২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্মৃতিতে জ্যোতির্ময় কবি

  • মূল : অনন্যা বাজপেয়ী;###;অনুবাদ : এনামুল হক

এ বছরের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে আমি লাহোর সাহিত্য উৎসবে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। সেখানে আমি আমার সাহিত্যকর্মের ওপর দু’চার কথা বলেছি। সাহিত্য সভায় উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে এমন লোকজনের অভাব ছিল না যারা মনোযোগ আকর্ষণ বা কৌতূহল জাগ্রত করেন। তাছাড়া আলাপ পরিচয় হওয়ার মতো লোকজনও অনেক ছিলেন। সভায় অংশগ্রহণকারী অনেকের মতো আমিও আমার প্রথম সফরে আসা এই নগরীকে দেখতে আগ্রহী ছিলাম। আমার মায়ের পরিবার ছিল পশ্চিম পাঞ্জাবের ধনাঢ্য শিখ পরিবার। ভারত বিভাগের সময় পরিবারটি ভারতে পালিয়ে যায়। আমার কাছে লাহোর ছিল এক কল্পকথার স্থান। ওটা ছিল আমার দাদু-দিদিমার মোহন যৌবনের স্মৃতিময় স্থান। লাহোর ছিল তাদের কাছে হারানো গৃহ। তবে বিভিন্ন লোকজন, নতুন ও পুরাতন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতে এবং অনেক স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর ও বিপণিকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে সে স্থানটা আমার মনে গভীরতম ছাপ রেখেছে তাহলো ‘ফয়েজ ঘর’Ñ পাকিস্তানের স্বনামধন্য কবি ও বিপ্লবী ফয়েজ আহমদ ফয়েজের (১৯১১-১৯৮৪) স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত মডেল টাউনের ছোট একটি বাংলো।

পাকিস্তানের ভঙ্গুর প্রায় সুশীল সমাজে ফয়েজের কাব্য হলো এমন এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার হাতিয়ার যে রাষ্ট্র গণতন্ত্রের পক্ষে যথেষ্ট মাত্রায় বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়ে দাঁড়ায়নি। যেখানে সাম্প্রদায়িকতা এতই প্রবল আকারে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যে কোন মুহূর্তে তা ভ্রাতৃঘাতী রক্তপাতের আরেক ভয়াবহ অধ্যায় পরিণত হতে পারে এবং যেখানে আল্লামা ইকবাল ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো ব্যক্তিদের বুনিয়াদী দৃষ্টিকল্পের মর্মমূলে ক্রিয়াশীল থাকা ধর্মনিরপেক্ষ, কসমোপলিটান, গণতান্ত্রিক ও আলোকিত মূল্যবোধগুলো অবিরত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে চলেছে। এ কথা বলা মোটেও স্বাভাবিক নয় যে সুন্দর কবিতা রাজনীতির ভয়াবহতার গায়ে সান্ত¡নার প্রলেপ বুলিয়ে দিতে পারে। তবে পাকিস্তানে আজ যে পরিস্থিতি বিদ্যমান তাতে কথাটা সত্য বলে মনে হয়।

পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজের অধিকাংশ এমনকি তরুণ প্রজন্মও তাদের বিপ্লবী কবি ফয়েজকে চেনে। তাঁর সিগারেটের ধোঁয়ার কু-লিযুক্ত ছবি পাকটি হাউসের দেয়ালগাত্রে ঝুলছে। তাঁর রচিত র‌্যাডিকেল গানগুলো লালের মতো বামপন্থ’ী মিউজিক্যাল ব্যান্ডের কণ্ঠে শোনা যায় । ফয়েজের পরিবারÑ তাঁর দুই কন্যা সালিমা ও মনিজা হাশমী (এরা দুই ভাইয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল) এবং তিন দৌহিত্র আলী, আদিল ও ইয়াসের হাশমী শিল্পকলা শিক্ষাঙ্গনে মিডিয়া এবং আরও সার্বিক অর্থে বলতে গেলে সাংস্কৃতিক জীবনে তাদের সম্মিলিত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে কবির মৃত্যুর ত্রিশ বছর পরও লাহোরবাসীর মন এবং হৃদয়ে তার জীবন্ত উপস্থিতি সুনিশ্চিত করে তুলেছেন। অন্য অবস্থায় এই লাহোরবাসীরাই আবার পাকিস্তানের রাজনৈতিক নৈরাজ্যের ক্রমপ্রসারমান অনুভূতির দ্বারা অবরুদ্ধ।

