২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কবিতার কথা

  • জেমস্ টেইট;###;অনুবাদ : রেজা নুর

জেমস টেইট (ঔধসবং ঞধঃব) এর জন্ম আমেরিকার মিজৌরী স্টেইটের ক্যানসাস সিটিতে ১৯৪৩ সালে। কবিতার সংকলন ১২টি। প্রথম কবিতাগ্রন্থ, ‘দি লস্ট পাইলট’ (১৯৬৬) এর জন্য ‘ইয়েল ইয়োংগার পোয়েটস্ প্রাইজ’ লাভ করেন। ‘সিলেকটেড পোয়েমস’্-এর জন্য পুলিটজার পুরস্কার পান ১৯৯১ সালে। ‘ওরশিপফুল কমপ্যানি অব ফ্লিচ্যারস্’ জাতীয় গ্রন্থ পুরস্কারে ভূষিত হয় ১৯৯৪-এ। অন্যান্য সংকলনগুলো হলো: ঈড়হংঃধহঃ উবভবহফবৎ ; জবপশড়হবৎ ; উরংঃধহপব ভৎড়স খড়াবফ ঙহবং ; এবং গবসড়রৎ ড়ভ ঃযব ঐধশি ।

জেমসের কবিতা মূলত প্রশান্তি ও উদ্দীপনার। দীর্ঘ ৪ দশকেরও অধিক সময় ধরে আমেরিকার সাহিত্য জগতে বিচিত্র বিষয়ে তাঁর পদচারণা। ছোটগল্পেও তিনি সমান গতিমান। গল্পগ্রন্থ : ঋড়ৎঃু ঋরাব ঝঃড়ৎরবং। উপন্যাস: খঁপশু উধৎৎুষ। তিনি ‘একাডেমি অব অ্যামেরিকান পোয়েটস্’-এর চ্যান্সেলর। কবিতা পড়িয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কেলী বিশ্ববিদ্যালয়, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও এমারসন কলেজে। ১৯৭১ সাল থেকে শিক্ষকতা করছেন ম্যাসাচুসেটস্ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বসবাস করেন অ্যামহারস্ট-এ।]

পছন্দ হোক আর না হোক, আমরা সময়ের অংশ। আমরা কালের ভাষায় কথা বলি। কবিদের জন্য এটা সম্ভবত আরও অনুভূত, আরও অলংকৃত অথবা এক বিন্দুতে স্থিত; কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো না কোনোভাবে আমাদের সংস্কৃতির প্রতিবিম্ব। উদাহরণস্বরূপ, আমি অত্যন্ত তরুণ হিসেবে মুক্ত বোধ করেছিলাম যখন উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস্ পড়ি ও অনুভব করি যে আমি অ্যালগারনন সুইনাবার্গের মতো লেখার প্রয়াস থামাতে পারি।

জানি, আমি একা নই, যখন বলি যে, দিনের পর দিন কয়েক ঘণ্টা ধরে একটি শূন্য কাগজ নিয়ে শুরু করছি। কেন? কারণ আমি একটি নতুন জায়গায় বিচরণ করতে চাই। নতুন ভাষাভঙ্গি শুধু চাই না, নতুন একটি ধারণাও চাই। সমগ্র বিশ্বকে নতুন করে দেখতে চাই। আমরা জানি, সেটা অসম্ভব। কিন্তু আকাক্সক্ষা তো যুক্তি মানে না। যা হোক, আমরা জানি, কলম্বাস আমেরিকার জন্য সমুদ্রযাত্রা করেননি। কিন্তু তিনি যা পেয়েছিলেন তা নিতান্ত মন্দ নয়। কিছুটা শংকিত উঁকিতে নিকট-ভবিষ্যত দেখে নিয়ে আমরা যা জানতে পারি, এ মুহূর্তে সেদিকে একটু অভিনিবেশ করা যাক। একটি পূর্ণাঙ্গ কবিতার অভিব্যক্তিতে যখন আমি কল্পনার ভুলে পড়ে যাই, তখন দ্রুত তা ধ্বংস করতে সচেষ্ট হই। আবিষ্কারকর্মকে কোনো কিছুই স্থানচ্যুত করতে পারে না।

