২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বার্ধক্যের বারান্দায়

বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে আসে এক সময় মানবদেহ। তখন তাকে লড়তে হয় নিজের সঙ্গে, শরীরের সঙ্গে, প্রকৃতির রূঢ়তার সঙ্গেও। দেহের কলকব্জাগুলো তখন যথানিয়মে কর্মসম্পাদন আর করে না। কোথাও কোথাও যাচ্ছে বিগড়ে। আজ এই সমস্যা তো কাল সেই সমস্যা। এই ওষুধ, সেই ওষুধ। এই ডাক্তার আজ তো কাল অন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে থাকা। এন্তার এক্সরে, রক্ত পরীক্ষা, যকৃত, লিভার, প্রেসার ইত্যাকার হেন বিষয় নেই, যার পরীক্ষা না করে আর উপায় নেই। তদুপরি নানাজনের নানা পরামর্শ। উপদেশ ঝড়ের মতো বর্ষিত হতে থাকে শরীর একটু বিগড়ে গেলেই। বয়স বাড়ছে প্রতিদিন আর শরীর ভাঙছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। অনিদ্রা কখনও সঙ্গী হয়। বুকে ব্যথা, পেটে গ্যাস, মাথা চিনচিন করে, চোখের নজর সীমিত হয়ে আসে, কিডনিতে পাথর, খেয়ে বসে শুয়ে স্বস্তি আর মেলে নাÑ এসব অনেক ক্ষেত্রেই বার্ধক্যের হ্যাপা। আর সেই হ্যাপা সামলানো সহজতর নয়। অন্যরা তিক্তবিরক্ত হয় প্রবীণের এই দেহগত ফ্যাসাদে। মানুষ বুড়ো হয় বুঝি এক রাজ্যের নানা কিসিমের ঝুট-ঝামেলা আর ঝড়-ঝাপটা পোহাতে। বাড়াও চোখের চশমার পাওয়ার, ইনসুলিনের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার সঙ্গে ঘরে-বাইরে উপদেশ শ্রবণÑ এ বার্ধক্যের মাসুল হিসেবে কড়ায়গ-ায় উসুল হয় যেন। এক সময় পিতা-পিতামহ বা মাতা-মাতামহদের বার্ধক্যকালে নিঃসঙ্গতা ধরা দিত না। একান্নবর্তী পরিবারে বয়স্ক মানুষটিই সর্বময় কর্তা। তার হুকুম তামিল করা অধস্তনদের কর্তব্য। রোগ-শোকে পরিবারের সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ত সেবা-শুশ্রƒষায়। অবশ্য সেকালে বার্ধক্যে পৌঁছা মানুষেরা সংখ্যায় ছিল কম। কিন্তু একালে প্রবীণের সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে রোগের প্রকোপ। একালে বার্ধক্য মানে ঘরে-বাইরে অপাঙ্ক্তেয়। অনেকে তো পরিবারের কাছে বোঝাস্বরূপ। কারণ আয়-রোজগারে অবদানহীন প্রবীণের জন্য থাকে একরাশ করুণা। মূলত বার্ধক্যের সময়টাতে সাহচর্য মেলা দুষ্কর। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মন-মানসিকতার পরিবর্তনে আত্মকেন্দ্রিকতায় ভর করা মানুষের কাছে প্রবীণরা যে পরিত্যাজ্য। নিঃসঙ্গতা এসে ভর করে। দু’দ- কথা বলে মনকে হালকা করার সঙ্গীও মেলে না। তাই অনেকে বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গে কথা বলে। মানুষ হিসেবে প্রবীণরা পায় না প্রাপ্য। এই না পাওয়ার ভুবনে বার্ধক্য বাড়ায় বিড়ম্বনা। তার জন্য নেই বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা। সারাবিশ্বেই বয়স্ক মানুষেরা অবহেলিত। তাদের সংখ্যা বাড়ছে। আগামী ক’বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বার্ধক্য জনসংখ্যার দেশ হিসেবে পরিণত হতে যাচ্ছে। দেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও বিস্ফোরণোম্মুখ অবস্থা হলো জনসংখ্যার বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার হার প্রতিবছরই বাড়ছে। ১৯৭৪ সালে যেখানে ছিল ৪১ লাখ; এখন তা বেড়ে বার্ধক্যে পৌঁছা ক্রান্ত জনসংখ্যা দাঁড়িয়ে ১ কোটি বিশ লাখ। দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০ হতে ১২ ভাগ প্রবীণ হলে সেই দেশকে বার্ধক্য জনসংখ্যার দেশ গণ্য করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। দেশ সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। অথচ বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অসচেতন এবং উদাসীন ও নিষ্ক্রিয়। বার্ধক্যে উপনীত মানুষদের জন্য নেই কোন পরিকল্পনা। ভাবটা যেন, বয়স হয়েছে ঢের। অতএব ভোগো দুর্ভোগ। শেষ বয়সে এসে শান্তি উধাও, স্বস্তি নেই, প্রিয়জন পরিজন দূর- এমন অবস্থা হতে নেই পরিত্রাণ। বার্ধক্যের বারান্দায় দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা স্ফীতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাই তাদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা। বয়স্ক প্রবীণজনরা তো প্রত্যাশা করেন, তারা যেন শান্তি ও স্বস্তিতে জীবনের শেষ প্রান্তে থাকতে পারেন। কিন্তু কে দেবে সেই ভরসা, জানা নেই।