২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শেষ বিকালের আলোয় সিজার

  • সমুদ্র হক

বিজয়ের পর বীর জুলিয়াস সিজারকে ক্লিওপেট্রা আমন্ত্রণ জানালেন প্রাসাদে। বললেন, প্রবেশের পথ শত সহস্র গোলাপে ছেয়ে থাকবে। মিসর বিজয়ী বীরকে বীরের মর্যাদার প্রাসাদে বরণ করা হবে। সিজার সম্রাজ্ঞীর বারতা পেয়ে মৃদু হেসে বাহকের হাতে ক্লিওপেট্রাকে ফিরতি মেসেজে জানালেন জুলিয়াস দিগি¦জয়ী বীর, তার তরবারি জয়ের জন্য। ফুল, পাখি প্রকৃতি ভালোবাসা ধ্বংসের জন্য নয়। যদি বীরকে সম্মান জানাতেই হয় তাহলে শুধু একটি গোলাপ হাতে দিলেই বীর খুশি। অথবা কোন গোলাপ গাছের কাছে অভিবাদন জানালেই গোলাপের নীরব সাক্ষীতে সিজার গর্বিত হবে। ক্লিওপেট্রা কোন্টি মেনে নেবে সেটা তার বিষয়, তার ইচ্ছা। তবে ফুলকে হত্যা করে তার পাপড়ি বিছানো পথে সিজার পা ফেলতে পারবে না। এই চিঠির ভাষায় মুগ্ধ ক্লিওপেট্রা। টলেমি যুগের দ্বৈত শাসনে পরিচালিত সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রা ছিলেন মিসরের সর্বশেষ রাজা অষ্টাদশ টলেমি নিয়াজ ডায়নিসাসের কন্যা। মিসরের একচ্ছত্র ক্ষমতায় বহুকাল ছিলেন এই ক্লিওপেট্রা। এই ক্লিওপেট্রার মিসর দখল করেছিলেন বীর জুলিয়াস। রোমান সেনাপতি জুলিয়াস সিজারের মিসর জয় নিয়ে ইতিহাসবিদ এবং গবেষকরা অনেক কথা লিখেছেন। কিছু গল্প আবার এমন রোমান্টিকতা যা পরবর্তী সময়ের গবেষণায় জুলিয়াস সিজারের অসাধারণ সুন্দর মনের, আবেগের ও হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ প্রেমের সাক্ষ্য বহন করে। এমনই মধুময় প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ক্লিওপেট্রার সঙ্গে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জুলিয়াস সিজার সেই প্রণয়কে মর্যাদা দিয়ে গেছেন। পৃথিবীতে সিজারের শেষ দিনে ক্লিওপেট্রা দুই ফোঁটা অশ্রু ফেলেন কফিনের ভিতরে মুদে থাকা সিজারের চোখের ওপর। সিজার ও ক্লিওপেট্রাকে নিয়ে ইতিহাসবিদ গবেষক গল্পকার উপন্যাসিক কী লিখল সেই কঠিন বিতর্কে না গিয়ে এমন মধুময় প্রণয়কে ধারণ করে তার ওপর সাহিত্য রসের কিছুটা ফ্লেভার দিয়ে এই ছোট গল্প।

মিসরের রাজধানী কায়রো মহানগরীর বিশাল প্রাসাদে পরাজিত ক্লিওপেট্রা ও তার স্বামী ১৩ টলেমি সিজারের চিঠি পেয়ে ক্ষুব্ধ বা অভিভূত কিছুই হতে পারছে না। মনে করছে রোমান সেনাপতি সিজারের এটা কোন চাল কিনা অথবা এমন কিছু করবে যা ক্লিওপেট্রাকে বন্দী থেকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে। ক্লিওপেট্রার এতকিছু ভাবার কারণও আছে। সিজার যখন সৈন্যসামন্ত নিয়ে বীরের বেশে মিসরে প্রবেশ করে তখন ক্লিওপেট্রার স্বামী টলেমি ১৩ সিজারকে এমন কিছু মন্তব্য করে যা ছিল রোমবাসীর চরিত্রের ওপর বড় কলঙ্ক। সিজার এই কলঙ্কের জবাব দিতে ভিন্ন পথ বেছে নেন। টলেমি