সেটাকে যেন আরও মোহময় করে তুলেছে। পুরো কবিতাজুড়েই চিঠির গুরুত্ব এবং রানার এর একনিষ্ঠতা তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ যে আবেগ নিয়ে চিঠিটি লিখে তার যথাযথ মর্যাদার সময় মতো পৌঁছে দেয়ার গুরু দায়িত্ব রানার তার মাথায় তুলে নেয়। সে সময়ের চিঠি আদান-প্রদানের প্রতিচ্ছবি এক কবিতার মাধ্যমে অনেক সুচারুরূপে তুলে ধরেছেন কবি।

সাড়া জাগানো কিছু চিঠি

একটা চিঠি মানুষকে যে কতটা ভাবাবেগ করে তুলতে পারে তার প্রমাণ বহন করে বিশ্ব তোলপাড় করা কিছু চিঠি। যা আজও অম্লান। তেমনি কিছু চিঠির উদ্ধৃতি দেয়া হলোÑ

মার্কিন কিংবদন্তি রকস্টার, জিমি হেনড্রিক্স, ছোট্ট দু’লাইনের একটি চিঠি লিখেছিলেন তার ছোট্ট মেয়েকে উদ্দেশ করে-

‘তোমার মধ্যেই সুখ, তোমার হৃদয়ের

প্রকোষ্ঠকে উদার করো এবং একে বাড়তে দাও।’

কতটা মায়াভরা একটা চিঠি হতে পারে তা ছোট্ট দুটি লাইনই বলে দেয়। নিজের রকস্টার জীবন এবং ড্রাপায় এই দুয়ে আটকে গিয়েছিল জিমি হেনড্রিক্সসের জীবন। এর মধ্যে এই চিঠিটি সে সময় বেশ সাড়া জাগিয়েছিল ভক্তদের মনে।

ইংল্যান্ডের রাজা কিং হেনরি তার ভালবাসার মানুষ এ্যানি বোলেয়েনকে ১৫২৭ সালে লিখেছিলেন-

‘আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে

আমাদের মাঝে ছুঁয়ে যাওয়া

ভালবাসা সম্পর্কে তোমার অভিমত’

চিঠিটি রাজার অভিব্যক্তি ছিল এমন যে, অনেক ভালবাসার পরও কোন ক্ষাত রয়েছে কি না? যা তাকে প্রতিনিয়ত বিচলিত করছে। ভালবাসার এমন নজির বিরল। কারণ সত্যিকারের ভালবাসা দেয়ার পরও মনে সংশয় ছিল আদৌ প্রিয়া তার ভালবাসায় সিক্ত কিনা?

নোবেলজয়ী লেখক প্রফেসর আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তার মনের মানুষ ডিস্ট্রিককে ১৯৫১ সালে লিখেছিলেন-

‘আমি তোমায় বোঝাতে পারব না

কিভাবে আমি সর্বদা আমার বাহুবন্ধনে

তোমাকে অনুভব করি।

মনে হয় আমি সব সময় বাড়িতেই আছি।

আমরা সব সময় হাসি আনন্দে

আমাদের সময়গুলোকে পার করেছি।

যা এখন পর্যন্ত আমাকে উদ্দীপ্ত করে।’

লেখক এ কথাগুলো চিঠিতে প্রকাশ করেছেন কারণ তিনি নাকি সামনাসামনি কথাগুলো বললে বেশ লজ্জা অনুভব করতেন। এমনিভাবে ইংরেজ রোমান্টিক কবি জন কীটস তার প্রতিবেশী প্রেমিকা ফ্যানি ব্রাউনকে চিঠি লিখে তার মনের ভাব জানিয়েছিলেন-

‘আমার ভালবাসা আমাকে স্বার্থপর করে তুলেছে।

আমি তোমায় ছাড়তে পারি না।

তোমায় একবার দেখার জন্য

সবকিছু ভুলে যেতে পারি।’

সত্যিই যেন কিছু কিছু আবেগ কথায় প্রকাশ করা যায়। যার মোক্ষম মাধ্যম হচ্ছে চিঠি। সম্প্রতি (১৯৯৪) মার্কিন গায়ক, অভিনেতা ও লেখক জনি ক্যাশের একটি চিঠি বেশ সাড়া জাগিয়েছিল।

