২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আতিকউল্লাহ খান মাসুদ, স্বদেশ রায় এবং আদালতের কাঠগড়া

  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

আমার এ লেখা ছাপা হবে শনিবার, ৮ আগস্ট ২০১৫। পরদিন রবিবার দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ এবং কলামিস্ট ও নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়কে আদালত অবমাননার আসামি হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো দেশের সর্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। স্বদেশ রায় কলামটি লিখেছিলেন দেশের বহুল আলোচিত-সমালোচিত ‘অশ্লীল রাজনীতিক’ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বা সাকাচৌর যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ের (মৃত্যুদ-) বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপীলের রায়ের প্রাক্কালে। ২৯ জুলাই ২০১৫ ছিল আপীল বিভাগের রায়ের দিন। আপীল বিভাগের মাননীয় বিচারকগণ ট্রাইব্যুনালের রায় মৃত্যুদ- বহাল রেখে রায়ও দেন। তার আগেই ছাপা হয়েছিল স্বদেশ রায়ের কলামটি। অবশ্য আমি নিজে এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী শিকদার নামে অপর এক ভদ্রলোকও একই বিষয়ের ওপর জনকণ্ঠে কলাম লিখেছিলাম। এই কলাম দুটিও আপীল বিভাগের রায়ের আগে ছাপা হয়েছিল। মহামান্য আদালত স্বদেশ রায়ের কলামের জন্য এবং তা জনকণ্ঠে প্রকাশ করায় পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক আতিকউল্লাহ খান মাসুদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে তাদের তলব করেন। গত ৩ আগস্ট তাঁরা প্রথমবার আদালতে হাজিরা দেন। আদালত আগামীকাল রবিবার ৯ আগস্ট ২০১৫ পরবর্তী হাজিরার তারিখ নির্ধারণ করেন।

স্বদেশ রায়ের কলামটির শিরোনাম ছিল ‘সাকার পরিবারের তৎপরতা ॥ পালাবার পথ কমে গেছে’ এবং যা গত ১৬ জুলাই ছাপা হয়েছিল। আমি যে কলামটি লিখেছিলাম তার শিরোনাম ছিল ‘সাকার মৃত্যুদ-ের রায় বহাল থাকবে তো?’ এবং তা গত ২৫ জুলাই ২০১৫ ছাপা হয় জনকণ্ঠে। ২৪ জুলাই ২০১৫ ছাপা হয়েছিল ‘সমগ্র জাতির শ্বাসরুদ্ধকর অপেক্ষা’ শিরোনামে মোহাম্মদ আলী শিকদারের কলামটি। বস্তুত আদালতকে অবমাননা করা মোটেই আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আবেগের জায়গা থেকে একটি শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল গোলাম আযম ও সাঈদীর মতো সাকার রায় বহাল থাকবে কি থাকবে না। তাদেরও ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদ- দিয়ে রায় দিয়েছিলেন। পরে আপীল বিভাগ তা ৯০ বছরের এবং সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদ- দেন। অবশ্য গোলাম আযমকে ৯০ বছর এবং আমৃত্যু কারাগারে থাকতে হয়নি। বয়সের অজুহাত তুলে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আরাম-আয়েশে কাটিয়ে দেন। গোলাম আযমের মৃত্যু হলে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পাশে তার জানাজা হয়েছিল এবং রাজধানী ঢাকাতেই তার দাফন হয়। আমরা অবাক বিস্ময়ে তা তাকিয়ে দেখছিলাম। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতিসহ জাতীয় বীরদের জানাজা-দাফন কোনটাই রাজধানী ঢাকায় দিতে দেয়া হয়নি। খন্দকার মোশতাকের সঙ্গী মিলিটারি জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে সর্বজনবিদিত। তারও দাফন হয় শেরেবাংলা নগর সংসদ ভবনের উত্তর পাশে চন্দ্রিমা উদ্যানে, যদিও অনেকেই সন্দেহ করেন জিয়ার দাফনটি ছিল রাজনৈতিক, কেননা একটি প্রশ্নের মীমাংসা আজও হয়নিÑ জিয়ার লাশ সত্যি সত্যি ওই কবরে রয়েছে তোÑ এমন প্রশ্নও করেন কেউ কেউ? এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী খান এ সবুরের লাশও দাফন করা হয় সংসদ ভবনের সামনে এক কোনায়। যে কারণে অনেকেই এ কবর সরিয়ে নিতে বলেছেন।

