২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রেখার প্রাণসত্তায়

  • মো. আক্তারুজ্জামান

রেখাময় প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে যিনি জগৎবিখ্যাত হয়েছেন তিনি আর কেউ নন আমাদের প্রথিতযশা শিল্পী শফিউদ্দীন আহমেদ। চিন্তার রাজ্যে সদা স্বপ্নময় বিচরণ, কিছু কাব্যকথা বা অনুরূপ সৃজনজ্ঞানের নির্ণয়িত সমাধানের অকূলরোধন অথবা চেতনার অপুত রংরেখার স্পাদন নির্ণয়ে শিল্পের পরিশীলিত বিন্যাস প্রকরণ বেশ জটিল। কখনও সুন্দরকে অসুন্দর করে তোলা আবার কখনও অসুন্দরকে সুন্দর করে তোলা; কখনও বা ভাববিনিময়ের জন্য একটি বিষয়ভিত্তিক দৃশ্য শিল্পের রূপ নির্ণয় করা কিন্তু বেশ সহজসাধ্য কাজ নয়। একজন শিল্পী কি করেন আর কেনই বা করেন।

একজন শিল্পী তাই করে থাকেন যা একজন মানুষকে চিন্তার রাজ্যে, ভাবের রাজ্যে আলোড়িত করবে। একটি ছবি আর কিছুই নয়, ছবি হচ্ছে একটি ভাষা যে ভাষার মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়। সদাব্যাপ্তকাল হতে কালান্তরে জীবন থেকে জীবনান্তরে যে ভাষা শুধু সৃজনশীলতার ভিত্তিমূলে জীবনের রসবোধকে উৎসারিত আলোতে অগ্রসর করবে। শিল্পের কাঠামোতে ভাষার একটি নির্দিষ্ট গড়ন এবং চেতনা প্রকাশের নির্দিষ্ট পাঠশৈলী তৈরি করাটাই শিল্পীর কাজ। শিল্প সফিউদ্দীন আহমেদ ঠিক এই কাজটিই করেছেন। বাংলাদেশের শিল্পকলায় তিনি তাঁর নিজস্ব একটি প্রকাশভঙ্গি বা শৈলী তৈরি করেছেন। চিরচেনা কিছু জীবকুলের নানা অনুষঙ্গ শিল্পীর নিজস্ব কর্মের আওতায় নিয়ে এসে উপস্থাপন করেছেন।

শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ জীবদ্দশায় নিভৃতচারী শিল্পী ছিলেন। ছবির সাথেই ছিল তাঁর বসবাস। ক্যানভাস নিয়ে তিনি প্রতিমুহূর্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। রেখাতেই দুঃখ আবার রেখাতেই আনন্দ অনুভব করতেন। ছবিতে রেখার অসংখ্য ভাববিনিময়ে মনের দরজা-জানালা সব খুলে যেত; যেন এক কল্পসিন্ধুর রাজ্যে সুন্দরের চিন্তায় স্বপ্রাণ আবেগ বারংবার উছলিয়ে যায়।

রেখাতে কাব্য নয়, ছিল জীবনাচার, ছিল সমাজবাস্তবতা, জীবনবোধ এবং সৌন্দর্য চিন্তা। রঙের মোহবিন্যাস তিনি কখনই করেননি। রংকে সব সময় তিনি কাঠামোর মধ্যে রেখেছেন আর ছড়িয়ে দিয়েছেন রেখা। শিল্পীর আঁকা চিত্রকর্মে আমি একটি বিষয় বেশ আত্মস্থ করেছি তা হচ্ছে : স্থানিক চিন্তার আলোকে অসীমতার দিকে ধ্যানস্থ হয়েছেন আর অনুষঙ্গ হিসেবে বেছে নিয়েছেন রেখাকে। রেখা দিয়ে নির্দিষ্টতা থেকে কিছু অনির্দিষ্টতা তিনি আরোপ করে রেখেছেন। শিল্পী বার বার ধ্যানস্থ হয়েছেন চিত্রের রাগ সাধনায় আর নীরিক্ষারত থেকেছেন রেখার উপর্যুপরি বিন্যাসে।

শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের চিত্রকর্ম দেখলে মনে হয় তিনি যেন আত্মার টানে রেখাবন্ধনী নির্মাণ করেন। তাঁর চিত্রকর্মে রেখার প্রবাহটা বড় বেশি প্রাসঙ্গিক আর বিষয়ের ভাববিন্যাসে রঙের প্রবাহ যেন রেখার তাৎপর্য নির্ণয়েই ব্যবহৃত।