সে তার স্ত্রীরী উদ্দেশে লিখেছিলেন-শুভ জন্মদিন প্রিন্সেস,

আমরা বুড়ো হচ্ছি, আবার একে অপরে অভ্যস্ত হয়েও পড়েছি। আমাদের চিন্তাও হয়ে গেছে একই রকম। একে অন্যের মন সহজে পড়তে পাড়ি। জিজ্ঞাসা ছাড়াই জানি অন্যজন কী চাচ্ছে। তবে মাঝে মধ্যে যে আমরা অল্প-স্বল্প ঝগড়াও করি না তা কিন্তু নয়। তোমার মতো একজনকে আমার জীবনে পাওয়ায় আমি সৌভাগ্যবান, এখনও তুমি আমায় মুগ্ধ করো প্রতিনিয়ত। তুমি আমার স্বপ্ন, আমার প্রত্যাশা। এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা শুধু তোমার জন্য। ভালবাসি ভালবাসি অনেক অনেক ভালবাসি।’ চিঠিটি জনি তার স্ত্রী জন কার্টারের ৬৫তম জন্মদিনকে উপলক্ষ করে লিখেছিলেন।

যুগের প্রবহমানতায় চিঠি আজ হারাতে বসলেও এর আবেদন আজও আমাদের নাড়া দিয়ে যায়। এখনও অনেকে সংরক্ষণে রাখা পুরনো চিঠি পড়ে অন্যরকম আনন্দ খুঁজে পান। অনেকটা ওষুধের মতো কাজ করে চিঠিগুলো।

ভার্চুয়াল চিঠি

চিঠি যে এখনও আদান প্রদান হয় না তা কিন্তু নয়। তবে বদলে গেছে এর ধরন। কাগজের খামে চিঠি আসার প্রচলন কমে গেছে। তাছাড়া অফিসিয়াল চিঠি ছাড়া তেমন কোন চিঠি লেনদেন হয় না। চাকরির বিজ্ঞাপন দেয়া থেকে শুরু করে নিয়োগ পর্যন্ত এখন অনলাইনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান প্রার্থীর ব্যক্তিগত ই-মেইলে চাকরির কনফার্মেশন পাঠিয়ে দেয় এবং প্রার্থীও সে অনুযায়ী রেসপন্স করে থাকেন। ব্যাপারটা সময়ের চাহিদা হলেও যুগোপযোগী। কারণ সবার চোখ এখন অনলাইনে থাকে। এছাড়া অতীতে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যে, চিঠি পেতে দেরি হওয়ায় অনেকেই তার কাক্সিক্ষত চাকরি পাননি। নিয়োগদাতা কিংবা প্রার্থীর কোন দোষ না থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এখন সে ঝামেলা অনেকটাই অতীত। এছাড়া মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হয় বৃত্তান্ত। যেন কোনভাবেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে ছেদ না পড়ে। গ্লোবালাইজেশনের যুগে এছাড়া অবশ্য বিকল্পও নেই। একমাত্র আরও উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি এর বিকল্প হতে পারে। আর এ উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। যতই ছেলে ভুলানো গল্প কবিতা লেখা হোক না কেন তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগুতে হবে। পিছিয়ে পড়ার অবকাশ নেই।

চিঠি আজ ইনবক্সে

এক সময়ে চিঠির যে প্রচলন ছিল তা আজও আছে। শুধু পাল্টে গেছে এর প্রেক্ষাপট। এখনও প্রেমিক তার প্রেমিকাকে চিঠি লেখে তবে তা কাগজে নয়, সোশ্যাল নেটওয়ার্কে। ফেসবুক কিংবা টুইটারের ইনবক্সের মাধ্যমে। এর আগে অবশ্য মোবাইল ফোনে এসএমএস বেশ জনপ্রিয় ছিল কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়াতেই তথ্য সবচেয়ে বেশি আদান প্রদান হয়ে থাকে। ফেসবুক ইনবক্সে আজ যত মনের কথার আদান প্রদান হয়ে থাকে। শুধু মনের কথাই নয় প্রয়োজনীয় কথাবার্তাও সেরে ফেলা হচ্ছে ইনবক্সের মাধ্যমে।