যা হোক, সাকাচৌকে নিয়ে শঙ্কাটা সৃষ্টি হয় নানা কারণেই। গোলাম আযমের মতো না দ- পাল্টে যায়! জানি না এ কথা বলার পর আমারও আদালত অবমাননার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে কিনা? তা যদি হয় তবে দুঃখ পাব না। তবে একটা অভিজ্ঞতা তো হয়েছেইÑ আতিক উল্লাহ খান মাসুদ ও স্বদেশ রায় হাজিরার দিন আদালতে গিয়েছিলাম দেখতে। গিয়েছিলেন লেখক-গবেষক-ইতিহাসবিদ প্রফেসর ড. মুনতাসীর মামুন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ডাঃ প্রাণ গোপাল দত্ত প্রমুখ। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে দেখলাম যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন, কৃতিত্বের দাবি করেন, তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে পত্রিকার সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকের পক্ষে দাঁড়াতে দেখলাম না। এটিও আমাদের শঙ্কারই আরেকটি কারণ। আমরা মূলত এ কথাটাই বলতে চেয়েছিলাম যে, সাকার তো অর্থ ভা-ার অনেক স্ফীত, কখন কী করতে কী করে ফেলে। আমাদের সামনে তো উদাহরণ রয়েছেইÑ জজকোর্টে দুর্নীতির মামলা থেকে তারেক রহমানকে বেকসুর খালাস দিয়ে একজন বিচারক খুব সহজেই দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন পরিবার-পরিজন নিয়ে। কথা ওঠেছে আগেই মালয়েশিয়াতে তার জন্য প্রাসাদোপম বাড়ি বানিয়ে রাখা হয়েছিল এবং তিনি সরাসরি সেই বাড়িতে ওঠেন। যুদ্ধাপরাধী বাচ্চু রাজাকার, ট্রাইব্যুনালে যার বিচার শুরু হয়েছিল, ঠিক ওই সময়ই সে দেশ থেকে উধাও হয়ে যায়। সে এখন কোথায় আছে কেউ জানে না। বলা হয়, পুলিশ-পলিটিশিয়ানদের সহায়তায় নির্বিঘেœ দেশত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছে সে। অবশ্য সাকাচৌর কথা ভিন্ন। তার বডি-ল্যাঙ্গুয়েজ, কথাবার্তা এমনকি ট্রাইব্যুনালের সিঁড়িতে ওঠানামার সময় হাত নাড়ানো হাসিÑ সবই এমন যে, মানুষ মনে করেছে সাকাচৌ কোনকিছু কেয়ার করেন না। রাজনৈতিক জীবনেও সাকাচৌ ছিলেন ভীষণ অশ্লীল এক মানুষ, যে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া সম্পর্কে অশ্লীল মন্তব্য করতে এতটুকু দ্বিধা করেননি। আমাদের শঙ্কাটা ছিল এখানেই। জানি না কি করে বসে। যে লোক খালেদা জিয়া ও তদীয় পুত্র তারেক সম্পর্কে অশ্লীল মন্তব্য করেও পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির নীতিনির্ধারণী স্থায়ী কমিটিতে জায়গা করে নিতে পারেন, এমনকি খালেদা জিয়ার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টার পদ বাগাতে পারেন, ওআইসির সেক্রেটারি জেনারেল পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য খালেদা জিয়ার নমিনেশন আদায় করতে পারেন, তার সম্পর্কে শেষ কথা বলা খুবই কঠিন; শঙ্কা এখানেই।

পেছনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব সাকাচৌ তার বাবা ফকাচৌর পাকিস্তানপন্থী রাজনীতির বিশ্বস্ত অনুসারী ছিলেন। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে যে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল এবং যার মাধ্যমে বাঙালী হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রীস্টান সকলকে দুই টুকরা করে দেয়া হয়েছিল। যে কারণে পাকিস্তানপন্থী বাঙালীরা অন্য যে কারও চেয়ে হিন্দুদের বেশি ঘৃণা করে। এটিই মুসলিম লীগের রাজনীতি, যা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বা সাকাচৌ একমুহূর্তের জন্য ভুলেননি। পিতার মতো তিনিও হিন্দুদের ঘৃণা করতেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কেও যা-তা মন্তব্য করতেন। এমনকি আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা...’ এটাকে হিন্দুর রচনা বলেও ঘৃণা করতেন।

