২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নারী উন্নয়নের কত পথ বাকি

  • এলিজা নুসরাত

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার নারীকে দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে সরকারি চাকরিতে মেয়েদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে সকল ক্ষেত্রে নারীর জন্য ১০ ভাগ কোটা সংরক্ষণ করেছিল। তার পর ১৯৭৩ সালে দু’জন নারীকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭৪ সালে একজন নারীকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী, জাতীয় সংসদের স্পীকার নারী। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও রান্না ঘরে নারী যতটা সফল ততটা রাজনীতি, অর্থনীতি বা সংসারনীতি কোন ক্ষেত্রে হতে পারেনি। কন্যাশিশু জন্ম দিলে মায়ের ব্যর্থতা, সন্তান ভাল কিছু অর্জন করতে না পারলে মায়ের ব্যর্থতা, সংসার ভেঙ্গে গেলে দায়ী স্ত্রী, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল অর্থনীতির কারণ নারী নেতৃত্ব ইত্যাদি ইত্যাদি।...

‘শিরীন আখতার (ছদ্ম নাম)। স্ত্রীর চাকরি করা পছন্দ না স্বামীর। তাই মাস্টার্স পাস করে চাকরি করতে চাইলেন না। শুধু সংসার দেখাশোনা করেছেন শিরীন আখতার। শুরুতে ভালই যাচ্ছিল। প্রথম সন্তানটি মেয়ে হওয়ার পর স্বামীর সংসারে কদর কমে গেল অনেকখানি। এমন অবস্থা মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে করতে দ্বিতীয় সন্তান জন্ম গ্রহণ করল, আবারও মেয়ে সন্তান। বাপের বাড়ি ফিরে যেতে হলো শিরীন আখতারকে। বংশ রক্ষা করতে পুত্রসন্তান জন্ম দিতে পারেননি, তাই সংসার করা হলো না তার। দুই মেয়ের মঙ্গলের কথা ভেবে এভাবেই ৩ বছর কাটালেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যে তাও থাকল না, শুরু হলো নতুন যাত্রা। বাবার মৃত্যুতে শেষ আশ্রয়টা আর থাকল না। ভাইদের সংসারেও তার আশ্রয় হলো না বেশি দিন, শুরু হলো আবার বিয়ে দেয়ার চেষ্টা। দুই মেয়ের ঠাঁই হলো অনাথ আশ্রমে, আবার সংসার শুরু করলেন তিনি। জীবনের রং বদলাতে বদলাতে এখন সাদাকালো তার জীবন। স্বামী কষ্ট পাবে। তাই নিজের কষ্টের কোন কথাই বলা হলো না স্বামীকে। এক জীবনে কি পেলেন এটাই নিজের কাছে নিজের জিজ্ঞাসা তার। এখন তার অপেক্ষার পালা, সূর্য ডোবার অপেক্ষা শুধু চোখে।’

এত ব্যর্থতার দায় নিয়ে নারীর জন্য মাথা তুলে দাঁড়ানো খুব কঠিন। কন্যাসন্তান জন্ম দেয়ার দায় পুরুষের ওপর না চাপিয়ে নারীর ওপর চাপানো হয় কারণ নারীর অশিক্ষা, অসচেতনতা কিংবা কোমলতা। নারী ও পুরুষ দুজনেরই যেমন রয়েছে সুশিক্ষার অভাব, তেমনি রয়েছে ধর্মীয় শিক্ষার অভাব।

‘আল্লাহ বলেন, আসমান ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছে কন্যাসন্তান, যাকে ইচ্ছে পুত্রসন্তান দান করেন, অথবা তাদের দান করেন উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছে বন্ধ্যা বানান। তিনি সর্বাধিক জ্ঞানী ও শক্তিশালী (সূরা শূরা -৪৯,৫০)।’

এখনও নারীর কোন অবদান স্বীকার করা হয় না। কারণÑ প্রথমত. নারী নিজে তার ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অধিকারের বিষয়ে সচেতন না। দ্বিতীয়ত. অধিকার আদায় করার জন্য আওয়াজ তোলার শারীরিক বা মানসিক শক্তি একজন নারীর নেই। আর তাই মানসিক শক্তি বাড়ানোর জন্য নারীকে শিক্ষিত হতে হবে। কর্ম ক্ষেত্রে নারী তার নিজ চেষ্টা ও সততার মাধ্যমে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু অশিক্ষা ও স্বল্প শিক্ষিত হওয়ার কারণে অধিকাংশ নারী চাকরি ক্ষেত্রে কাংখিত স্থানটি অর্জন করতে পারছে না। সেইসঙ্গে আছে সমাজের কিছু মানুষের নারীকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা এবং অসহযোগিতা। সরকার, সাধারণ মানুষ ও নারীর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা নারী উন্নয়নের পথকে আরও প্রশস্ত করতে পারে। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, সেই দেশের প্রতিটি নারী সুশিক্ষায় শিক্ষিত হলে তা আমাদের দেশের জন্য অনেক বেশি গর্বের হতো।

সরকার নারী শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান করছে। পঞ্চম শ্রেণী থেকে বাড়িয়ে স্নাতক পর্যন্ত নারীকে শিক্ষিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। সেইসঙ্গে মানবাধিকার ও নারীবিষয়ক আইন সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান ও সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদেরও কিছু ভূমিকা থাকা উচিত। যেমন : গণমাধ্যমে নারীদের প্রতি অবমাননাকর, নেতিবাচক, সনাতনী প্রতিফলন এবং নারীর বিষয়ে সহিংসতা বন্ধের লক্ষ্যে প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।পুরুষ ও যুবকদেরও এ বিষয়ে সম্পৃক্ত করা খুব জরুরী।

নারী ও পুরুষ সমঅধিকার (রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইত্যাদি) বাংলাদেশের সকল নাগরিককে মন থেকে মেনে নিতে হবে।

নারী ও পুরুষের সমান মজুরী; শ্রমবাজারে নারীর সমান অংশগ্রহণ, কর্মস্থলে সমসুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সরকারকে।

নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সকল নির্যাতন দূর করতে হবে। এবং অবশ্যই পিতা-মাতাকে কন্যাশিশুর প্রতি আরও মনোযোগী হতে হবে।