শাসনের অবসান ঘটাতে সিজার ঘোষণা করেন কোন এক বাজিতে জিততে গিয়ে সিজারের মিসর আক্রমণ। রোমানরা যে বীরের জাতি তা প্রমাণ করেই সিজার ফিরে যেতে চেয়েছিল কিন্তু এখন আর তা সম্ভব নয়। সিজার প্রমাণ করে দেবে রোমানরা যেমন বীর তেমনই রাজ্য দখলের পর সেই দেশের সম্রাটকে মর্যাদা দিতেও জানে। সিজারের এই বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি তার সেনাপতি মার্ক এন্টনি। এন্টনির কথাÑ রাজ্য জয় করে তা যদি হাতের মুঠোয় না থাকল তাহলে কী লাভ! এন্টনি জানত সিজার যেমন সাহসী বীর তেমনই সে প্রকৃতি ও মানবপ্রেমী। যুদ্ধে হত্যাও পছন্দ করত না সিজার। মনে করত পৌরুষ ও ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে মানবিক গুণাবলি এবং মানুষের জন্য কর্ম দিয়ে মানুষের মন জয় করতে পারাই সবচেয়ে আনন্দের। মরেও অনেকটা সময় ধরে অমর হয়ে মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকাই হলো প্রকৃত বীর। সিজারের সেনাপতি এন্টনি এগুলো মানতই না। এন্টনির কথা- যুদ্ধ জয় করার জন্য যতটা রাফ এ্যান্ড টাফ হওয়া দরকার তাই হতে হবে। তাহলে মানুষ মনে করবে বীর। সিজারের উত্তর ছিল- ইতিহাস বীরকে বীরের মর্যাদা দেবে মানুষরূপী বীরের বীরত্ব দেখে। অমানুষ বীর আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপিত হবে। মার্ক এন্টনির সঙ্গে সিজারের এমন মতপার্থক্য থাকার পরও সিজার এন্টনিকে সরায়নি। কারণ এন্টনির স্ত্রী ছিল সিজারের উত্তরাধিকারী অক্টোভিয়াসের বোন। সিজার তার উত্তরাধিকারীকেও বলত- শক্তিশালী ঘোড়া, তরবারি, অস্ত্র ও সৈন্যসামন্তের রণসাজে সজ্জিত হয়ে রাজ্য দখল করা যায়। এভাবে রাজ্য দখল যত সহজ তারচেয়ে লক্ষ গুণ বেশি কঠিন মানুষের মন জয় করা। বীরের বেশে ভূমি দখলের পর সেই ভূমিতে বাস করা মানুষের কাছে প্রমাণ দিতে হয় বীর ব্যক্তিত্ব দিয়ে কতটা ভালোবাসল মানুষকে। মানুষের কত কাছাকাছি থাকতে পারে বীর। বীরের রাফ এ্যান্ড টাফ স্বভাব ক্ষণিকের প্রভুর মতো। তা ভালোবাসার নয়। এই অবস্থায় কিছু মানুষ ধন্য ধন্য রব তুলতে পারে। তা মিলিয়ে যেতেও সময় নেয় না। ইতিহাসের পাতায় তা কলঙ্ক হয়েই থাকে। সিজারের এই কথাগুলোকে এন্টনি ও অক্টোভিয়াস একজন শিল্পীর প্রেমিক মনের কথা এবং উদার ভাবনা মনে করে উড়িয়ে দিত। সিজার মৃদু হেসে শুধু বলত ‘হিস্ট্রি উইল সে টুমরো এ্যান্ড নাথিং ইজ ফ্রি ইন লাইফ।’ পরবর্তী সময়ে ইতিহাস যা উত্তর দিয়েছে তাতে এন্টনি ও অক্টোভিয়াসকে মানুষ মনে রাখেনি মনে রেখেছে সিজারকে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৭ অব্দে রোমান সেনাপতি জুলিয়াস সিজার মিশরে যান। এর আগে রোমের এক নগরীতে রোম অধিপতির কাছের মানুষ বলে সিজার তো বীরত্ব দেখায়। মিসরের টলেমি শাসনের ক্লিওপেট্রার মন জয় করতে পারবে কি! কথাটি সিজারের মনে তীরের