সম্ভবত ১৯৮৬ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে আমি তখন দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করি। অফিস থেকে বলা হলো সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সংসদীয় আসন রাউজানের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য। আমি চলে গেলাম সেখানে। দুই দিন ছিলাম। যখনই কোন এলাকায় গেছি পথে পথে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কে আমি? এখানে আসার উদ্দেশ্য কী? ইত্যাদি ইত্যাদি। একপর্যায়ে আমি ভয় পেয়ে যাই এবং দ্রুত কাজ শেষ করে ফিরে আসি। সম্পাদক সাহেব আমার কাছে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেছিলামÑ ওখানে সাকাচৌ-ই পাস করবে। সম্পাদক সাহেব একটু অবাক হলেন এ কারণে যে, একটা বিতর্কিত পরিবারের বিতর্কিত ব্যক্তি কিভাবে পাস করে? আমি তখন বললাম, পরিস্থিতিটা হলোÑ সাকাচৌ তার বাবা ফকাচৌর চেয়েও অনেক এগিয়ে। প্রথমত. তার নিজস্ব বাহিনী আছে, যারা পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। দ্বিতীয়ত. ওখানে প্রচুর হিন্দু ভোটার আছেন, যারা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন না; কিন্তু তাদের ভোট দেয়া হয়ে যাবে এবং তা জমা হবে সাকাচৌর এ্যাকাউন্টে। হয়েছিলও তাই। বিপুল ভোটে সাকাচৌ-ই নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার আধিপত্য আরও বেড়েছিল বলে জানতে পেরেছিলাম।

সম্ভবত ওই পার্লামেন্টেই একদিন অধিবেশন মুলতবি হলে আমরা ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছিলাম। দেশরতœ শেখ হাসিনা তখন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনিও পার্লামেন্ট ফ্লোর থেকে বেরিয়ে তাঁর অফিস ক্যাবিনে যাচ্ছিলেন। এ সময় পাজামা-পাঞ্জাবি পরা এক যুবা দ্রুত শেখ হাসিনার সামনে এসে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার চেষ্টা করলে শেখ হাসিনা একটু পেছনে সরে গেলেন। আমি এই প্রথম তাকে দেখলাম। সেই থেকে তাকে দেখেছি স্বাধীনতার পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে, গলা ছেড়ে কথা বলতেন, ঘর কাঁপিয়ে হা হা করে হাসতেন এবং অনেকেই তা এনজয় করতেন। তদুপরি তার অর্থ সম্পদের ভা-ারও শোনা যায় এতই স্ফীত যে, অনেক শক্ত লোককেও তা দিয়ে কাত করে ফেলা তার জন্য পান্তা ভাত। এখানেই আমাদের শঙ্কা এবং সেই শঙ্কা থেকেই আমরা কয়েকজন কলাম লিখেছিলাম। রায় হওয়ার পর লিখলেন প্রফেসর ড. মুনতাসীর মামুন। ড. মামুনের কলামটি ছিল (তিন কিস্তির) মূলত স্বদেশ রায়ের কলামের ওপর সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ কর্তৃক আদালত অবমাননা জারি বিষয়ক।

বস্তুত এ মামলার ওপর লেখার উদ্দেশ্য আমাদের কারোরই আদালত অবমাননা নয় বলে আমি জোর দিয়ে বলছি। আগেই বলেছি কিছু শঙ্কা থেকে আমরা কোন কোন ব্যাপারে কথা বলেছি। অবশ্য যে কোন ব্যাপারে বিচারকগণ যদি মনে করেন আদালত অবমাননা হয়েছেÑ তাহলে মাননীয় বিচারকগণ স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালতে তলব করতে পারেন কিংবা যে কোন শাস্তিও তারা দিতে পারেন। আমরা জানি আদালতের হাত অনেক লম্বা। সে ব্যাপারে আমাদের কোন বক্তব্য নেই।

এ লেখার সমাপ্তি টানতে চাই প্রফেসর ড. মুনতাসীর মামুনের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েÑ ‘বিচারকরাও স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার জন্য যে কাউকে ডাকতে পারেন, শুনানিতে সন্তুষ্ট না হলে দ- দিতে পারেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবাই ক্ষমা চেয়ে নেন। কারণ আদালতের হাঙ্গামায় গেলে শাস্তি, অর্থ সবই নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু কিসে আদালত অবমাননা হয়? সেটি নির্ধারণ খালি বিচারকরাই করবেন? সেটি একতরফা হয়ে যায় না? আমেরিকায়ও রাজনৈতিকভাবে বিচারক নিযুক্ত হন। সেখানেও শুনানি ও রায় নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক হয়; কিন্তু আদালত অবমাননা করা হয়েছে তা তারা মনে করেন না।’

ঢাকা, ৭ জুলাই ২০১৫

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি,

জাতীয় প্রেসক্লাব