২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জমি বিক্রি নিয়ে বিপাকে দাসিয়ারছড়ার ভারতীয়রা

রাজুমোস্তাফিজ, কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া থেকে ফিরে ॥ দাসিয়ারছড়ার কালীরহাট পূর্বহাজিটারী গ্রামের মোঃ সারোয়ার আলম (৫৫) নিজ দেশ ভারতে যাবার নিবন্ধন করেছেন। দু-এক মাসের মধ্যে চলেও যাবেন। বাড়িতে তিনটা গরু, আসবাবপত্র ট্রাঙ্ক, শোকেসসহ নানা সাংসারিক জিনিস রয়েছে। কিছু কিছু জিনিস ইতোমধ্যেই বিক্রি করেছেন। এসব জিনিসের ন্যায্য দাম না পেলেও একেবারে কম দাম পাননি। তবে সবচেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তার এক বিঘা জমি আর ২০ শতক জমির ওপর একটি পুকুর নিয়ে। জমি আর পুকুরের বিক্রির ডাক দিলেও গ্রাহক কম। যদিও বা দু-একজন প্রতিবেশী কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন তবে দাম বলেন বাজার দরের চেয়ে অনেক কম। একদম পানির দর। কি করবেন বুঝতে পারছেন না সারোয়ার আলম। তিনি জানান, এখন এতদিনের প্রতিবেশীরা সুযোগ নিচ্ছে। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি করেন তার মতো যেসব নাগরিক ভারতে যাবে তাদের জমিগুলো সরকার যেন একটা নির্ধারিত মূল্য ধরে বিক্রির ব্যবস্থা করে দেয়। এতে কোন মানুষ প্রতারণার শিকার হবে না এবং ঠকবেও না।

কুড়িগ্রামের ১২টি ছিটমহলের যেসব ভারতীয় নাগরিক তাদের নিজ দেশে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা এখন অস্থির সময় পাড় করছেন। অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলছে তাদের ভবিষ্যত। তাদের জমি জমা আর সাংসারিক জিনিসপত্র বেচাকেনা করে লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ করে হতাশার মাঝে দিন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১১১টি ভারতের ছিটমহলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিটমহল ফুলবাড়ির দাসিয়ারছড়া। শুধু ভারতের নাগরিকরা নয় কুড়িগ্রামের ১২টি ছিটমহলের প্রায় ৮ হাজার মানুষ যারা নতুন নাগরিক হলেন তাদেরও এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটছে জমি নিয়ে। জমির মালিকানার ওপর নির্ভর করছে তাদের ভবিষ্যত। রাষ্ট্রীয় আইনী প্রক্রিয়ায় দলিলপত্র না থাকায় তাদের এ দুশ্চিন্তার কারণ। ভূমির মালিকানা কিভাবে নির্ধারণ করা হবে সরকারীভাবে তা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। শেষ ভাল যার সব ভাল তার কিংবা আল্লাহ যা করে তা মঙ্গলের জন্য এসব যুক্তি দিয়ে মনকে শান্ত করছেন অনেকে।

বুধবার সারাদিন দাসিয়ারছড়ার উচাটারী, খরিয়াটারী, বালাটারী, পূর্বটারী, বানিয়াটারী, কালিরহাট, দোলাটারী, কামারপুর, ছাটকামাত, বড়কামাত, রাসমালা, কেরাটারী গ্রামের পথ থেকে পথে ঘুরে বেড়িয়েছি। জমি জমা নিয়ে কথা হয়েছে অনেক মানুষের সঙ্গে। বোটবাজার গ্রামের ফরিদুল ইসলামরা চার ভাই। এর মধ্যে তিন ভাই যাবেন ভারতে। এক ভাই বাংলাদেশে থেকে যাবেন। তাদের রয়েছে মাত্র চার বিঘা জমি। ফরিদুল জানান, তাদের জমি ভাইসহ বিভিন্নজনের কাছে বিক্রি করতে চাইলে খুব অল্প দাম করছেন। তাই বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। একই গ্রামের মোজাম্মেল হকের আছে ২৯ শতক জমি। তাদের পরিবারের ১৭ জন সদস্য সবাই নিজ দেশ ভারতে চলে যাবেন। ইতোমধ্যে হাটে গিয়ে তাদের গরু, ছাগল বিক্রি করে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমরা গরিব মানুষ ভিটা মাটি এবং জমিটুকু বিক্রি করে যেন ন্যায্যমূল্য পাই। তিনি অভিযোগ করেন, গ্রামের কিছু প্রভাবশালী মানুষ চাপ দেয়া শুরু করেছে স্বল্পদামে যেন তাদের কছে বিক্রি করে দেই জমি আর ভিটে মাটি।

বানিয়াটারী গ্রামের খবির উদ্দিন (৭০) ধান ক্ষেতের পাশে বসে ছিলেন। তার রয়েছে প্রায় ৪৮ বিঘা জমি। এত সম্পত্তি ছেড়ে ভারতে যাবেন না তিনি, বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে নিবন্ধন করেছেন। বর্তমানে খুব দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তার বিশাল এই জমির দলিলপত্র ভারতের ভূমি অফিসে। এগুলোর এখন কি ব্যবস্থা হবে তিনি জানেন না। তিনি সরকারের কাছে অনুরোধ করেন তাদের দলিলপত্রগুলো যেন সঠিকভাবে পান সেই ব্যবস্থা নিতে। একই সমস্যা মহির আলী, জাহিদুল হকসহ অনেক বড় গৃহস্থের।

পূর্ব হাজিটারী গ্রামের আবুল কাশেম গেদা (৫২) তার তিন পুত্র আমিনুল, জাহাঙ্গীর এবং আলমগীরসহ বাড়ির ১৪ জন সদস্য সকলে ভারত যাবার জন্য নিবন্ধন করেছেন। তাদের মাত্র ২১ শতক জমি রয়েছে। এই পরিবারটির প্রতিটি সদস্য ভারতের দিল্লীতে ইটভাঁটিতে কাজ করেন। তারা আগে যাওয়া আসার সময় প্রায়ই বিএসএফের হাতে হয়রানির শিকার হতেন। এখন তারা চিরদিনের মতো চলে যাচ্ছেন।

ভুরুঙ্গামারী কালেমাটি ছিটমহলের আলতাফ হোসেন (৩৫), আশরাফ আলী (৩৭) জানান, তারা পরিবারসহ নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন। এ মুহূর্তে ঘরবাড়ি বিক্রি করবেন না। আত্মীয় স্বজনদের ভিটায় রেখে যাবেন। যেহেতু এক বছর ট্রাভেল পাশের মাধ্যমে যাতায়াত করবেন অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেবেন।

বিলুপ্ত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা জানান, ছিটমহলবাসীর মূল সম্পদ জমি। এই জমির মালিকানা নিয়ে সরকার কি সিদ্ধান্ত নেয় তা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটছে সবার। তাদের জমির মালিকানার মূল হচ্ছে দখল ও সাদা কাগজে বিশেষভাবে তৈরি স্ট্যাম্পে লেখা দলিল। সরকার এ দলিলের বৈধতা দিবে কিনা এবং কিভাবে জমির মালিকানা নির্ধারণ করবে এমন প্রশ্ন তাদের মনে উঁকি মারছে প্রতিনিয়ত।