মতো বিদ্ধ করে। সিজার ছিলেন বেহালাবাদক। রোমান সুরের নানা রাগরাগিণী তুলতে পারতেন। রহস্যময়ী ক্লিওপেট্রাকে নিয়ে এমন বাজি ধরাতে সিজার বলে ওঠে ক্লিওপেট্রা কেন গোটা মিসর দখল করব। যেই বলা সেই কাজ। শুরু হলো মিসর দখলের আয়োজন। প্রচ- যুদ্ধে জয়ী হলো সিজার। ততদিনে শুনেছে মিসরের দ্বৈত শাসনের কথা। ক্লিওপেট্রা ১৮ বছর বয়সে মিসর শাসনে বসেন। ক্লিওপেট্রার বিয়ে নিয়ে আছে অনেক কথা। সিজার যখন মিসর দখল করে তখন ক্লিওপেট্রার স্বামী টলেমি ১৩। যুদ্ধ জয়ের পর সিজার যখন প্রাসাদে আসে তখন সিজার মুগ্ধ হয় ক্লিওপেট্রাকে দেখে। তবে ক্লিওপেট্রা সিজারকে মিসর বিজয়ী বীর ছাড়া আর কিছু ভাবে না। দিনে দিনে ভাবনা পেয়ে বসে রোমের সেই বাজি- ক্লিওপেট্রার মন জয় করতে পারবে কিনা। সিজার জানত তার প্রেমিক মন থাকলেও ক্লিওপেট্রার মন জয় করা বেশ কঠিন হবে যখন সেখানে চলে দ্বৈত শাসন। দ্বৈত শাসনের ধারায় ক্লিওপেট্রার প্রেমের মনেও দ্বৈত ভাবধারাই সূচিত হয়েছে। তারওপর ক্লিওপেট্রার পাণি গ্রহণে রাজপুত্তুরের আগমনের অভাব হয় না। সিজার ভাবে রাজ্য তো জয় হলো। ইচ্ছা করলেই সম্রাজ্ঞীকে যে কোন মুহূর্তে সিংহাসন থেকে নামিয়ে দেয়া যায়। মার্ক এন্টনিও তাই চাইছে। কিন্তু সিজার চাইছে বীরত্ব ও প্রেমের সমন্বয় করতে। সিজার বুঝতে পারে ক্লিওপেট্রার কাছে এতকাল যারা এসেছে তারা হৃদয়ে প্রেমের গভীরতা নিয়ে তো নয়ই, শুধু প্রেম নিয়েও আসেনি। অনেকটা সময় ধরে সিজার ক্লিওপেট্রাকে বুঝতে চেষ্টা করে। কীভাবে তার হৃদয়ের গভীরে যাওয়া যায়। রাজ্য জয়ের পর সিজার প্রাসাদে থাকে ঠিকই তবে বোঝায় এই দেশের মানুষকে আর টলেমি শাসনের মতো দুর্ধর্ষ শাসন দিয়ে নয়। মানুষকে ভালোবেসে থাকতে হবে মিসরে। দিনে দিনে ক্লিওপেট্রাও অনুভবে সিজারকে একটু করে আপন করতে থাকে। সিজার বীর হওয়ার পর প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে ভালোলাগার বহির্প্রকাশ ঘটায়। ফুল ও পাখির সঙ্গে আপন মনে কথা বলা। বেহালায় সুর তোলা। ক্লিওপেট্রাকে মর্যাদা ও সম্মান দেখায়। রাজ্যের মানুষকে নিয়ে ভাবনা এবং তা ক্লিওপেট্রার সঙ্গে শেয়ার করে। এই বিষয়গুলো ক্লিওপেট্রাকে সিজারের কাছাকাছি নিয়ে আসে। ক্লিওপেট্রা ভাবে এতকাল মিসরে যে শাসন চলেছে তাতে তো মানুষ ছিল না। ক্লিওপেট্রা মানুষের কোন কথা জানত না। তাকে রাখা হতো পুতুল করে। এমনকি টলেমিও কিছু বলত না। এরই মধ্যে সিজার জানতে পারে টলেমির সঙ্গে ছিল ক্লিওপেট্রার বিরোধ। টলেমি অবজ্ঞা করত ক্লিওপেট্রাকে। যদিও সিজার এইসব বিষয় নিয়ে ক্লিওপেট্রাকে কোনদিন কিছু বলেনি, জানতেও চায়নি। দিনে দিনে ক্লিওপেট্রার সঙ্গে সিজারের দেখা হওয়া নানা বিষয়ে কথা বলার মাত্রা বেড়ে যায়। ক্লিওপেট্রা তার বিয়ে ও স্বামী সম্পর্কে কিছু বলার চেষ্টা করলে সিজার জানিয়ে দেয় এগুলো