শিল্পী বিষয়ের সাজুয্যতায় যেন কিছু একটা নিবেদন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বার বার। বিষয়ের চিত্রায়নে বেশ বহুমুখী বিন্যাসের আশ্রয় নিয়েছেন শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ। তাঁর চিত্রের যেন বার বার কাব্যরসের বোধন ক্রিয়াসম্পন্ন হয় আর উপচিয়ে পড়ে যেন শিল্পরসের জ্ঞান।

শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদের চিন্তার রাজ্যে সব সময় ছবির বিষয় ও আঙ্গিক খেলা করত। কেমন হবে রেখার গতি, রঙের আচ্ছন্নতায় কতটা অনুভূতি ছন্দাসিক্ত হবে তা শিল্পী বিবেচনায় রাখতেন।

বাংলার রূপ রস সৌন্দর্য শিল্পী মন ভরে পরখ করেছেন। তাঁর ছবিতে মাছ, পাখি, নদী, গাছ আর জেলেদের নানা দৃশ্যকথা উপলব্ধিজাত হয়েছে। কখনও দর্শক থেকে পাঠক, কখনও পাঠক থেকে সমালোচক, আবার কখনও শিল্পী হয়েও শিক্ষার্থীর মতো নিজের ছবির পাঠ নিয়েছেন নিজের মতো করেই বার বার। নিজস্ব মোটিভ আকারে তিনি প্রকৃতির নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরেছেন। তিনি নীরিক্ষা করেছেন মোটিভ নিয়ে। এক অদ্ভুত জাগরণ তার ছবির ভাষায়। এক অদ্ভুত স্বপ্ন খুঁজে বেরিয়েছেন রং রেখার আবরণে। সামাজিক জীবন কাঠামো খুব যতœ সহকারে তিনি তাঁর পাঠ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। মানুষ এবং মানুষের নানা কর্মকা-ের প্রতিচ্ছবি শিল্পী ধারণ করেছেন।

কাঠখোদাই চিত্রে সাদাকালো রঙে আলো-ছায়ার পুঙ্খানুপুঙ্খ উপস্থিতি তিনি নিশ্চিত করেছেন। কাঠখোদাই ছবিগুলো সবই খোদিত অংশের ছাপ। কিছু কাঠখোদাই চিত্র রিলিফ পদ্ধতির। সাদাকালো ছাপাই ছবিতে তিনি আলো-ছায়ার উপস্থিতির সঙ্গে বিষয়ের বাস্তবানুগ অবয়ব উপস্থাপন নিশ্চিত করেন।

তাঁর কাঠখোদাই চিত্র ‘সাওতাল রমণী ও শিশু’ ছবির বিষয় অতিচেনা। ফসলের ঝাঁকা মাথায় মাঠের উপর অবস্থান করছেন চারজন রমণী, দুজনের আঁচল টেনে আছে দুটি শিশু। দূরের ফর্সা আকাশের বুকে সূক্ষ্ম গতিশীল রেখা। মাঠের জমির ফসল বোঝাতে সূক্ষ্ম রেখা বার বার ব্যবহার করে ছবির জমিনে মানবীয় অবয়ব স্পষ্ট করে তুলেছেন।

‘মেলার পথে’ কাঠ কেটে সাদাকালো রেখার মাধ্যমে এক চিরচেনা পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। গাছ, গাছের পাতা, জমিন, মানুষ, ঘোড়া, কুকুর সবই রচনা করেছেন নানা ধরনের রৈখিক তক্ষণ দিয়ে। রেখার মাধ্যমে বিন্দু বিন্দু আলো ফেলে এক আশ্চর্য অনুভূমির সৃষ্টি করেছেন পুরো চিত্রজুড়ে।

‘মাছ ধরার হলুদ জাল’ শিরোনামের ছবিটি আড়াআড়ি কালো রঙের রেখায় ছুটে চলা দর্শকদের কাছে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। ‘স্মৃতি ৭১’ কাজটিতে কালো রেখায় ক্রন্দনরত মুখের মাঝে অশ্রুসজল চোখের উপস্থিতি আমাদের একাত্তরের স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। ছাপচিত্র ছিল তার মূল বিষয়, তাই তিনি ছাপচিত্রের প্রয়োগ করা রেখা ও বর্ণ অন্য মাধ্যমেও সমানভাবে ব্যবহার করেছেন। ছাপচিত্রের পাশাপাশি তিনি তেলরং, জলরং, রেখাচিত্রে সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

অদৃশ্য অবয়ব নির্ণয়ে শিল্পী বহুবার রেখার পরিপ্রেক্ষিত এবং বিন্যাস নিয়ে কাজ করেছেন। হয়তো এ কারণেই তাঁর আঁকা চিত্রে রেখার প্রবাহটা কখনও তির্যক, কখনও উল্লম্ব, কখনও আনুভূমিক সব মিলিয়ে বহু কৌণিক।