কবিতা হলো বায়নাপ্রিয় এক সুন্দর পোষাপ্রাণী। সে বলে, ‘আমি এটা চাই না, ওটা চাই না। আমার এখন ওটার চেয়ে এটারই বেশি প্রয়োজন; কিন্তু ওগুলোর একটাও চাই না’, ইত্যাদি ইত্যাদি। সংশোধনক্ষম পদক্ষেপ। সত্য এবং সৌন্দর্য, দুটোই চেয়ে নিয়ে সৌন্দর্যের ভাষায় সত্যের পেছনে ছুটে চলে কবিতা। কিছু কবিতা অত্যন্ত নিভৃতে কাজ করতে চায়। ঘরের কোণের নিঃসঙ্গ মাকড়সার মতো। অন্যগুলো বেশ কোলাহলময়, একে অপরের বিরুদ্ধে যেন টিনে-বন্দি উচ্চ-নিনাদী শব্দপুঞ্জ। এক ধরনের কবিতা এমনিতেই অন্যগুলোর চেয়ে ভালো নয়। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বছরের পর বছর, আশ্চর্যজনক, দুর্বোধ্য, নিগূঢ়, হাস্যরসাত্মক ও দুঃখময় নতুন কবিতা লেখা হচ্ছে ও প্রকাশিত হয়েছে। কবিতা সম্পর্কে আমরা আগে ভাবতে পারতাম না, এর প্রয়োজন এখন আমরা বুঝি। কবিতার প্রয়োজনের কোনো শেষ নেই। কবিতা ছাড়া আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের মনন জীর্ণতা ও খেয়ালিপনায় পর্যবসিত হবে।

আমাদের জীবনের প্রতিদিনকার রুটিন ভাল হতে পারে, এমনি চমৎকারও। কিন্তু এখনও আমাদের মধ্যে গভীর জলের রহস্যের ক্ষুধা আছে এবং কবিতা সেই ক্ষুধা মেটাতে পারে। এটা এমন স্থানকে নিয়ে কথা বলে যা এখনও অসম্পূর্ণ মনে হয় ও আমাদের এই আশ্বাস দিতে পারে যে, আমরা ক্ষিপ্ত কিংবা একা নই এবং তা হলো এক বিস্তৃত রীতির মতো। কবিতার কাছ থেকে আমরা যা চাই তা হলো সচল হওয়া। যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে সেখান থেকে এগিয়ে যাওয়া। আমরা শুধুমাত্র আমাদের ধারণা বা আবেগের সুদৃঢ় রূপটাই চাই না। যদি আমরা তা চাই, তাহলে এরপর অপেক্ষাকৃত গৌণ বা হীনতর কবিতার দিকে ঝুঁকে পড়ি, যে কবিতাগুলো বলে, বাচ্চাদের হত্যা করা খারাপ, বৃষ্টিদায়ক বনভূমি কেটে ফেলা খারাপ, মরে যাওয়া মন্দ। একজন ভালো কবি ওইসব অনুভূতির সাথে একমত হবেন কিন্তু সেগুলো পেরিয়ে একটি বোধের জন্য সচেষ্ট হবেন। সাজানো কথামালার প্রান্তে কিংবা রূপক সৃষ্টিতে যা বিপজ্জনক ধারণার ইঙ্গিত দেয় অথবা অন্য পদ্ধতির যে কোনো একটিতে কবি তাঁর আবিষ্কারের আঙিনায় পৌঁছান। মূলকথা হলো, ভাষা গোলমেলে হতে পারে, পৃথিবীতে আমাদের প্রারম্ভিক বোধশক্তির মতো। যখন ভাষা তীর্যক, পৃথিবী তখন ভিন্নভাবে পরিদৃষ্ট হয়। কিন্তু তা তখনই ফলপ্রসূ হয় যখন এই ধারণাকে বুঝতে পারা যায়, এমনকি যদি এটি তার প্রথম অভিজ্ঞতাও হয়ে থাকে।