‘ফয়েজ ঘর’ হলো জননেতৃবৃন্দ ও পরিবার পরিজনের সঙ্গে তোলা ফয়েজের নানা ধরনের ছবিতে পরিপূর্ণ একটি কক্ষ। যেখানে ফয়েজের ছবিগুলো আমার অখ- মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিল। আমি বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। ছবিগুলোর প্রায় সবই সাদা-কালো কিংবা বিবর্ণ হয়ে বাদামি বর্ণ ধারণ করা। অন্যান্য লেখক, শিল্পী, বিশ্ব নেতৃবৃন্দ, বিরুদ্ধবাদী বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে তোলা ছবি। তাঁর সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ও কৌতূহলোদ্দীপক এত সব নারী ও পুরুষের ছবি। এসব ছবি দেখে আমার বাবা স্বদেশ ভারত ও স্বদেশের বাইরের সুপরিচিত কবি কৈলাস বাজপেয়ীর অনুরূপ সব ছবির কথা মনে পড়ে গেল। ফয়েজ ঘরের গ্যালারি, গ্রন্থাগার, আর্কাইভ ও উদ্যানে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছিলাম। মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম কবির ক্যারিশমায়। তাঁর জীবনের নানান এ্যাডভেঞ্চার এবং পত্রাবলীর প্রতি আমি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। তখন জানতাম না যে ঐ দিনটিতে আমি যখন এসব কিছু করছিলাম তার পাঁচ সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে আমার বাবার অনন্তযাত্রা ঘটতে চলেছে।

বাবা কৈলাস বাজপেয়ী (১৯৩৬-২০১৫) ছিলেন ফয়েজ আহমদ ফয়েজের পরবর্তী প্রজন্মের কবি। তবে ১৯৬০ ও ১৯৭০ এর দশকে। যখন আমার বাবা ছিলেন তরুণ এবং ফয়েজ ছিলেন বার্ধক্যের পথে তখন বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে তারা যেসব মহলে বিচরণ করতেন সেগুলো সুস্পষ্টভাবেই মিলেমিশে একাকার হয়ে গিলেছিল। কমিউনিস্ট বিশ্বÑ অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র কাঠামোগুলো মুক্তির দর্শন মার্ক্সবাদ, লেলিনবাদ ও মাওবাদী ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রচলিত সাহিত্যকে আত্মগোপনের পথে ঠেলে দিয়েছিল, সাহিত্যে নতুন নতুন রীতি ও ধারার জন্ম দিয়েছিল ভাষাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে সংহতি গড়ে তুলেছিলেন। উপনিবেশউত্তর ও কমনওয়েলস দেশগুলোর কবি সাহিত্যিকরা ফয়েজের অগ্নিক্ষরা কাব্যে বিকাশমান এসব ধ্যানধারণা ও উদ্ভাবনী চিন্তার প্রতি স্বভাবতই আকর্ষিত হয়েছিল। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতাবলীর মধ্যে ছিল ১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তানের ঘৃণিত প্রভাতের আগমন ও ঘুণে ধরা স্বাধীনতাকে ধিক্কার জানিয়ে লেখা কবিতা যা আমাকে আমার বাবার রচিত ‘রাজধানী’ (ক্যাপিটেল সিটি), গণতন্ত্র (রিপাবলিক) এবং এক নয়া রাষ্ট্রগীত (এ নিউ ন্যাশনাল এনথেম) এর মতো কবিতাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়। বাবার ওইসব কবিতার কারণে নেহরু তার ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, পার্লামেন্টে উত্তপ্ত প্রশ্ন উঠেছিল, ১৯৬০ এর দশকে তার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাকে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল এবং ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার সময় তাঁর পাসপোর্ট কেড়ে নেয়া হয়েছিল। তিনি স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের বিকৃতরূপ, জাতীয়তাবাদ, উপনিবেশ বিলোপ ও দেশবিভাগের তিক্ত আস্বাদ এবং উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা এবং এই রাষ্ট্রের ওপর মানুষের হতাশা, নৈরাশ্য ও ক্ষোভ নিয়ে লিখেছেন (এক সিল কি তারাহ য্যেয়সে গিরি হ্যায় স্বতন্ত্রতা আউর পিচাক গ্যায়া হ্যায় পুরা দেশ)। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে প্রকাশিত তাঁর প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থে বাবার কবিতাগুলো স্নায়ুযুদ্ধ, দুই বিশ্ব পরাশক্তির মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার উন্মাদনা, তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য, পশ্চাদ পসরতা ও দুর্নীতি এবং পরমাণু অস্ত্রের কারণে এই পৃথিবীর বিপন্ন অবস্থায় ক্রোধের আগুনে ঝলসে উঠেছিল।