ই-ভালবাসা

একটা সময় ছিল যখন মানুষ তার ভালবাসার কথা প্রকাশ করতে সাত-পাঁচ ভাবত। এমন অনেক ঘটনাও ঘটেছে একবার দেখাতেই প্রেম হয়েছে কিন্তু তা কখনই প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। মনের ভালবাসা মনের মধ্যেই চাপা পড়ে যায়। এখনকার ছেলে মেয়েরা ফার্স্ট। একটুও সময় নেয় না মনের কথা বলতে। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয় । দ্রুত একসেপ্ট না হয় রিফিউস। আর এই প্রেমে ব্যর্থ হওয়া এখনকার প্রজন্ম যেন গায়েই মাখে না। ভাবখানা এমন ব্যাপার না, মজার বিষয় হলো এখন প্রেম শুরু হয় ফেসবুক দিয়ো আবার ভাঙ্গেও এটার কারণে। এমন ঘটনাও ঘটছে যে, প্রেমিক-প্রেমিকার কখনও সামনাসামনি দেখাও হয়নি। শুধুমাত্র ফেসবুকে ছবি দেখে পরিচয় আবার বনিবনা না হওয়ায় ফেসবুকেই সম্পর্ক শেষ। বন্ধুত্ব কিংবা ঝগড়াঝাটি হয় ফেসবুকের স্ট্যেটাসে অথবা ছবি পোস্টকে কেন্দ্র করে। উত্তর-প্রতিউত্তর কিংবা প্রতিবাদ সবই হচ্ছে সোশ্যাল সাইটকে ঘিরে।

প্রতিবাদের ভাষা আজ সোশ্যাল সাইটে

দিন যতই যাচ্ছে মানুষ তত বেশি কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এর মাঝেও কিছু কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে যেন মানুষ দাযিত্ব এড়াতে পারে না। তেমনি কিছু ঘটনার সাক্ষী সোশ্যাল মিডিয়া। ছোট্ট দু’লাইনের একটি চিঠি ফেসবুকে পোস্ট করে মিসরের এক কিশোরী আজ বিশ্বখ্যাত। কায়রোতে সরকার পতন আন্দোলনে যখন তুঙ্গে তখন এক কিশোরী তার ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘আমি চললাম তাহরির স্কয়ারের দিকে।’ ছোট্ট এ লাইনটি ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলেছিল সোশ্যাল মিডিয়াতো বটেই পুরো বিশ্বে। দু-এক লাইনের এ চিঠিগুলো আকারে ছোট হলেও তার ঝাঁঝ অনেক বেশি। আর সবই হচ্ছে বর্তমান প্রযুক্তির কল্যাণে। আমাদের দেশের গণজাগরণ মঞ্চও যেন এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

বুস্ট পোস্টিং

চিঠিপত্র এক সময় ডাকঘরে পোস্টে করা হতো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। চিঠি পোস্ট হতো ঠিকই কিন্তু সব চিঠিই যে গন্তব্যে পৌঁছাতো তা কিন্তু নয়। তবে বর্তমান সময়ে তা নিশ্চিত করছে বুস্ট পোস্টিং। অর্থাৎ ব্যাপকভাবে বার্তা পৌঁছে দেয়াকে বুস্ট পোস্টিং বলে। আপনার কোন মূল্যবান বক্তব্য কিংবা ম্যাসেজ বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়াই হচ্ছে বুস্ট পোস্টিং। এর জন্য অবশ্য পয়সা গুনতে হবে। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টাকা জমা দেয়ার পরই ওই ম্যাসেজটি বুস্ট পোস্টিং হয়ে থাকে। অনেকেই বুস্ট পোস্টিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণার কাজ চালিয়ে থাকে। এখন রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এর চাহিদা বাড়ছে। নির্বাচনী প্রচারণা কিংবা বক্তব্য ব্যাপকভাবে পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে বুস্ট পোস্টিং। এই পোস্টিং-এ অবশ্য বার্তা না পৌঁছানোর কোন কারণ নেই। অর্থাৎ নির্দিষ্ট গন্তব্যে বার্তাগুলো পৌঁছবেই।

