২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শ্রদ্ধাঞ্জলি ॥ বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা

  • দুলাল আচার্য

আজ বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৫তম জন্মদিন। তিনি ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম রেণু। পিতা শেখ জহুরুল হক চাকরিসূত্রে যশোর থাকায় দাদা শেখ কাশেমের ছোট সংসারে মা ও বড় বোনের স্নেহছায়ায় তাঁর বেড়ে ওঠা। মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি বাবা ও পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারান। দাদা শেখ কাশেম শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কিশোরী বয়সেই বেগম ফজিলাতুন্নেছার বিবাহ দেন। তখন থেকে বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে শাশুড়ি (বঙ্গবন্ধুর মা) সাহেরা খাতুন নিজের সন্তানদের সঙ্গে মাতৃস্নেহে লালন-পালন করেন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে তিনি প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নেপথ্যচারিণী ও প্রেরণাদায়িনী মহীয়সী। তাই বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আওয়ামী লীগসহ এদেশের প্রগতিশীল মানুষের কাছে বঙ্গমাতা হিসেবে পরিচিত।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মনেপ্রাণে একজন আদর্শ বাঙালী নারী ছিলেন। স্বামীর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তিনি ছিলেন দানশীল। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ মানুষকে মুক্তহস্তে দান করতেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের রোগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের খোঁজ-খবর নেয়া ও পরিবার-পরিজনের যে কোন সঙ্কটে পাশে দাঁড়াতেন। বঙ্গবন্ধু জেলে থাকার সময় আন্দোলন চলাকালীন প্রতিটি ঘটনা জেলখানায় সাক্ষাতে বঙ্গবন্ধুকে জানাতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশ নিয়ে আসতেন ফজিলাতুন্নেছা। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে সে নির্দেশ জানাতেন, নেপথ্যে থেকে তিনি ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি অনুপ্রেরণা, শক্তি, সাহস, মনোবল ও প্রেরণা যুগিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বলা যায়, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রনায়কের সহধর্মিণীই ছিলেন না, বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামে অন্যতম এক স্মরণীয় অনুপ্রেরণাদাত্রী। এই মহীয়সী নারী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে দেশ ও জাতির সেবা করে গেছেন।

শান্ত স্বভাবের শেখ ফজিলাতুন্নেছা স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার কারণে এবং খুব অল্প বয়স থেকে রাজনীতির সঙ্গে স্বামীর গভীর সাহচর্য দেখতে দেখতে এক রাজনৈতিক সচেতন আদর্শ বাঙালী নারীর চিরায়ত রূপ ধরা পড়ে তাঁর চরিত্রে। তাই পরবর্তী সময়ে অসীম ধৈর্য ও সাহস নিয়ে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতেন। এমনকি ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে যখনই বঙ্গবন্ধুর অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতো তখনও পিতার সম্পত্তি থেকে অর্জিত অর্থ বিনা দ্বিধায় প্রেরণ করতেন।

বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তেও সংসার জীবনের বর্ণনায় বিশেষ করে বার বার তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা ওরফে রেণুর নাম উঠে এসেছে। এ দু’জন তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে শুধু সমর্থনই করতেন না, বরং কষ্ট করে টাকা জমিয়ে রাজনীতি করার জন্য অর্থ সাহায্য করতেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে প্রায়ই এভাবে বলতেন, ‘রেণু খুবই কষ্ট করত; কিন্তু কখনও কিছু বলত না। নিজে কষ্ট করে আমার জন্য টাকা-পয়সা যোগাড় করে রাখত, যাতে আমার কষ্ট না হয়।’

১৯৭৫ সালের কলঙ্কিত ১৫ আগস্ট রাতে পরিবারের অন্য সদস্যের সঙ্গে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছাও শাহাদাতবরণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ ও আত্মীয়স্বজনসহ দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে তিনি নিহত হন।

ইতিহাসের এই নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডের সময়ও বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সুখ-দুঃখের সাথী মরণকালেও সঙ্গী হয়ে রইলেন। বেগম ফজিলাতুন্নেছার জীবনকর্ম বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় অম্লান রাখতে তাঁর জীবনের নানা আলোকিত দিক আলোর পাদপীঠে নিয়ে আসা যায়। তাঁকে ইতিহাসের স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করার দায়িত্বটি রাষ্ট্রের। তাঁর জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।