সীমান্তের ওপারের প্রবীণ কবি ফয়েজ ও এপারে তাঁর সমকালীন অপেক্ষাকৃত নবীন কবি কৈলাস প্রগতিশীল মতাদর্শের অভিন্ন সুতোয় বাধা পড়ে গেলেও ইসলামের কারণে ফয়েজ পশ্চিম এশিয়া ও ফিলিস্তিনী সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং অন্যদিকে বৌদ্ধধর্মের প্রতি গভীর পা-িত্যপূর্ণ আগ্রহ থেকে আমার বাবার মনোযোগ চীনের তিব্বত দখল এবং ১৯৬১ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের বিপর্যয়ের ওপর নিপতিত হয়েছিল। তবে ১৯৮০ সালের পর তিনি বৌদ্ধ, সুফি ও অদ্বৈতবাদী দর্শনের প্রতি উত্তরোত্তর আকৃষ্ট হয়েছিলেন এবং তার কাব্য রাজনীতি থেকে ঈশ্বর, আত্মা, নৈতিকতা ও অবিনশ্বতার মতো গভীরতর প্রশ্নের দিকে সরে এসেছিলেন। তর্ক সাপেক্ষে বলা যায় যে, ফয়েজ শেষ পর্যন্ত রাজনীতির প্রতিই নিবেদিত থেকেছিলেন। শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, উপমহাদেশের অর্ধনির্মিত নগরীগুলোর দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষ, উদ্বাস্তু, শরণার্থী এবং অজানা সৈনিকদের নিয়ে রচিত তাঁর কবিতাবলীতে যেমন ভারতে তেমিন পাকিস্তানে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের সুর ধ্বনিত রয়েছে। তার হাম দেখেঙ্গে, ইহাসে শেহের কো দেখো, উমিদ-ই-শেহের, ইন্তিসার, (আজ কি নাম), গুলো ম্যায় রঙ ভরে। মুঝ সে পহেলে সি মোহাব্বাত, দুয়া (আইয়ি হাত উঠাইয়ি হাম ভি), সুব-এ-আজাদী এবং বোল কি লাব আজাদ হ্যাঁয় তেরে কবিতাগুলো ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের গ-ি ছাড়িয়ে উর্দুভাষী গোটা দক্ষিণ এশিয়ার বামপন্থীদের সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল। হয়ত অজেয় আকাক্সক্ষা এবং অক্লান্ত আশাবাদের কারণেই কবি ফয়েজ আজ পর্যন্তও সংগ্রামের কণ্ঠস্বর হিসেবে এত আকর্ষণীয় হয়ে আছেন।

ফয়েজের মতো আমার বাবা ও সমকালীন জটিল ইস্যুগুলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে তাঁর ভাষাতে (ফয়েজের যেমন ছিল উর্দু/ফার্সি, আমার বাবার ছিল হিন্দি/সংস্কৃত) কাব্যরূপের মুন্সিয়ানা এবং কাব্যের ইতিহাসগত ঐতিহ্যের ওপর নিজের সুদৃঢ় দখলের প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। শিল্পকলার প্রতি প্রবল অনুরাগ ও জ্ঞানের আনুষ্ঠানিক অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে এই দুই কবি চিরায়ত কাব্য ও আধুনিক কাব্যের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করেছিলেন। তবে উভয়ের সৃজনশীলতার সমান উর্বর উৎস ছিল তাদের ঘরোয়া জীবন, যে জীবনের শিকড় নিহিত ছিল চমৎকার বিবাহ ও মধুর পারিবারিক জীবনে। ফয়েজের চেহারায় ফুটে উঠা নিখাঁদ আনন্দ ও স্নেহ ভালবাসা, স্ত্রী, কন্যা এবং পরবর্তীকালে দৌহিত্রদের সঙ্গে তোলা ছবিতে তার নিরুদ্বিঘœ ও সুখী চেহারা দেখে মনে পড়ে যায় যে, ৫০ বছরের দাম্পত্য জীবনের গোটা অধ্যায়ে আমার মা’র সঙ্গে বাবার, পরবর্তীকালে আমার সঙ্গে এবং জীবনের শেষ বছরগুলোতে আমার লেখক স্বামীর সঙ্গে তাঁর কতই না নৈকট্য ছিল। আমাদের ছোট, অন্তরঙ্গ ও নিখুঁত-নিখাঁদ ঘর সংসারটি ছিল বাবার কাব্যিক কর্মধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ যা বাবাকে কল্পনার অবাধ বিচরণের ক্ষেত্র ও নিরাপত্তা যোগাত।

