২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মডার্ন রোমান্স ॥ আজিজ আনসারী ও এরিক ক্লিনেনবার্গ

  • নিউইয়র্ক টাইমসের এ সপ্তাহের সেরা বই মডার্ন ;###;রোমান্স নিয়ে লিখেছেন আরিফুর সবুজ

একাকিত্ব মানুষকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয় ঠিক সিগারেটের মতোই। একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা এই শব্দগুচ্ছ যে কতটা যন্ত্রণার তা নিঃসঙ্গ মানুষই জানে। মানুষ নিঃসঙ্গ থাকতে চায় না। তাই সবসময় মনের গহীন থেকে খুঁজে ফিরে একজন সঙ্গীকে। স্বপ্ন দেখে এমন এক সঙ্গীর যার সঙ্গে ভাগ করা যাবে মনের সব কথামালা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা। এই খুঁজে ফেরা, এই স্বপ্ন দেখা থেকেই অনুভূত হয় প্রেম ভালবাসার। সেই প্রেম ভালবাসার জোয়ারে ভেসে যেতে চায় মানুষ ছন্দময় রোমাঞ্চকর জীবনের পানে। সৃষ্টির শুরু থেকে অদ্যবধি নরনারীর মাঝে প্রেম ভালবাসা এই আকুতি চিরন্তন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে প্রেম ভালবাসা, রোমাঞ্চের ধরন। প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে প্রেম ভালবাসাতেও লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। এখন আর সঙ্গী খুঁজে পেতে তীর্থের কাকের মতো ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা চিঠি চালাচালি করার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় না বন্ধুর মাধ্যমে নিজের ভাল লাগার কথা জানানো কিংবা প্রেমের প্রস্তাব দেয়া। ডিজিটাল যুগের প্রেম ভালবাসা রোমাঞ্চও হয়ে গেছে ডিজিটাল। সঙ্গী খুঁজে পেতে কয়েকটি ওয়েবসাইটে ঢুঁ মারলেই হলো। নানা দেশের নানা জাতির লাখ লাখ থেকে পছন্দমতো সঙ্গী জোটানো খুব কঠিন কাজ নয়। কিছু কথাবার্তা, তথ্য-ছবি আদান প্রদানের মধ্যে দিয়ে একে অপরের মাঝে গড়ে ওঠে জানাশোনা। সেখান থেকে প্রেম ভালবাসা, রোমাঞ্চ এবং বিয়ে। ডিজিটাল এই প্রেম ভালবাসাকে উপজীব্য করে কমেডিয়ান আজিজ আনসারী এরিক ক্লিনেনবার্গকে সঙ্গে নিয়ে লিখেছেন মডার্ন রোমান্স বইটি। কমেডিয়ানের বই শুনলেই প্রথমেই মনে হবে হাস্যরসাত্মক কোন এক প্রেমের বই। কিন্তু না। এ গবেষণাধর্মী এক বই। যেখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে অনলাইনের প্রেম ভালবাসার কার্যকরণ ও সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা।

ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ সাইটে এখন শুধু নিছক সময় কাটানো হয় না, এগুলোর মাধ্যমে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব এমনকি প্রেমের সম্পর্কও। আবার কিছু কিছু সাইট আছে যেগুলো সরাসরি প্রেম ও রোমাঞ্চের জন্যই ব্যবহার করা হয়। এসব সাইট থেকে অনেকেই বেছে নিচ্ছে নিজের জীবনসঙ্গীকে। কেউ হয়ত বিয়ের জন্য, আবার কেউ লিভটুগেদার অথবা কেবল বন্ধুত্বের জন্যই এসব সাইট ব্যবহার করছে। এতে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে আসছে পরিবর্তন।

সেসব পরিবর্তনগুলোও স্থান পেয়েছে এই বইটিতে। বইটি গবেষণাধর্মী হলেও যেহেতু বইটি আজিজ আনসারীর, তাই হাস্যরসের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে অনেক জটিল সম্পর্ককেও। বইটি বড় ধরনের এক রিসার্চ প্রোজেক্ট। এতে শতাধিক সাক্ষাৎকার, ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করে দেখানো হয়েছে আধুনিক প্রেম ভালবাসার ধরন। সারাবিশ্বের বেশির ভাগ দেশ থেকেই নেয়া হয়েছে স্যাম্পল যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়েই প্রেম ভালবাসার পারদে যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। আজিজ আনসারী ও তাঁর সহ-লেখক সমাজবিজ্ঞানী এরিক ক্লিনেনবার্গ জরিপ ও রেডিডের তাঁদের অনলাইন রিসার্চ ফোরাম থেকে আচরণিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেছেন। তারা বিশ্বের খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানী তথা এ্যান্ড্রু চার্লিন, ইলি ফিনকেল, হেলেন ফিশার, শেনা আইয়েনগার, ব্যারি শোয়ার্টঝ, শেরি টার্কল, রব উইলার প্রমুখের সহায়তা নিয়েছেন আচরণিক কার্যকরণ ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণে। দিয়েছেন দেশভিত্তিক অনলাইন ডেটিংসাইট ব্যবহারকারীদের পরিসংখ্যান। আবার সাইটভিত্তিক ব্যবহারকারীদের পরিসংখ্যানও দেখানো হয়েছে। নারী-পুরুষ ও বিভিন্ন বয়সভেদে ব্যবহারকারীদের পরিসংখ্যানও তারা দেখিয়েছেন। সেই সঙ্গে ব্যবহারের কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। অনলাইন ডেটিং সাইটগুলোর প্রভাবও তারা তুলে ধরেছেন তাদের এই বইটিতে। অনলাইন ডেটিংকে কার্যকর করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তারা দিয়েছেন বইটির শেষাংশে।

বইটি গবেষণাধর্মী হলেও উপস্থাপনা ভঙ্গি এমন চমৎকার যে পাঠক বইটি পড়তে গিয়ে বিরক্ত হয়ে উঠে না। বইটির মাধ্যমে পাঠক বদলে যাওয়া প্রেম ও রোমাঞ্চের প্রকৃত অবস্থা জানা যেমন সম্ভব, তেমনি এর মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক প্রভাবও উপলব্ধি করা সম্ভব হচ্ছে। তাই নিউইয়র্ক টাইমসের বুক রিভিউতে বইটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন পাঠকরা। বইটি ওঠে এসেছে নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলারের শীর্ষে।