আপনি যখন বিশেষ পছন্দের একটি কবিতা পড়তে মনস্থির করেন, তখন কী হয়! যা সেই কবিতাকে পৃথক করে দেয় অন্য অনেক কবিতা থেকে তা হলো এর অন্তর্দৃষ্টি এবং এই ‘অন্তর্দৃষ্টি’ শব্দটার জন্যে আমি আনন্দের সাথে উন্নততর শব্দ, ঐশী প্রেরণা সহজাত সাবলীল উপস্থিতিকে প্রতিস্থাপন করতে পারি। রচনাশৈলী এবং উচ্চারণভঙ্গি পাঠক বা শ্রোতা আকর্ষণের উপায় হিসেবে উপযোগী। এগুলো, কৃপা প্রার্থনার একটি অনুষ্ঠান বিশেষ। তারা যথার্থ স্বরভঙ্গি সৃষ্টিতে সহায়তা করে এবং সম্ভাব্যতা বিন্যাস করে যার মাধ্যমে সম্ভবত ঐশী প্রেরণার উদ্ভব হতে পারে। বলেছি, ‘সম্ভবত’, কারণ এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। একজন কবি শুধু এর জন্য আশা পোষণ করতে পারেন। কবিতা লেখার কাজটি হলো, অজানার অনুসন্ধান। প্রতিটি লিখিত পঙক্তি হলো, পরবর্তী পঙক্তির খোঁজ। যেমনÑ ওজন, দৈর্ঘ্য এগুলো কবিতায় অধিকতর বৃদ্ধিও, তেমনি ঐশী প্রেরণা লাভের জন্য চাপ-বৃদ্ধিও বটে। প্রতিটি উপমা ও ধারণাকে অন্য এক উপমা ও ধারণার পথনির্দেশ করা উচিত এবং এদের প্রত্যেকেই আরও উৎকর্ষের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয় যদি কবিতাটি সর্বোচ্চ সম্ভাবনা স্পর্শ করতে চায়। প্রতিটি কবিতা ঐশী প্রেরণার গুরুত্ব বা বিশালতা নির্দেশ করে থাকে। একটি চূড়ান্ত ক্ষুদ্র অন্তর্দৃষ্টি সন্তোষজনক হতে পারে। সাধারণভাবে পাঠককে একটি বিষয় অথবা পরিচিত অভিজ্ঞতা দেখার একটি নতুন পথের প্রস্তাবনাই অন্তর্দৃষ্টিকে বৈশিষ্ট্যম-িত করে। চার্লস সিমিক, ‘র্ফক’ (কাটাচামচ) নামক একটি কবিতা এভাবে শুরু করেছেন:

“এই অদ্ভুত জিনিস হামাগুড়ি দিয়েছে নিশ্চয়ই

দোযখের দরোজা থেকে।

পাখির পায়ের সাথে মিল আছে এর

ঝুলে আছে নরখাদকের গলার চারদিকে।”

আমরা একটি উদ্দীপ্তকর, নতুন অর্জিত বিশ্বে অবস্থান করছি কিন্তু তবু এমন একটি স্থানে আমরা রয়েছি যেখানে পাঠকরা সহজেই আমাদের দেখতে পান।

এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যখন অভিদ (ঙারফ), অথবা জন ক্লেয়ার (ঔড়যহ ঈষধৎব) অথবা এডনা সেন্ট ভিনসেন্ট মিলে (ঊফহধ ঝঃ. ঠরহপবহঃ গরষষধু) অথবা জন অ্যাশবেরী (ঔড়যহ অংযনবৎু) পড়া হয় তখন মানবজাতির কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় না। তাদের অবস্থা, তাদের জীবন-প্রত্যাশা এবং তাদের ভাষা পরিবর্তিত হয়, কিন্তু আবেগ নয়। তাদের আনন্দ, তাদের অন্তর-বেদনা, তাদের দুঃখ, তাদের ঈর্ষা ইত্যাদি লক্ষণীয়ভাবে একইরকম দু’হাজার বছর আগে যেমনটি ছিল। এখনও কবিরা আমাদের অবস্থায়, রহস্যময় প্রতিবেশে প্রবেশ করা ও এভাবে ভাষার প্রাণচঞ্চলতা নিয়ে আসতে নিরলস প্রয়াসী। কবিতা লেখা হলো একটি অনুপ্রস্থ প্রতিবন্ধক অথবা বিহ্বলতার চুক্তির মতো। অথবা পর্বতের উতরাই বরাবর পিচ্ছিল তুষারের ওপরে চলা। আমরা নিজেদের বলি, উত্তেজনার উদ্দেশ্যে, অগ্র-অতীতের ঊর্ধ্বে, যে আমাদের পছন্দগুলো মারাত্মক প্রমাণিত হতে পারে, যা কিছু আমাদের পেতে সাহায্য করে, সেখানে আমরা অবশ্যই যাই, যেখানেই সেই ছাইভস্ম থাকুক না কেন। যখন কবিরা সত্যিকার অর্থে কাজ করেন, সূত্রায়ন হচ্ছে চূড়ান্ত জিনিস যার জন্য তারা সময় সঞ্চিত রাখেন। একবার কবিতাটি সাড়া জাগায় ও মনে মনে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিচ্ছে কোথাও। কবি এর উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য খুব সামান্য কিছু করে থাকেন। এবং অবশ্যই এটা সবসময় সহজ ও স্বাভাবিক প্রতীয়মান হয়।

কিছু সুন্দর কবিতা এক-বসাতেই লেখা হয়ে যায়। অন্যগুলো এক বছর কিংবা তারও বেশি সময় নেয়। সেটা কোনো ব্যাপার বলে মনে হয় না। যেমন ব্যাপার নয় ওষ্ঠরঞ্জন (লিপস্টিক) দিয়ে সেগুলো লেখা হলে শূকরের পিঠের প্রান্তে। তেমন কোনো ব্যাপার নয়, যদি তারা লিখিত হয় ফ্লানড্যার্সেও সামান্য মুদ্রাকে নিয়ে অথবা পৃথিবীর সমাপ্তি সম্পর্কে। কিন্তু এদের মধ্যে একটি জিনিসই ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তা হলো, কবিতার সমস্ত অংশ এবং উপকরণগুলোর একে অপরের মধ্যে সম্পর্ক রচনা করা। সবকিছুই কি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে? বাইরের কিছু কি আছে? অথবা এক ধরনের আপাত শিথিলতা, তা কি বৃহত্তর কোনো উদ্দেশ্য দ্বারা বিচার্য হতে পারে? কেন আপনি ভালো কিছু গদ্যকে বেছে নেন না, পঙক্তিতে ভেঙে, একে কবিতা বলে অভিহিত করেন না? যেখানে অধিকাংশ গদ্য এক ধরনের ক্রমাগত বকবকানি, বর্ণনা, নামকরণ, বিস্তৃতকরণ, সেখানে কবিতা নীরবতার অবশ্যম্ভাবী পৃষ্ঠবিন্দুর বিরুদ্ধে কথা বলে। এটা প্রায় একেবারে কথা বলতে চায় না, এ জেনেই যে, এর অভিপ্রায়ের মর্মমূলে যা রয়েছে তার নাম দেয়া কখনই সম্ভব নয়। শব্দরাজির মধ্যে, শব্দগুচ্ছের মধ্যে, উপমা, ভাব-কল্পনা এবং পঙক্তিগুলোর মধ্যে প্রার্থনাপূর্ণ, নিরবচ্ছিন্ন নীরবতা বিরাজমান। ভালো কবিতা কেন বার বার পঠিত হয়, এ হলো তার একটি কারণ। পাঠকরা সম্ভবত এটা না জেনেই সহজভাবেই অন্য জগতের ফাটলের মধ্যে উঁকি দিতে ইচ্ছে করেন, যেখানে অব্যক্ত অন্ধকারের বসবাস।