ফয়েজের ছোট মেয়ে মনিজা হাশমী যিনি পাকিস্তানের বেতার ও টেলিভিশনে কাজ করেছেন, এ বছরের জুন মাসে কাশ্মীরের শ্রনগর সফরে যান। সেখানে তিনি ১৯৪১ সালে যে ভবনটিতে তাঁর বাবা ও মা ব্রিটিশ বংশোদ্ভুত এলিস জজের বিয়ে হয়েছিল আজকের সেই ভবন ‘গবর্নমেন্ট কলেজ ফর উইমেনে’ যেতে চেয়েছিলেন। কলেজটি ১৯৫০ সালে এই ভবনে চালু হয়। এলিস ও ফয়েজের নিকাহনামা পাঠ করেছিলেন শেখ আবদুল্লাহ। এই নিকাহনামাই পরবর্তীকালে পাকিস্তানের সমতাবাদী ও আধুনিক মুসলিম বৈবাহিক চুক্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। সেখানে বিবাহোত্তর ঘরোয়া অনুষ্ঠানে প্রাক-ভারত বিভাগ যুগের অন্যান্য প্রগতিশীল উর্দু কবিদের মধ্যে জোশ ও মাজাজও উপস্থিত ছিলেন। আজও কলেজটিতে এই স্বনামধন্য মানুষটির সম্মানে ‘ফয়েজ রুম’ নামে একটি কক্ষ আছে যেখানে প্রায় ৭৫ বছর আগে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

আমরা মনিজাকে নিয়ে ঐ কলেজটিতে গিয়েছিলাম। সে যুগের অতি ব্যতিক্রমধর্মী বিয়ে ছিল ফয়েজ-এলিসের এই বিয়ে। বাবা-মার বৈবাহিক মিলনের এই স্থানটি দর্শন মনিজার জন্য ছিল এক আবেগঘন ব্যাপার। পরে আমরা তাকে শ্রীনগর ঘুরে দেখাই। আমাদের সবার জন্যই ওটা ছিল এক কঠিন সফর। আমার স্বামীর বাড়ি কাশ্মীরে, আমি দিল্লীর মেয়ে এবং মনিজা লাহোরের। আমরা লোককথায় বর্ণিত অপরূপ নিসর্গম-িত কাশ্মীর উপত্যকায় বিচরণ করেছিলাম। কয়েক দশকের সংঘাত, সাময়িকীকরণ, দুর্বল অবকাঠামো এবং অতি সম্প্রতি ২০১৪ সারের সেপ্টেম্বরের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় আজ সেই ভূস্বর্গ এক বিধ্বস্ত ও ভীতিকর জনপদ। একে অপরের থেকে ভিন্ন অথচ পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ইতিহাস ও অতীতের উত্তরাধিকারী আমরা সবাই জানতাম যে ৭৫ বছর আগে ফয়েজ, এলিস ও শেখ আজকের এই স্থানটিকে চিনতে পারতেন না। ফয়েজের জীবন ও কাব্যের অনেক কিছুই আমাদের সমষ্টিগতভাবে জানা না থাকতে পারে। তবে এ কথাও আমাদের অস্বীকার করার উপায় নাই যে, আমাদের চারপাশের ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমাদের পিতৃপুরুষদের স্বপ্ন, আশা-আকাক্সক্ষা ও সংগ্রামের চূড়ান্ত অপমৃত্যু ঘটেছে।

সালিমার স্বামী শোয়েব হাশমী ফয়েজের কাব্য ইংরেজীতে অনুবাদ করেছেন। মনিজার বড় ছেলে পেশায় মানসিক রোগ চিকিৎসক আলী মাদিহ হাশমী নানার সংক্ষিপ্ত জীবনী রচনা করেছেন। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তার পূর্ণাঙ্গ জীবনী আত্মপ্রকাশ করবে। ‘ফয়েজ রুম’ পরিদর্শনের পরদিন গুলমার্গ খাওয়ার সময় আমি মনিজাকে আমার বাবার মৃত্যুর কথা জানিয়েছিলাম। কয়েক সপ্তাহ শোক ও দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে কাটানোর পর এতে আমি খানিকটা হাল্কা বোধ করেছি। ফয়েজের এক মেয়ের সাহচর্য পেয়ে আমি আমার বাবার কথা ভাবতে পেরেছি। স্রেফ সেই বাবা হিসেবে নয় যাকে আমি ভালবেসেছি ও হারিয়েছি বরং একজন কবি, একজন বুদ্ধিজীবী ও একজন সাহিত্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে যিনি ছিলেন তার যুগ ও তাঁর ভাষার অন্তর্গত এবং যার গুরুত্ব তাঁর সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির গ-িকে ছাড়িয়ে বহুদূর ব্যাপ্ত।

