২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নারীর জন্য ভাবনা

  • অনন্যা জহির

অদ্রি সদ্য স্কুল পার হয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। বয়স মাত্র ১৬ কি ১৭ বছর হবে। অদ্রি শব্দটির অর্থ পাহাড় হলেও মেয়েটি মোটেও পাহাড়ের মতো দৃঢ় কিংবা শক্ত নয়। অত্যন্ত নরম স্বভাবের উচ্ছল প্রকৃতির অদ্রি। পারিবারিক দিক থেকে খুবই মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে সে। চার ভাইবোনের ভেতর সে সবার ছোট। বড় তিনটি ভাই থাকায় সে বড় হয়েছে অনেকটাই সঙ্গীহীনভাবে। দশ বছরের স্কুল জীবন শেষে যখন নতুন একটি কলেজে ভর্তি হলো, তখন নতুন ছেলেগুলোর সঙ্গে তেমন একটা মানিয়ে নিতে পারল না। ফলাফলস্বরূপ নিঃসঙ্গতায় ভুগতে থাকল সে।

প্রযুক্তির এই যুগে কেউ বেশি দিন একা থাকে না। অদ্রিও পেয়ে গেল একজনকে। পরিচয় হলো সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটের মাধ্যমে। শুরু হলো কথা, কেটে যেতে থাকল নিঃসঙ্গতা। একদিকে বাড়তে থাকল কৌতূহল, অন্য দিকে ব্যাকুলতা। ছেলেটি নিজের পরিচয়ে বলল সে ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ছেলেটি নিজের আচার-আচরণেও যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিল। অদ্রি তার ওই বয়সের পক্বতা দিয়ে ভেবে নিল, যে ছেলেটি একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্র, যে আচার-আচরণে এত শালীন এবং পরিমার্জিত, সে কখনই খারাপ হতে পারে না। এই ভ্রম নিয়েই শুরু হলো অদ্রির যাত্রা। ছয় মাস ধরে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটের মাধ্যমে কথাবার্তা চালিয়ে গেল। ছেলেটি একটি বারও দেখা করতে চাইল না অদ্রির সঙ্গে। অদ্রি ভাবতে শুরু করল যে, ছেলেটি শুধুই বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলেছে। একটি বারও তার সঙ্গে দেখা করতে চাইল না, সে ছেলেটি খারাপ হতে পারে না কোনভাবেই। ভ্রান্ত ধারণার একটি পর্যায়ে ধূর্ত ছেলেটি দেখা করতে চায় অদ্রির সঙ্গে। মনে দ্বিধা-সংশয়-ভয় থাকলেও রাজি হয়ে যায় অদ্রি, ছেলেটির সঙ্গে দেখা করতে। দেখা হয়, কথা হয়। অদ্রির সামনে আবির্ভূত হয় অতি ভদ্রবেশে। এভাবেই চলত দিনের পর দিন। দীর্ঘ ছয় বছর কেটে যায় এই সম্পর্কের। একটা সময় অদ্রি খেয়াল করে, ছেলেটি কিছু একটা লুকাচ্ছে তার কাছ থেকে। তার কিছু দিন পরেই সে আবিষ্কার করতে পারে, ছেলেটি একই সঙ্গে ২টি সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ছেলেটি মাদকাসক্তও! বিষয়টি জেনে তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। ছেলেটির কাছে বিষয়টি জানতে চাওয়া মাত্রই চেহারা বদলে যায়। রূপ নেয় হায়েনার, শুরু হয় অমানসিক নির্যাতন। এমনকি ব্ল্যাকমেইলও করতে শুরু করে ছেলেটি। অবশেষে সইতে না পেরে অদ্রি আত্মহত্যা করে। এখানেই সমাপ্তি ঘটে অদ্রির কাহিনীর।

সুদিপ্তা হক একজন প্রভাষক। সরকারী একটি কলেজে তিনি কর্মরত। কয়েক বছর আগেই স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেছেন, বনিবনা না হওয়ার দরুন। তার একমাত্র ছেলের নাম অর্জন। আলাদা হয়ে যাওয়ার পর থেকে তার স্বামী আর কোন খোঁজখবরই নেন না তাদের। ছেলেটি এখন স্কুলে যাওয়ার উপযুক্ত। ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করতে গিয়ে যখনই এডমিশন ফর্ম পূরণ করে জমা দিতে যান তখনই ঘটে বিপত্তি। অভিভাবকের নামের জায়গায় পিতার নামের পরিবর্তে তিনি নিজের নাম বসানোয় স্কুল কর্তৃপক্ষ ফর্মটি নিতে অস্বীকৃতি জানায়। সুদিপ্তা স্কুল কর্তৃপক্ষকে পুরো ব্যাপারটি খুলে জানান যে, তার স্বামী থেকে তিনি আলাদা হয়ে গেছেন এবং তার স্বামী আর কোন খোঁজখবরই নেন না। সুতরাং তার স্বামীর কোন অধিকার, অবদান কিংবা যোগ্যতা নেই অভিভাবক হওয়ার। কিন্তু তাতেও আপত্তি জানায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। তারপরও তার স্বামীর নামই লিখতে বলেন অভিভাবকের নামের জায়গায়। তারপর তিনি আর কোন বাক্য ব্যয় না করে ওই স্কুল থেকে চলে আসেন বাচ্চাটিকে ভর্তি না করিয়েই।