শুভাকাক্সক্ষী বন্ধু ও সহকর্মীরা সবসময় আমাকে কবিতার ধারণা দিতে থাকেন, তাঁদের দেখা অদ্ভুত দৃশ্য অথবা হাস্যকর ধারণা যেগুলো তারা নিজেরাই তৈরি করেছেন। ধন্যবাদহীন জীব এই যে আমি, কখনই ওইসব দানের সুবিধা নিতে প্রলুব্ধ হইনি এবং যখন বয়সে তরুণ ছিলাম, আমার ধারণা ছিল যে, যদি কবি হিসেবে এইসবে মনোযোগী হতে যাই, আমার বরং বেরিয়ে পড়া উচিত পৃথিবীময় এবং বিশাল দুঃসাহসিক অভিযাত্রায়, যেন সে-সম্পর্কে আমি কিছু লিখতে পারি। আমি বের হয়েছিলাম দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় ও পেয়েছিলামও অজস্র। দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, তাদের একটিও কবিতায় পরিণত হবার পথ পায়নি, এমনকি সামান্য পরিমাণেও নয়, এবং তাই আজ একটি সুনির্দিষ্ট কবিতার পাখি অধিকতর সাবলীলতায় কবিতায় রূপ নেয়, আমার নিজের চোখে দেখা ধ্বংসপ্রাপ্ত রেলের বিষয়টির চেয়েও। বিনাশপ্রাপ্ত রেলটি কি তার নিজের কথা বলে, ঘোষণা করে এর মর্মান্তিকতা স্বচ্ছভাবে, পক্ষান্তরে পাখিটি কুশলী ও সহস্র সম্ভাব্য নির্দেশনা জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। যা বলতে প্রয়াস পাচ্ছি তা হলো, কীভাবে একজন কবি তাঁর বিষয়বস্তুতে পৌঁছাতে পারেন। প্রথমত, এটা আসলে পৌঁছে না। দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ কবিই আপনাকে বলবে যে ‘বিষয়বস্তু’ শব্দটি উপযুক্ত নয় কবিতার আলোচনার সময়। কবিতার সমস্ত উপাদানই কবিতা তৈরি করে ও তারাই কবিতা। আপনি বিষয়বস্তু থেকে তাদের মুক্ত করতে পারেন না, যদি না, আপনি সত্যিকার অর্থে বিশ্বাস করেন যে, পোশাকের কারণেই মানুষকে মানুষ দেখায়।

আমার ক্ষেত্রে, একটি কবিতা সবচেয়ে প্রাথমিক স্তরে সম্ভবত শুরু হতে পারে এর অনুভূতির গঠন দ্বারা। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা এলোমেলো জিজ্ঞাসু হেঁটে বেড়াই, জানতে এই গঠনটি কী কিংবা যদি একটি বা দুটি শব্দ পেয়ে যাই যা এর জন্য অনুমেয় সত্তার সাথে মেলে। স্বীকার করতেই হবে, কবিতা শুরুর ক্ষেত্রে এটা অত্যন্ত ধীর পথ, কিন্তু তা এমন একটা পথ যা আমাকে টেনে নিয়ে গেছে। এমন পথ যা খুলে দিয়েছে দরোজার পর দরোজা, যা অন্যভাবে উপেক্ষিত হতে পারতো। কিন্তু এই একটি বা দুটি শব্দমালা তারপর আরও কিছু পথ দেখিয়ে দেবে, যতক্ষণ না পরিণামে ভাব ও উপমা অঝোরে ঝরে পড়ে বা প্লাবিত হয়। যখন কেউ ভাষার ব্যাপারে চূড়ান্ত-রকম সতর্ক, তারপর প্রায় সবকিছুই কবিতার অন্তর্গত হতে প্রার্থনা করে, শব্দমালা যা শোনা হয় সাবওয়েতে (রেলপথে), অথবা কোনো সুপারমার্কেটে, সংবাদপত্রের শিরোনামে, শিশুর স্কুলের পাঠ্যবই হাওয়ার দুর্বিপাকে পথে লুটিয়ে পড়ায়। এটা হলো সবচেয়ে উত্তেজনাকর অবস্থা কবিতায় প্রবেশের জন্য। সাধরণ স্থানের শব্দগুলো হঠাৎ হঠাৎ বেশ রহস্যময় ও সুন্দর মনে হয়। কেউ যদি একটি শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে, ‘শিশু খামার’, তাহলে আপনার মস্তিষ্ক আনন্দে পাক থেকে শুরু করে। ‘কুঞ্চিত পাতাকপি’, ‘শোভন-দন্ত চিরুনি’, ‘টহলদার ওয়াগন’ এটা ধরার মধ্যে নয় এগুলো কতটা বৈষয়িক যখন কবি তাঁর আয়ত্তের বাইরে গিয়ে ভাষা খুঁজে বেড়াচ্ছেন, প্রশ্নের অবতারণা করছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। কবি সেই সাধারণ স্থানের ভাষার টুকরোটি গ্রহণ করবেন ও তাকে ‘নতুন করে তৈরি করবেন’।

