১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জাফর ওয়াজেদের বর্ষার কবিতা

বৃষ্টিভেজা

সেদিন ছিল বৃষ্টিভেজা গা জুড়ানো দিনের ফাঁকে

আমিই তোমায় ভিজিয়েছিলাম মধুছড়ি মাঠে

ভিজতে ভিজতে গাইতে ছিলাম রবি কবির গান

গানের ভেতর মোহমায়া গানেই টানে অনির্বার।

আমরা এখন ভেজা শরীর খেলছে হুটোপুটি

চোখে চোখে কথা বলে হেসেই হয় লুটোপুটি

হাতখানি যেই রাখি হাতে বৃষ্টি এসে দেয় বাধা

দেহের ভেতর জলের খেলা, কৃষ্ণ এবং রাধা

বাঁশি কোথায়? কৃষ্ণ যখন বাজাক না হয় তবে

মোহিত সুরে বিমনা মন অযথা ভিজেই রবে।

ভিজে গেছে প্রান্তর আর ভিজেছে মন ও শরীর

ভেজার গান তুলুক তান গমকে আনুক মীড়

আরোহ আর অবরোহণে থাকবে কেন মিল

বৃষ্টিভেজা তোমার সাথে আমার যত অন্তমিল।

বৃষ্টি ঝরা রাতে

আকাশে ছিল জমাট মেঘ, ভূমিতে হলকর্ষণ

রাতভর নিদ্রাতুর শরীরে উষ্ণ-শীতল বর্ষণ

বর্ষার জল ছড়ানোর আগে ঘন কৃষ্ণচুলে

মাত্রা রেখে ক্লান্তি জড়ানো কথা মন খুলে

ভুলেÑবেভুলে যা মনে আসে হয় যদি বলা

পাথরে মাথা ঠুকে নয় আগুনেই হবে জ্বলা

জ্বলতে জ্বলতে ভস্ম বৃষ্টি জলে হয় যদি ধোয়া

ভাসিয়ে নেবে পুকুর জলে মাটির স্পর্শ ছোঁয়া।

ভীরু ভীরু মেঘের জল গাছের ফাঁকে দেখে

অগ্নিকুসুম অপেক্ষায় ভার পরাগ রেণু মেখে

জলজ শরীর জলের ভেতর থেকে যায় সপ্রাণ

জ্বলন্ত সব নিভন্ত হয় পেলেই বৃষ্টির সোঁদা ঘ্রাণ

ভেজা শরীর ভেজা মন ভিজেই যায় অনন্তর

বৃষ্টি আর রাতের প্রহর শরীর জুড়ে কী মন্তর

শরীর জাগে উত্তুঙ্গে তার হাওয়ার নদী বয়

নদীর মতো সাগর খুঁজে পাবে সুখসময়।

বর্ষার রথ

ঝড়ের আগেই যে বজ্র হুংকার ঢালে মেঘে

তারও রয়েছে গভীর প্রেম আন্তরিক ভালোবাসা

মুগ্ধ চাহনীতেও সে বিলায় স্পর্শের ঘ্রাণ

মৃদুমন্দ হাসিতে ফোটায় জীবন তরঙ্গ লহর

ঢেউয়ের গভীরে ঢেউয়ের ব্যঞ্জনায় ভরা

অনেক চেনা অচেনা ধ্বনির সমারোহময়

বজ্র মানিক দিয়ে গাঁথা মালার ভেতর ফুল

ফুলেতে সৌরভÑ সে সব নিয়ে কত সুর গান

কত দোলাচল দোদুল দোলনার অন্তরে

মোহমায়ায় ভরে যায় অন্তরের নিবিড় ঘ্রাণ

বিদ্যুৎ হুংকার কাঁপে মৃত্তিকা ধরাধামও

মানুষের ভয়ের তালিকায় ঠাঁই নেয় সহজেই।

বিদ্যুৎ ঝলসায় আলোময় মাটিতে তার ধ্বনি

মনে করিয়ে দেয় বর্ষার রথ ছুটবে এখনি।

মেঘে মেঘে বেলা

মেঘে মেঘে বেলা যায় নেমে আসে অন্ধকার

পেঁজা তুলো ভাসে বেড়ায়-বৃষ্টি নিয়ে দ্বন্দ্ব তার

