১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাল্যবিবাহ ॥ বদলে যাচ্ছে চিত্র

  • মাহবুব রেজা

বাল্যবিবাহ সমাজের অভিশাপ। সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে এক সময় বাল্যবিবাহকে মেনে নেয়া হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্রেরও পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমান সময়ে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে মানুষ সচেতন হয়ে উঠেছে। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সমাজও সোচ্চার। তারপরও কতিপয় অবিবেচক, অর্ধশিক্ষিতদের পাল্লায় পড়ে গ্রামেগঞ্জে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটছে। বাল্যবিবাহ রোধে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে যে কেউ বাল্যবিবাহকে স্বীকৃতি দেয়। তবে এক্ষেত্রে সমাজের সিংহভাগই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে।

বাল্যবিবাহ বন্ধে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরও দেশের কোন কোন অঞ্চলে এর ব্যাপক বিস্তার রয়েছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনায় বাল্যবিবাহ একটি সমস্যা। গবেষণায় দেখা যায়, অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের কারণে বাল্যবিবাহ সংঘটিত হচ্ছে। বাল্যবিবাহের কারণে নানা ক্ষতি সাধিত হয়। এর ফলেÑ শুধু শিশু, অল্পবয়সী নারী বা তার পরিবারই আক্রান্ত হয় না। এতে দেশও হয় অপুষ্টি ও দুর্বল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উত্তরাধিকারী।

কম বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে মা যেমন রোগ-শোকে ভুগতে থাকে, তেমনি তার সন্তানও অপুষ্টির শিকার হয়ে অসুস্থতার মধ্যে বেড়ে ওঠে। এতে করে শিশুর সুস্থভাবে বৃদ্ধি যেমন হয় না, তেমনি মাও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটায়। বাল্যবিবাহ মা, সন্তান ও একই সঙ্গে পরিবারকে বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেয়। পক্ষান্তরে বাল্যবিবাহ মা ও শিশুকে ফেলে দেয় ঝুঁকির মধ্যে।

কোন কোন ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের প্রচলন নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। কবে থেকে এর শুরু ও বিস্তার তা সঠিক জানা যায় না। তবে ষোড়শ শতকের অষ্টম দশকেও সমগ্র উপমহাদেশে বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল। ইউরোপের পরিব্রাজকরা তাদের গ্রন্থে এ তথ্য জানায়। ঐতিহাসিক আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’তে তৎকালীন সমাজে বাল্যবিবাহ প্রথার প্রমাণ পাওয়া যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাল্যবিবাহ সম্পর্কে স্ক্রাফটনের বক্তব্যে পাওয়া যায়। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘এই উপমহাদেশের ছেলেমেয়েদের শিশুকালে বিয়ে দেয়া হতো। ১২ বছর বয়সে একজন রমণীর কোলে একটি সন্তানÑ এটা ছিল সাধারণ দৃশ্য।’

একটা সময় ছিল, যখন ৬-৭ বছর বয়সের পর অবিবাহিত নারী ঘরে থাকা মানেই অসম্মানজনক একটি বিষয় হিসেবে মনে করা হতো। অবিবাহিত নারীকে ভিন্ন চোখে দেখা হতো। কখনও কখনও তাকে একঘরে করেও রাখা হতো। অবস্থার পরিবর্তন ঘটে ঊনবিংশ শতাব্দীতে। সে সময় সমাজের উচ্চমহলে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। তারা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। সময়ের আবর্তে সমানতালে এগিয়ে চলছে বাল্যবিবাহ এবং এর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ নিজে থেকে প্রতিবাদও অব্যাহত রেখেছে।

তবে বাল্যবিবাহের ঘটনা আগের চেয়ে কমে এসেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের ওয়ার্ল্ড চিলড্রেনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের ৬৪ শতাংশ নারীর বিয়ে হয়ে যায় ১৮ বছর হওয়ার আগেই। অন্যদিকে ১৫ থেকে ১৯ বছরেই অন্তঃসত্ত্বা কিংবা মা হয় এক-তৃতীয়াংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশে জাতীয় মহিলা আইনজীবী পরিষদের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, সারাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ কিশোর-কিশোরী রয়েছে, যার শতকরা ১৩ দশমিক ৭ ভাগ মেয়ে শিশু। এর মধ্যে ৪৭ ভাগ মেয়ে শিশুর বিয়ে ১৯ বছরের আগেই হয়ে যায়। অন্যদিকে, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০ বছর বা তদুর্ধে নারীদের তুলনায় ১৮ বছরে নিচের প্রসূতিদের মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় ২-৫ গুণ বেশি। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি। তারা মনে করছেন দারিদ্র্যতা যেহেতু মানুষের সব মৌলিক চাহিদাগুলোকে কারারুদ্ধ করে ফেলে, সেহেতু মানুষ তখন প্রয়োজনের কাছে সব আইনকে জলাঞ্জলি দেয়। তাছাড়া শিক্ষার অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষার অপর্যাপ্ততার জন্য বাল্যবিবাহের দৃশ্য সবচেয়ে ভয়াবহ ধরা পড়ে উত্তরাঞ্চলের রংপুর জেলায়। এখনও সেখানে ৫ বছরের বালিকাদের সঙ্গে সত্তর বছরের বৃদ্ধের বিয়ের ঘটনা ঘটে। রংপুরে ৬-৭ বছরের মেয়েদের সঙ্গে এখনও ৬০-৭০ বছরের বৃদ্ধদের বিয়ের ঘটনা ঘটছে। তবে বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামেই নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া জন্ম নিয়েছিলেন।

১৯২৯ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী বাল্যকাল বা নাবালক বয়সে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিয়ে হওয়াকে বোঝায়। এছাড়া বর-কনে দু’জনের বা একজনের বয়স বিয়ের দ্বারা নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম বয়সে বিয়ে হলে, তা আইনত বাল্যবিবাহ বলে চিহ্নিত হবে। এ সংক্রান্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অধিকাংশ স্থানেই বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের কোন যথাযথ প্রয়োগ নেই। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে সব ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে তিন ধরনের বিয়ে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কের বিবাহ; দ্বিতীয়ত, অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ের বিয়ে; তৃতীয়ত অপ্রাপ্তবয়স্ক পাত্রপাত্রীর অভিভাবক কর্তৃক বিবাহ নির্ধারণ বা বিয়েতে সম্মতি দান। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলের বয়স ২১ এবং মেয়ের বয়স ১৮ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই আইন অমান্য করলে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদ- অথবা এক হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় বিধানই হতে পারে।

সময়ের পালাবদলে দিন বদলেছে। পরিস্থিতিও বদলেছে। বাল্যবিবাহের প্রবণতা অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে বাল্যবিবাহ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে। এসব সংবাদে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে সচেতন মানুষেরা বাল্যবিবাহ নিজ উদ্যোগে বন্ধ করে দিচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, একটি স্কুলের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ করে তাদের সহপাঠীর বাল্যবিবাহ বন্ধ করে দিয়ে এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের হাতে তুলে দিয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, গণমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকার জন্য দেশে বাল্যবিবাহ দ্রুত কমে আসছে। তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, বাল্যবিবাহ কবে এদেশ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে? এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণমাধ্যমের পাশাপাশি পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে আরও কঠোরভাবে বিষয়গুলো শিশু ও অভিভাবকদের মধ্যে পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া বাল্যবিবাহ রোধে যে আইন আছে, তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করার ব্যবস্থাও নিতে হবে।