সুলতানা আফরিন একজন গৃহিণী। পারিবারিকভাবেই তার বিয়ে হয়েছে সহিদুল ইসলামের সঙ্গে। বিয়ের পরবর্তী কয়েকটা বছর বেশ ভালই কেটেছে। তাদের পরিবারে এসেছে দুটি ফুটফুটে শিশু। একটি শিশুর বয়স ৫ বছর এবং অন্যটির বয়স ৩ । হঠাৎ করেই বছরখানেক আগে সুলতানা পরিবর্তন লক্ষ্য করেন সহিদুল ইসলামের মধ্যে। সহিদুল ইসলাম আর আগের মতো তাকে সময় দিচ্ছেন না। তার কিছু দিনের মাথায় তিনি জানতে পারলেন, তার স্বামী তার বাড়িরই কাজের মহিলার সঙ্গে পরকীয়াতে লিপ্ত। স্বামীকে বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞেস করলে পুরো বিষয়টি প্রথমে তিনি অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেন। বিষয়টি জানতে পেরেও তার কিছুই করার নেই। কারণ বিবাহবিচ্ছেদ হলে তার মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু নেই। একে তো তার তেমন শিক্ষার জোর নেই, তেমনি তার পৈত্রিক পরিবারের অবস্থাও খুব বেশি ভাল নয়। সার্বিক দিক থেকে চিন্তা করে, সবকিছু জেনেও তিনি তার কাজের মহিলাটিকে কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে বিদায় করে দিলেন এবং এখনও তিনি সহিদুলের সঙ্গে সংসার করে যাচ্ছেন।

এখানে আলোচিত প্রতিটি গল্প আমাদের নারী সমাজের দুরবস্থার চিত্র প্রতিফলিত করছে। নারী জাতির এই দুরবস্থা দেখেই প্রখ্যাত লেখক হুমায়ুন আজাদ তার একটি বইতে লিখেছিলেন, ‘গত দু’শত বছরে গবাদিপশুর যতটা উন্নতি ঘটেছে নারীর অবস্থার ততটা উন্নতি হয়নি। একবিংশ শতাব্দী দাঁড়িয়েও বাংলাদেশের নারী সমাজের অবস্থা খুবই নাজুক।’ সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ নারীই কোন না কোনভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত বাড়ছে এই নির্যাতনের সংখ্যা।

বাংলাদেশের নারীর প্রতিহিংসার মূলে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিকতা এবং এ সংক্রান্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। পুরুষতান্ত্রিকতা এই সমাজে নারীদের এখনও দাসত্বের শিকলে আবদ্ধ করে রেখেছে। আমাদের সমাজ নারীদের এখনও পুরুষের সমকক্ষ হিসেবে ভেবে উঠতে পারে না। যার ফলস্বরূপ পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুক, ধর্ষণ, এ্যাসিড নিক্ষেপ, যৌন হয়রানি, অবৈধ সালিশ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন নারীরা। একটি বড় অংশের নারী তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়তে বাধ্য হচ্ছেন। আমাদের দেশের এক-তৃতীয়াংশ নারী স্বামীর ভয়ে বা স্বামী সম্মতি ছাড়া চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করার সুযোগ পান না। মানসিক নির্যাতন ও দূরত্ব, পরকীয়া, অর্থনৈতিক চাহিদা ইত্যাদি কারণে দিন দিন বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা। শুধু নারী হওয়ার কারণেই অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকার পরও অনেকে পাচ্ছেন না অভিভাবকত্বের অধিকার।

শহরের তুলনায় গ্রামে এই সমস্ত নির্যাতনের চিত্র আরও ভয়াবহ। নির্যাতন বা মর্যাদাহানির কারণে নারীরা খুব সহজেই ঝুঁকছেন আত্মহত্যা প্রবণতার দিকে, যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে দিন দিন। এখনই যদি সমস্যার আশু সমাধান না হয়, তবে ভবিষ্যত শুধু অন্ধকারের দিকেই ধাবিত হবে। আলোর দিকে যাবে না কখনও। আমাদের সমাজের প্রতিটা মানুষকেই মনে রাখতে হবেÑ ‘এই পৃথিবীর জন্য যা চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’