ইনবক্স মার্কেটিং

সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে মানুষ যতক্ষণ অনলাইনে চোখ রাখছে তার এক তৃতীয়াংশ নাকি টেলিভিশনের পর্দায় রাখছে না। আর কোম্পানিগুলো (যারা পণ্যের প্রচারণা চালায়) হিসাব কষে দর্শক সংখ্যা কোথায় বেশি, সেখানেই তারা তাদের বিজ্ঞাপন প্রচারণা চালিয়ে থাকে। যে কারণে অনেক কোম্পানিই এখন অনলাইনে তাদের বিজ্ঞাপন দিতে বেশি আগ্রহী। ইদানীং ই-মেইল ইনবক্স চেক করলেই দেখা যায় বিভিন্ন কোম্পানির প্রোমোশনাল ম্যাসেজ। এমনকি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান যেমনÑ স্কুল, কলেজ, হাসপাতালগুলোও তাদের মার্কেটিং করছে ইনবক্সে। বড় বড় হাসপাতালগুলো তাদের কাছে সেবা নিতে আসা রোগীর ডাটাতে পর্যায়ক্রমে তাদের সেবার বিভিন্ন মান তুলে ধরে ই-মেইল করে থাকে। এতে করে নিজেদের মার্কেটিং যেমন করা হয় তেমনি সেবার মানগুলোও তুলে ধরা হয়। স্কুল-কলেজগুলো তাদের পারফর্মেন্স এবং ভর্তি বিজ্ঞপ্তি মানুষের পার্সোনাল ই-মেইল একাউন্টে মেইল করে থাকে। এবং এ কাজে সাড়াও মিলছে ব্যাপক। এ যেন সময়োপযোগী মার্কেটিং। অনেকে অবশ্য একে ইনবক্স মার্কেটিং বলে থাকে। কম সময়ে এবং কম খরচের একটি যুৎসই মার্কেটিং। শুধু যে ই-মেইল কেন্দ্রিক মার্কেটিং হচ্ছে তা কিন্তু নয়। ফেসবুক টুইটারের ইনবক্সেও এ মার্কেটিং চলছে সমান তালে।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে অনেক আবেগ হয়ত বিসর্জন দিতে হয়েছে কিন্তু তা তে হয়তো অনেকেরই ভ্রƒক্ষেপ নেই। কারণ তা না হলে পিছিয়ে পড়তে হবে। আর পিছিয়ে পড়া মানুষের ঠাঁই বুঝি এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে নেই। উদার তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে নিজেকে আপডেট রাখতে হবে সময়ের সঙ্গে। তাই পুরনো স্মৃতি হয়তো কিছু সময়ের জন্য প্রেরণা যোগাবে কিন্তু সেটা নিয়ে বসে থাকা যাবে না। নতুনকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি সব সময় রাখতে হবে। ঐতিহ্য থেকে প্রতিনিয়ত শিক্ষা নিতে হবে। এবং তা কাজে লাগাতে হবে। আগেকার সেই চিঠি লেখার ব্যাকুলতা থেকেই হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ার জন্ম। যেখানে আগে কাছের মানুষের বার্তা পাওয়ার আকুলতায় থাকত মন সেখানে আজ দূর দেশের মানুষকে মুহূর্তেই হাজির করে দিচ্ছে। যখন ইচ্ছে তখনই বসে চ্যাটিং করা যাচ্ছে। দিন রাতে যখনই ইচ্ছে তখনই নিজের মনের কথা ইনবক্স করে রেখে দেয়া যাচ্ছে। এবং উত্তরও মিলছে সঙ্গে সঙ্গেই। হয়তো সেই আবেগময়তায় ঘাটতি পড়ছে কিছুটা। কিন্তু মানুষ এখন তাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে এবং এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে জীবন।

নির্বাচিত সংবাদ