তার একান্ত নিজস্ব বিষয়। এমন কথাবার্তায় ক্লিওপেট্রার হৃদয়ে আসন করে নেয় সিজার। কিন্তু ক্লিওপেট্রা মুখ খুলে কিছু বলতে পারে না। দিন মাস কেটে বছর যায়। এদিকে সেনাপতি এন্টনি এই বিষয়গুলো সহজভাবে মানতে পারে না। সিজারকে কিছু বলতেও পারে না। বীর সিজার বুঝতে পারে সবই। জানতে পারে ক্লিওপেট্রার সঙ্গে দেখা করা কথা বলার কারণে স্বামী টলেমি সিজারকে সহ্য করতে পারে না। এ নিয়ে অপমান করে ক্লিওপেট্রাকে। বিষয়টি জানতে পারে সিজার। এক পর্যায়ে সিজার সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য জয় করলেও ক্লিওপেট্রার মাথায় মুকুটটি পরিয়ে দেবে। সম্রাজ্ঞীর আসনেই তাকে রাখবে। প্রণয়ের মর্যাদা দেবে সে বীরের বেশেই। নির্দিষ্ট দিনে এক শুভ ক্ষণে সিজার আনুষ্ঠানিকভাবে মুকুট পরিয়ে দেয় ক্লিওপেট্রাকে। বীরত্বের তরবারি ক্লিওপেট্রাকে অর্পণ করে বলে, এই তরবারি বীরের ভালোবাসা। প্রেমের অর্ঘ্য। প্রাসাদের রাজ বিলাসিতায় নয়, বীর সিজার থাকবে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে। মানুষ ও প্রকৃতির ভালোবাসার বীরত্বের মধ্যেই থাকবে সে। ক্লিওপেট্রার যদি কখনও মনে হয় সিজারকে ভালোবাসা যায় তাহলে সিজারের কাছে যাবে । সিজার থাকবে স্বেচ্ছা নির্বাসনে।...অনেক দিন পর প্রাসাদে খবর এলো সিজার আর নেই। কায়রোর এক বাগানে তাকে সমাহিত করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এর আগে ক্লিওপেট্রা সিজারকে অনেক খুঁজেছে। পায়নি। যখন খুঁজে পেল তখন সিজারের না ফেরার দেশে যাওয়ার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।

কফিনের ওপর ¯িœগ্ধ এক আভা। তার সামনে এসে দাঁড়ায় ক্লিওপেট্রা। কফিনের ঢাকনা কিছুক্ষণের জন্য সরানো হলো। ততক্ষণে শেষ বিকালের লাজুক আলো এসে পড়েছে সিজারের মুখে। শান্ত সৌম্য মুখে তখন ঠোঁট বাঁকানো হাসি। বাইরে মৃদু বাতাস। গাছের কয়েকটি পাতা কফিনের চারধারে গিয়ে পড়ল। কিছু ফুল বাতাসে দুলে স্বাগত জানাল সিজারের প্রণয়ের মানুষকে। মনে হবে সিজার বুঝি প্রকৃতির কাছে তা বলেই রেখেছিল। ক্লিওপেট্রা সিজারের শীতল মুখের কাছে গিয়ে অস্ফুটভাবে বলল- প্রিয়তম সিজার, তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি...।

আরও কী যেন বলতে চাইল, পারল না। ক্লিওপেট্রার দুই ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ল সিজারের মুদে থাকা চোখের ওপর। মনে হবে সিজারের নিথর চোখের জলের সঙ্গে মিশে গেল ক্লিওপেট্রার অশ্রু। ক্লিওপেট্রা উঠে দাঁড়িয়ে বীরত্বের ভালোবাসার সেই তরবারি রেখে দিল সিজারের পাশে। বীরকে জানাল স্যালুট। তখন বিউগলে বাজছে করুণ সুর। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার জানান দিল গোধূলি লগ্ন। বীরের বেহালার করুণ সুরের রাগিণী ভেসে এলো বাতাসে।

নির্বাচিত সংবাদ