পরস্পরের টুকটাক লেখাগুলোর মধ্যে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য খুঁজতে গিয়ে আমরা হেসেছি। দেখা গেছে আমাদের নিজ নিজ বাবারা রাতের বেলায় লিখতেন। লেখার সময় হলে দরজা লক করে নিজেদের অন্যদের থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে লিখতেন। তাদের অনুগত স্ত্রীরা সে সময়কার বাইরের চাহিদার হাত থেকে সাহসের সঙ্গে স্বামীদের রক্ষা করতেন। বাবাদের ছিল ব্যস্ত জনজীবন। বিপরীত লিঙ্গের সদস্যদের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব বিকশিত হয়েছিল। কন্যাদের প্রতি তাদের ছিল সীমাহীন ভালবাসা। তারা উভয়ে আসন্ন কবিতাগুলো নিয়ে এমন ভাষায় কথা বলতেন যার সঙ্গে গর্ভধারণ ও সন্তানপ্রসবের ভাষার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। উভয়ে যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত ও উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠতেন যতক্ষণ পর্যন্ত না আসন্ন, গর্ভসঞ্চারিত কুসুমিত, মুকুলিত এবং উদগীরণে উদ্যত শব্দাবলী তাদের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসত। দুজনেই হার্ট এ্যাটাকে মার গিয়েছিলেন। তবে তাদের অসুস্থতায় ভুগতে হয়নি, হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি কিংবা দীর্ঘদিন ধরে রোগ-যন্ত্রণায় কষ্ট পেতে হয়নি, যার জন্য আমরা দুজনেই কৃতজ্ঞতা বোধ করেছি।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আলাপ চারিতার সময় আামি মনিজাকে বলেছিলাম যে ফয়েজ নির্বাসিত হয়েছিলেন, কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু আমার বাবা তাঁর প্রথম দিকের কাব্যে র‌্যাডিকেল ভাবধারা, সমালোচনামূলক ভূমিকা এবং এস্টাবলিশমেন্টবিরোধী সুর থাকা সত্ত্বেও কখনও নির্বাসিত বা কারারুদ্ধ হননি। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- ‘তোমার কি মনে হয় দেশবিভাগের পর ফয়েজ ভারতে থেকে গেলে ঐ দিনগুলো তাঁকে কারাগারে কিংবা বৈরুত, মস্কো, ও লাউসে কাটাতে হতো না?’

ভেবেছি যে ভারতের মোটামুটি নিরবচ্ছিন্ন গণতন্ত্রের কারণেই কি আমার বাবা নিরাপদে থেকেছিলেন অথচ পাকিস্তানে স্বৈরাচারী শাসনের অধ্যায়, সামরিক একনায়কতন্ত্র এবং রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির কারণেই কি ফয়েজকে এত দুঃখ কষ্ট সইতে হয়েছিল, তার জীবনটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এমন যাযাবরের মতো?

মনিজা গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। পাহাড়-পর্বতের পাশজুড়ে পাইনের বনভূমি নেমে গেছে। নিচে নিষ্পাদপ প্রান্তরে ধানক্ষেতগুলো আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যাচ্ছে। দূরে মেঘাবৃত বরফ ঢাকা পর্বত চূড়া আমাদের ও তার নগরীর মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। খানিক্ষণ পর মনিজা জবাব দিল ‘হ্যাঁ, হয়ত বা। ওরা বলে, উনি ছিলেন জিনিয়াস। আমার বাবার মতো প্রতিভাকে তার আপন অভিপ্রকাশের পথ করেই নিতে হয়Ñ তা যে পরিস্থিতিতেই হোক না কেন এবং পাকিস্তান, ভারত, লেবানন, ফিলিস্তিন যে দেশেই হোক না কেন... আমি জানি না, হয়ত বা তাই। অন্য কোন দেশে হলে বিষয় যাই হোক না তিনি হয়ত কাব্যই রচনা করতেন। তবে আমার মনে হয় এসব ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে না হলে ফয়েজ আর যাই হোক ফয়েজ হতেন না।’

সূত্র : দি টেলিগ্রাফ