আমার অভিজ্ঞতায় কবিরা অন্য সবার চেয়ে আলাদা নন। আপনার মধ্যে রয়েছে আপনার স্থূলবুদ্ধিতা, আপনার উন্মাদনা, আপনার মৃদু খামখেয়ালিপনা ইত্যাদি। শুধু এটি ছাড়া তারা আর যে কাজটি করেন তা হলো, কবিতা লেখা এবং এর মধ্যেই তারা এককভাবে দূরবর্তী।

তারা একজন শ্রোতাকে নিয়েই সমাপ্তি টানতে পারেন এবং একটা শ্রেণীর অনুসরণ করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের কবিতা লেখেন নানা ধরনের আবিষ্টতা দিয়ে, অধিকাংশই তাদের নিজের জন্য, যে আনন্দ ও সন্তুষ্টি এটা দেয় সেজন্য এবং ক্ষুধা ও অভাব অন্য কোনো কিছুই একে কমাতে পারে না। তারপর যদি সুযোগ দেয়া হয়, অধিকাংশই খুশি হবেন তাঁদের শেষকৃত কাজ প্রকাশ করতে পেরে এবং একইভাবে যদি সুযোগ দেয়া হয়, তাঁরা খুশি হবেন, তাঁদের কবিতা জনসমক্ষে পাঠ করতে পেরে ও আসন্ন করতালি সানন্দে গ্রহণ করে। সেই মুহূর্তের জন্য মনে হয় যে, কবি তার বিচক্ষণতার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। তিনি এই কবিতাগুলো লেখেন এ ধরনের শ্রোতা মনে রেখে। সেই মুহূর্তে এমনকি কবি তা বিশ্বাসও করে বসতে পারেন। কিন্তু সৌভাগ্যজনকভাবে এটা সত্যি নয়। আমি বলেছি, ‘সৌভাগ্যজনকভাবে’ কারণ এটা সত্য হলে কবিতা শুধুমাত্র মনোরঞ্জনের উপায় হয়ে উঠবে। এটা ছিল সংক্ষেপিত কারণ। কবি তার কবিতা লিখেছেন নির্জনে নিজের জন্যে, অনিরীক্ষ ক্ষুধার পরিতৃপ্তি ও অন্য কোনো অবহেলিত দৃশ্যাবলীর সর্বোচ্চ মানকে সন্তুষ্ট করা যে কবিতা, অদুর্নীতিমূলক ও সম্ভবত সেই বিষয়গুলোর কথা বলে যা অনেকের দৈনন্দিন জীবনে না-বলা থেকে যায়। তাই যখন লোকেরা এই কবিতা শোনেন কিংবা পড়েন সম্ভবত, শুধু সম্ভবত; সাগ্রহে সাড়া দেন এবং অন্তর দিয়ে শোনেন অথবা পড়েন, যা তারা নিজেরা কখনই উচ্চারণ করতে সমর্থ হন না; কিন্তু এখন সন্দেহ অমূলক নয়। আমার সন্দেহ, যদি কবি তার শ্রোতাদের অমূলক মধ্যস্থতা করেন তবে তারা বেশি কিছু নতুন কথা শুনতে পাবেন না। মনে হয়, আমরা গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্বোধ্য কবিতার প্রতি সমানভাবে কৃতজ্ঞ যেমনটা আনন্দদায়ক কবিতার ক্ষেত্রেও।