ঝরবে কি না ঝরবে-দ্বিধায় কাটে তিনটি প্রহর

স্খলনে তার মুক্তি যদিও- ঝরায়ে জলের নহর

বৃষ্টি ধারায় নেমে আসায় আনন্দ কি নেই তার।

সুখের ভেতর আলোর মাতম খুঁজে যদি পায়

গাঢ় চুম্বন পুঁতে দেয় সবুজ ঘাসেরই গোড়ায়

শেকড়ে তার জলের জোগান মেঘই হয় ভরসা

তড়পায় তাই বৃষ্টি চেয়ে খোঁজে নিবিড় বরষা

বর্ষারাতের ছিঁচকাদুনে বিলাপেরই মাতম সুরে

বাজিয়ে নূপুর গায় যে গান দেহের জমিন খুঁড়ে।

দেহের ভেতর মেঘের বাড়ি, বরফ জমা ঘর

তপ্তদাহে গলে পড়ে সান্ত¡নাতেও হয় ভরপুর

মেঘ বুঝে যায় কি বেলা অবেলা কালবেলাতে

সময় তার অফুরন্ত যখন খুশি শীতলতা ঝড়াতে

ঝড়ুক বৃষ্টি ভাসুক মেঘ মনের বনেরই চারপাশে

আকাশ ভেঙ্গে সাগর নামুক মাটিকে ভালোবেসে।

ভয়

জাহিদ হায়দার

প্রায় সব মানুষেরই

সকালে একবার নিজের মুখ দেখতে ইচ্ছে করে।

বিষয়টা এমন হতে পারে,

জেগে ওঠা মনের মনে হতে পারে,

গত রাতে যে-মুখ নিয়ে ঘুমাতে গেছে,

ঘুমের নৈঃশব্দ্যে, অন্ধকারের অভিলাষী সুযোগে

অথবা পথ হারানো এক স্বপ্নাঘাতে মুখ

চেনা মুখ থেকে হারিয়ে গেছে কি-না।

ঘর থেকে যে-মুখ নিয়ে মানুষ বাইরে যায়,

ফিরে এসে কেউ কেউ আয়নার সামনে দাঁড়ায়।

মুখ, বাইরে থেকে কোনো অচেনা মুখ

নিয়ে ঘরে ফিরলো কি-না।

ঘরের মানুষরা ও-ভাবে তাকালো কেন?

কারো কাছে অথবা কোনো মেঘের নিচে

আমি তো মুখ রেখে আসি নাই।

গন্তব্যের গল্পকোষ

ফকির ইলিয়াস

ঝরবে বলে কথা দিয়েও ঝরেনি বৃষ্টিঘোর। ঘরের বাইরে কাতরাচ্ছে

যে পরাণ- তার কোনও গন্তব্য নেই জেনেও ধারণ করছি বুকে।

আর পিঞ্জরকে বলছি, আপাতত তুমি পাখিময় থাকো- থাকো

আঁখিময়, আমার দু’চোখ দিয়ে দেখে নাও তোমার যাপিত কালক্রম।

পৃথিবী কখন-ই পথের সন্ধান করেনি। যে জীবন শুদ্ধতার ছায়ায়

জমা করেছে তার সকল সঞ্চয়, মাটি তার জন্যই বার বার ফুটিয়েছে

কুসুম, বর্ণের ভাষান্তরে কবিতাও উজাড় করে দিয়েছে তার জন্য ভালোবাসা।

ভালোবাসারও কোনও গন্তব্য থাকে না। তবুও গ্রীষ্মের গল্পকোষে লিখিত

থাকে যে প্রেমের কাহিনী- মানুষ উৎসুক হয়ে তা পড়তে চায়। বৃক্ষ

উদার হয়ে দিতে চায় ছায়া। গ্রহ, সাথী হয়ে রাতের আকাশে লিখে রাখে

অগণিত পরিচিত নাম।

ফিরবে বলে কথা দিয়েও নদীরা ফিরেনি। উদাস দুপুরের মন

খারাপ দেখে- খোলা মাঠে একা হেঁটেছিল যে বালিকা, আমি জানি-

তার এবং আমার গল্পও খুঁজে পেয়েছিল একদা, অভিন্ন অন্ত্যমিল।